ভেজা চুলে ঘুমানো © সংগৃহীত
ভেজা চুল নিয়ে ঘুমালে ঠান্ডা লাগা বা জ্বর হতে পারে—ছোটবেলা থেকেই এমন কথা অনেকেই শুনে আসছেন। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, শুধু ভেজা চুল নিয়ে ঘুমানোর কারণে সর্দি বা ফ্লুর মতো ভাইরাসজনিত অসুস্থতা হয় না। কিন্তু এই অভ্যাস নিয়মিত করলে মাথার ত্বক, চুল এবং ঘুমের আরামে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শারদাকেয়ার-হেলথসিটির ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. নীরজ কুমার বলেন, সাধারণ সর্দি-জ্বর ও ফ্লুর মতো অসুস্থতা ভাইরাসের কারণে হয়, ভেজা চুল নিয়ে ঘুমানোর কারণে নয়। শুধু রাতে ভেজা চুল নিয়ে বিছানায় গেলেই কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বেন—এমনটা নয়।
সর্দি বা ফ্লুর ভাইরাস সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির ড্রপলেট, ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ বা দূষিত কোনো পৃষ্ঠের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই ভেজা চুলের কারণে শরীরে ঠান্ডা অনুভূত হলেও এটি ভাইরাস সংক্রমণের সরাসরি কারণ নয়।
তবে নিয়মিত ভেজা চুল নিয়ে ঘুমানো পুরোপুরি নিরাপদ অভ্যাসও নয়। মাথার ত্বক কয়েক ঘণ্টা ভেজা থাকলে সেখানে উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ তৈরি হয়। এতে স্বাভাবিকভাবে থাকা ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া বেড়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
যাদের আগে থেকেই খুশকি, সেবোরিক ডার্মাটাইটিস বা মাথার ত্বকে ছত্রাকের সংক্রমণের প্রবণতা রয়েছে, তাদের সমস্যা আরও বাড়তে পারে। চুলকানি, খোসা ওঠা, লালচে ভাব বা জ্বালাপোড়া দেখা দিতে পারে। তবে যাদের মাথার ত্বক স্বাভাবিক, তাদের গুরুতর সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
ভেজা অবস্থায় চুলও বেশি দুর্বল থাকে। পানি চুলের স্তর ফুলিয়ে দেয়, ফলে চুল সহজে ভেঙে যেতে পারে। ঘুমের সময় মাথা বালিশের সঙ্গে ঘষা লাগায় ভেজা চুলে ক্ষতির ঝুঁকি আরও বাড়ে।
এর ফলে চুল ভেঙে যাওয়া, আগা ফেটে যাওয়া, জট তৈরি হওয়া, চুল ফ্রিজি হয়ে যাওয়া এবং স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। ডা. কুমার বলেন, 'সময় ধরে নিয়মিত ভেজা চুল নিয়ে ঘুমালে চুলের ক্ষতি হতে পারে এবং চুলকে নিষ্প্রাণ বা অস্বাস্থ্যকর দেখাতে পারে।'
ভেজা চুলের পানি বালিশের কভার ও বালিশের ভেতরেও চলে যেতে পারে। কভার নিয়মিত না ধুলে বা বালিশ ভালোভাবে শুকানো না হলে সেখানে অণুজীব ও ডাস্ট মাইটের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হতে পারে। এতে সরাসরি অসুস্থতা না হলেও যাদের অ্যালার্জি বা সংবেদনশীল ত্বক রয়েছে, তাদের সমস্যা বাড়তে পারে। তাই বালিশ ও বালিশের কভার পরিষ্কার রাখা জরুরি।
ভেজা চুল নিয়ে ঘুমানোর পর অনেকে মাথাব্যথা বা ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার কথা বলেন। তবে ভেজা চুল সরাসরি মাথাব্যথার কারণ—এমন প্রমাণ এখনো খুব সীমিত। ডা. কুমারের মতে, দীর্ঘ সময় ঠান্ডা ও ভেজা মাথার ত্বকের সংস্পর্শে থাকলে তাপমাত্রার পরিবর্তনে সংবেদনশীল কিছু মানুষের অস্বস্তি হতে পারে।
ভেজা চুলের কারণে বালিশও ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে হয়ে যেতে পারে। এতে ঘুমের আরাম কমে যেতে পারে এবং কিছু মানুষের ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো অস্বস্তি হতে পারে। তবে এসব সমস্যা সাধারণত অসুস্থতার কারণে নয়, বরং অস্বস্তির কারণে হয়।
চুল ও মাথার ত্বক ভালো রাখতে ঘুমানোর আগে সম্ভব হলে চুল পুরোপুরি বা বেশির ভাগটা শুকিয়ে নেওয়া ভালো। সময় কম থাকলে হেয়ার ড্রায়ার কম বা মাঝারি তাপমাত্রায় ব্যবহার করা যেতে পারে। তোয়ালে দিয়ে আলতো করে চুল মুছে অতিরিক্ত পানি শুষে নেওয়া যায়। ভেজা চুল শক্ত করে না বেঁধে খোলা রাখাও ভালো।
ঘুমানোর সময় পরিষ্কার সিল্ক বা সাটিনের বালিশের কভার ব্যবহার করা যেতে পারে। তুলার তুলনায় এসব কাপড়ে ঘর্ষণ কম হয়, ফলে চুল ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিও কিছুটা কমতে পারে। পাশাপাশি বালিশের কভার নিয়মিত ধুয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে ব্যবহার করা উচিত।
ডা. কুমার বলেন, 'ভেজা চুল নিয়ে ঘুমালে সর্দি হবে না, তবে এটি মাথার ত্বকের স্বাস্থ্য, চুলের গুণমান এবং ঘুমের আরামে প্রভাব ফেলতে পারে। ঘুমানোর আগে চুল শুকিয়ে নেওয়ার সহজ অভ্যাসটি চুলকে সুস্থ রাখতে এবং অপ্রয়োজনীয় মাথার ত্বকের সমস্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে।'
সংবাদ সূত্র: এনডিটিভি