পড়াশোনার প্রতি বাধ্য নয়, বরং ক্ষুধার্ত করে তুলুন শিশুকে!

০৮ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:৩০ PM

শিশুর বিকাশ যে শুধু তার বয়স অনুযায়ী চাহিদাই পূরণ করে তা না, তাকে স্বাধীনতার সুখও দেয়। মারিয়া মন্টেসরি তার মেথডে স্বাধীনতাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে শিশু বন্দী জীবন যাপন করে। সে যেখানে খুশি যেতে পারে না, ঠিকমতো হাঁটতে পারে না, নিজে নিজে খেতে পারে না, নিজের প্রয়োজনের কথা বুঝিয়ে বলতে পারে না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে, সে বিভিন্ন ব্যাপারে স্বাধীন হতে থাকে। বিকাশ তাকে এই পরনির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি দেয়। তাই যতদিন পর্যন্ত শিশু নিজের মতো করে চলতে পারে না, মারিয়া মন্টেসরি শিশুর জন্য সেই সময়কে এক ধরনের কারাগার জীবন বলে অভিহিত করেছেন। 
 
তাঁর মতে, শিশুর দেহের প্রতি যদি যত্ন করা হয় কিন্তু মানসিক দিককে গুরুত্ব দেওয়া না হলে তা তার চরিত্রের গঠনের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। যার ফলে সে অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। একে এক ধরণের আচরণের বিচ্যুতি হিসেবে ধরা যায়।

মানুষের মধ্যে যে ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো আছে, সেটি তৈরি হওয়ার কারণ তাদের প্রতি যে আচরণ করা হয় তা ভুল আচরণ। যেসব দোষ-ত্রুটির কথা আমরা বলি সেগুলো মূলত ভুল পরিস্থিতি বা অবস্থার কারণে ঘটে। বাবা-মায়েরা, আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা, স্কুল থেকে শিশুর উপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয় এবং যার রিআ্যকশনে এসব ত্রুটি সৃষ্টি হয়।
 
 শিশুদের যেসব দোষ ত্রুটির কথা বেশি শোনা যায়, তা বংশগত কারণে ঘটে না বরং উপযুক্ত পরিবেশ না থাকার কারণে ঘটে। শিশুর প্রতি বড়দের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে শিশুর বিকাশের বিশেষ পর্যায়ে তার চাহিদা সম্পর্কে না জানার কারণে এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি শিশুর মধ্যে তৈরি হয়।

স্কুলে লেখাপড়া সাথে সাথে ডিসিপ্লিনের ব্যাপারে যে ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাতে মনে হয় শিক্ষার কাজ হলো ছোটবেলা থেকে শিশু যে সব দোষ ত্রুটি নিয়ে বড় হয়েছে- তা সংশোধন করাই শিক্ষার কাজ। শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায়- তার নিজের বাড়িতে তা চাহিদাগুলোকে তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি তার বিকাশের বিশেষ পর্যায়গুলোতে তার জন্য কোন আয়োজন করা হয়নি, বাড়ির বন্দীদশার পর প্রি-স্কুলে আরো বেশি বন্দীদশা এবং অবহেলার পর শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাকে গরু ছাগলের মতো দলবদ্ধ করে শিক্ষা দেওয়ার জন্য কঠিন শৃংখলার বাঁধনে আবদ্ধ করা হয়। প্রি-স্কুলে শিশুটি উপযুক্ত একটিভিটি এবং একঘেয়েমীর কারণে ও স্বতঃস্ফূর্ত জীবনের অভাবে ইতিমধ্যে ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে গেছে। তার মধ্যে যত ধরনের দুষ্টুমি, দোষ-ত্রুটি দেখা যায়, এসবই সে করে নিজেকে প্রটেক্ট করার জন্য। 

প্রাথমিক বিদ্যালয় শিশুকে প্রথমে একটা পেন্সিল দিয়ে কিছু চিহ্ন (বর্ণ, সংখ্যা প্রভৃতি) তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়, যেখানে শিশুটি তার জীবনে এর আগে হাত দিয়ে কাজ করার খুব কমই সুযোগ পেয়েছে। শিশুদের বর্ণমালা শিখতে বলা হয় অথচ এটা তার মধ্যে তেমন কোনো আকর্ষণ তৈরি করতে পারে না। কারণ সে এই জিনিসগুলো সাথে পরিচিত না। শেখার প্রতি কোন আকর্ষণ ছাড়া ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে শিখতে হয়। তাই সে এমন আচরণ করে যেন যে খাবারে অরুচি, সেটাই তাকে জোর করে খাওয়ানো হচ্ছে। তাই শিশু অনুভব করে সে যেন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত এবং শিক্ষকের একমাত্র দায়িত্ব হচ্ছে ভয় দেখিয়ে, শাস্তি দিয়ে বা পুরস্কৃত করে তাকে যেকোন কাজে বাধ্য করা।

এভাবেই জীবনের একেবারে প্রথম দিকে লেখাপড়ার প্রতি, ‍ডিসিপ্লিনের প্রতি শিশুর মধ্যে এক ধরনের ঘৃণা সৃষ্টি হয়। কাজের প্রতি, লেখাপড়ার প্রতি ঘৃণা এবং অনাগ্রহ- শুরুতে সৃষ্ট এই সমস্যার রেশ শিশুর মধ্যে পুরো জীবন ধরে রয়ে যায়। 
 
দেড় বছর আঠারো মাস বয়সে শিশুর হঠাৎ করেই প্রচুর শব্দ শিখে ফেলে, মন্টেসরি এটিকে ’শব্দমালার বিস্ফোরণ’ বলেছেন। তাহলে দ্বিতীয় পর্যায়ে তার মধ্যে লেখার বিস্ফোরণ ঘটে না কেন? অর্থাৎ সে লিখতে চায় না কেন? কারণ যখন শব্দের বিস্ফোরণ ঘটে, তখন তার মধ্যে যে জ্ঞানের ক্ষুধা থাকে, প্রত্যেকটি জিনিসের নাম জানার জন্য যে ক্ষুধা থাকে- যতদিন তার এই ক্ষুধা বজায় থাকে এবং আমরা যদি তার এই ক্ষুধাকে তৃপ্ত করতে পারি তাহলে সে পরবর্তীতে আরো বেশি উৎসাহী হবে। যেহেতু আমরা লেখার ক্ষেত্রে এই ক্ষুধা তৈরি করতে পারিনি, তাই সে লিখতে করে না।

শিশু পরিবেশ থেকে বিভিন্ন জিনিস আত্মস্থ করে। আমরা তার পরিবেশে বিভিন্ন জিনিস এবং তাদের নাম স্থাপন করতে পারি, ফলে সে দুটোকেই আত্মস্থ করবে, জিনিসগুলোর নাম আয়ত্ত করবে এবং সাবলীলভাবে শিখতে পারবে যেভাবে সে তার মাতৃভাষা শিখেছে।

পরিবেশের বস্তু সামগ্রী এই পরীক্ষণের প্রক্রিয়া শিশুর কাছে একটা আনন্দময় অভিজ্ঞতা। হয়তো বলবেন, এটা শুধুমাত্র স্বপ্নেই ঘটতে পারে। এভাবে কি শিশুকে অংক শেখানো যায়? সত্যি বলতে কি, দার্শনিকরা বলেছেন যে- মানব মন মূলত গাণিতিক গুণসম্পন্ন। যদি শিশুকে তার প্রয়োজনীয় চাহিদা এবং এই উৎসগুলো সময় মত যোগানো যায় তাহলে, গণিত শেখার ক্ষেত্রেও বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

শিশু শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তার ক্ষুধাকে জাগিয়ে রাখা, তাকে পড়ার প্রতি বিভিন্ন ভাবে উৎসাহিত করে তোলা, সেই সাথে প্রতিটি পূর্ববর্তী পর্যায়কে পরবর্তী পর্যায়ের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া। অর্থাৎ পাঁচ বছর বয়সে শিশুর কাছ থেকে আমরা যে ধরণের আচরণ, শৃঙ্খলা, লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগ আশা করি- সেটার প্রতি এক বছর বয়স থেকেই নিতে হবে।

মারিয়া মন্টেসরি কে? তিনি ছিলেন একজন ইতালীয় চিকিৎসক এবং শিক্ষাবিদ। নিজের নামে প্রতিষ্ঠা করা শিক্ষা দর্শনের জন্য তিনি সর্বাধিক পরিচিত। এছাড়া তিনি বৈজ্ঞানিক শিক্ষা দান বিষয়ে লেখালিখির সাথে যুক্ত ছিলেন। তার ‘মন্টেসরি শিক্ষাপদ্ধতি’ বর্তমানে পৃথিবীর অনেক সরকারি ও বাণিজ্যিক বিদ্যালয়সমুহে পাঠদান কার্যক্রম হিসেবে প্রচলিত রয়েছে।

সূত্র: সেন্টার ফর এডুকেশনাল রিসার্চ

যে কারণে পাকিস্তানকে শাস্তিতে দিতে পারবে না আইসিসি
  • ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল
  • ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
১০ টাকার নতুন নোট বাজারে আসছে আজ
  • ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
লক্ষ্মীপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী গ্রেপ…
  • ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিশ্বকাপ শুরুর আগ মুহূর্তে স্কোয়াডে বড় পরিবর্তন আনল শ্রীলঙ্…
  • ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
চায়ের আড্ডা: তরুণদের কণ্ঠ, নতুন রাজনীতি এবং বাংলাদেশের ভবি…
  • ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬