ডা. জোবায়দা রহমান © টিডিসি ছবি
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জোবায়দা রহমান।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর বিজয় সরণির নভোথিয়েটারে বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এর মূল মঞ্চে ‘হেলথ ইনোভেশন ফর অল: এক্সপ্যান্ডিং অ্যাকসেস টু অ্যাফোর্ডেবল অ্যান্ড ইনক্লুসিভ কেয়ার’ শীর্ষক প্লেনারি সেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
ডা. জোবায়দা রহমান বলেন, কোনো হাসপাতাল কতটা আধুনিক বা সেখানে কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, তা দিয়ে একটি দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান বিচার করা যায় না। স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিশেষ অধিকার নয়, এটি মানুষের মৌলিক মানবাধিকার।
তিনি বলেন, অনেক মানুষ জটিল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর বিশেষজ্ঞ হাসপাতালে আসেন। কারণ তাদের কাছাকাছি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যায় না। ফলে রোগীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। আধুনিক টারশিয়ারি স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। তবে এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশও একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। তাই আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেবল চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠতে পারে না। ‘প্রতিরোধই প্রতিকারের চেয়ে উত্তম’ এ কথাটিই বাস্তব। রোগ গুরুতর রূপ নেওয়ার আগেই স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে তা শনাক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে হবে। দেশের ৯ হাজারেরও বেশি গ্রামে প্রতিটি নাগরিকের জন্য সহজে পৌঁছানো যায় এমন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য শহরের দিকে ছুটে আসার প্রয়োজন থাকা উচিত নয়; তাদের ঘরের কাছেই চিকিৎসার সুযোগ থাকা দরকার। এ জন্য ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতা কর্মসূচি ও টিকাদান জোরদার করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে অসুস্থতা ও মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদরোগ। সঠিক জীবনযাপন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার সঙ্গে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার সমন্বয় ঘটাতে পারলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। একই সঙ্গে ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা আরও ব্যাপক করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। এরপরও বহু মানুষ না জেনে ডায়াবেটিস নিয়ে বসবাস করছেন। তাই প্রতিটি স্ক্রিনিং কর্মসূচিকে রোগ নির্ণয়, কাউন্সেলিং, চিকিৎসা, ওষুধ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে এখন থেকেই ডিমেনশিয়া, পারকিনসন্সসহ বয়োবৃদ্ধ সমাজের স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে। মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা কোনো মানুষের আয়, অবস্থান বা সামাজিক মর্যাদার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। দেশের প্রতিটি প্রান্তে প্রতিটি নাগরিকের কাছে এই সেবা পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, মানুষের ঘরের কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি এবং জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা যেতে পারে। বিশেষ করে নারীদের এ কাজে সুযোগ দেওয়া উচিত। এসব স্বাস্থ্যকর্মী রোগের স্ক্রিনিং, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যশিক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা এবং রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী পর্যায়ের চিকিৎসার জন্য রেফার করার কাজে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
তিনি বলেন, রেফারেল ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যাতে একজন রোগী সহজেই কমিউনিটি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে জেলা ও বিশেষজ্ঞ হাসপাতালে যেতে পারেন এবং সেখানে চিকিৎসা শেষে আবার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দলের অধীনে ফিরে আসতে পারেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে একটি জাতীয় সমন্বিত রক্তব্যবস্থার প্রয়োজন। এই ব্যবস্থার আওতায় স্বেচ্ছায় রক্তদান, রক্ত সংগ্রহ, সংক্রামক রোগ পরীক্ষা, রক্তের বিভিন্ন উপাদান পৃথককরণ, পরিবহন এবং প্লাজমা ব্যাংক গড়ে তোলার মতো বিষয়গুলো থাকতে হবে।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এই পুরো ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হবে। তবে উদ্ভাবন মানেই সব সময় দামি যন্ত্র আবিষ্কার বা নতুন কোনো অ্যাপ তৈরি করা নয়। সবচেয়ে মূল্যবান উদ্ভাবন হলো সেটিই, যা দেশের রোগীদের বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে মানসম্মত গবেষণা, শক্তিশালী ফার্মাসিউটিক্যালস খাত, দক্ষ চিকিৎসক এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে। তবে ঘাটতি রয়েছে এসব সক্ষমতার মধ্যে সংযোগ তৈরিতে। গবেষণার সঙ্গে যাচাইকরণ, যাচাইকরণের সঙ্গে নীতিমালা এবং নীতিমালার সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার সংযোগ ঘটাতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত স্পষ্ট। মানুষ যেন তাদের দৈনন্দিন জীবনে স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই সংস্কারের সুফল পায়। রোগ যেন দ্রুত শনাক্ত হয়, স্বাস্থ্যসেবা যেন মানুষের ঘরের কাছে পৌঁছে যায় এবং চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে কোনো মানুষকে যেন নিঃস্ব হতে না হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দারসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।