ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান থেকে বঙ্গভবনে মির্জা ফখরুল

২০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০৬ PM
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর © টিডিসি সম্পাদিত

যে মানুষটি কয়েক দশক আগে (৮০ দশক) স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন, তিনিই এখন দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের অধিকারী হিসেবে দেশের তেইশতম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। নির্বাচনে দুইজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার মধ্যে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং বিরোধী জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।

তৃণমূলের ভোটের রাজনীতি দিয়ে শুরু দেশের তেইশতম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। এরপর জেলা বিএনপির নেতৃত্ব, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব থেকে মহাসচিব—চার দশকের রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে আজ তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনের বাসিন্দা। রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ।

ঠাকুরগাঁও শহরের স্থানীয় রাজনীতি থেকে যে রাজনৈতিক যাত্রার শুরু, চার দশকের কাছাকাছি সময়ের পথ পেরিয়ে সেটিই এখন এসে দাঁড়িয়েছে বঙ্গভবনের দরজায়। ১৯৮৮ সালে স্বৈরাচার এরশাদের শাসনামলে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তখন তিনি কোনো জাতীয় রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ছিলেন না; স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে স্থানীয় মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ময়দান থেকেই ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন তিনি।

২০২৬ সালের ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তার নাম আসার মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রা নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করে। সংসদে বিএনপির বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে নির্বাচনে তার জয় অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। ফলে একসময় ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করা এই রাজনীতিক যে বঙ্গভবনের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন তা রাজনৈতিক মহলে এক প্রকার নিশ্চিত ছিল।

শিক্ষকতা থেকে রাজনীতির মাঠে
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের শুরু অবশ্য পৌরসভা থেকে নয়। ছাত্রজীবনেই বাম রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং ১৯৬৯’র গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির পেশাগত জীবনেও তিনি ছিলেন সক্রিয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করার পর ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি প্রশাসনেরও বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন তিনি। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারী এটির ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

কিন্তু শিক্ষকতা কিংবা সরকারি চাকরির নিরাপদ পেশাগত জীবন তাকে ধরে রাখতে পারেনি। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নামেন। আর দুই বছর পরই তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় নির্বাচনী সাফল্য আসে।

পৌর চেয়ারম্যান থেকে দলীয় রাজনীতিতে
১৯৮৮ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচন ছিল মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। স্থানীয় সরকারের এই দায়িত্ব তাকে সরাসরি জনগণের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেয়। এখান থেকেই তার তৃণমূলের রাজনীতির অভিজ্ঞতা আরও গভীর হয়।

এরপর সামরিক স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। স্থানীয় রাজনীতির সংগঠক হিসেবে তখন তিনি জাতীয় রাজনীতির পরিসরেও পরিচিত হয়ে উঠতে থাকেন।

তবে জাতীয় সংসদের রাজনীতিতে তার প্রথম দিকের পথটি মসৃণ ছিল না। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়ে তিনি পরাজিত হন। কিন্তু নির্বাচনী পরাজয় তার রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারেনি। বরং দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন ফখরুল। 

সংসদ ও মন্ত্রিসভায় 
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০০১ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রথমবারের মতো জয় পান মির্জা ফখরুল। বিএনপি সরকার গঠন করলে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় তিনি প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তৃণমূলের পৌর চেয়ারম্যান থেকে রাষ্ট্রীয় নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রে তার প্রবেশ ঘটে এই পর্যায়ে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি আবার পরাজিত হন। কিন্তু এ সময়েও দলের রাজনীতিতে তার গুরুত্ব কমেনি বরং বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় নিজের অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী করেন। 

বিএনপির কঠিন সময়ের নেতৃত্ব
২০০৯ সালে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলের পর মির্জা ফখরুল হন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব। এরপর ২০১১ সালে বিএনপির দূর্দিনের কান্ডারী খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব থাকার পর ২০১৬ সালে তিনি বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন।

এরপরের সময়টি ছিল বিএনপির জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন। মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার, আন্দোলন, নির্বাচন এবং দলীয় সংকট—বিভিন্ন পর্যায়ে মির্জা ফখরুলকে দলের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে সামনে থাকতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি দলটির রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মসূচির অন্যতম প্রধান বক্তা হয়ে ওঠেন।

আবার ঠাকুরগাঁও, এবার জাতীয় ম্যান্ডেট
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মির্জা ফখরুল আবার ঠাকুরগাঁও-১ আসনে নির্বাচিত হন। নির্বাচনে বড় ব্যবধানের জয় তার নিজ এলাকার সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের আরেকটি প্রতিফলন হিসেবে সামনে আসে।

এই পর্যায়ে এসে তার রাজনৈতিক পরিচয় আর শুধু বিএনপির মহাসচিবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিসভা থেকে দলের সর্বোচ্চ সাংগঠনিক নেতৃত্ব—প্রায় প্রতিটি স্তর অতিক্রম করেই তিনি এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে চলে আসেন।

বঙ্গভবনের পথে রাজনৈতিক বার্তা
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক যাত্রার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত এর ধারাবাহিকতা। ১৯৮৮ সালে একজন স্বতন্ত্র পৌর চেয়ারম্যান হিসেবে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটি থেমে থাকেনি কোনো একটি পদে। স্থানীয় রাজনীতি থেকে দলীয় রাজনীতি, নির্বাচনী পরাজয় থেকে সংসদে প্রত্যাবর্তন, প্রতিমন্ত্রী থেকে দলের মহাসচিব—প্রতিটি ধাপ তাকে পরবর্তী ধাপের জন্য প্রস্তুত করেছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির মনোনীতি তার প্রার্থিতা তাই শুধু একজন ব্যক্তির পদোন্নতির গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকা একজন নেতার রাজনৈতিক অভিযাত্রারও প্রতীক।

ঠাকুরগাঁওয়ের পৌরসভা ভবন থেকে বঙ্গভবন—দুই প্রান্তের দূরত্ব শুধু ভৌগোলিক নয়, রাজনৈতিকও। মাঝখানে রয়েছে প্রায় চার দশকের আন্দোলন, নির্বাচন, পরাজয়, প্রত্যাবর্তন, দলীয় সংকট এবং নেতৃত্বের নানা পরীক্ষা।

একসময় যে মানুষটি স্থানীয় মানুষের ভোটে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন, চার দশক পর সেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন দেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিচ্ছেন। তার রাজনৈতিক জীবনের এই দীর্ঘ পথচলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—শুরুটা ছিল তৃণমূলের ভোটে, আর গন্তব্য এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ।

ক্ষমা চেয়ে পোস্ট দেওয়ার পর সরিয়ে নিলেন গাজী নজরুল
  • ২০ আগস্ট ২০২৬
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি যে ছয় এমপি
  • ২০ আগস্ট ২০২৬
সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে: জাতীয় …
  • ২০ আগস্ট ২০২৬
১৬ মাসেও হলো না দুর্নীতি-নির্যাতনের বিরুদ্ধে গঠিত সত্যানুসন…
  • ২০ আগস্ট ২০২৬
মুরগি চুরির অপবাদে গাছে বেঁধে নারীকে নির্যাতন, মামলায় গ্রেপ…
  • ২০ আগস্ট ২০২৬
কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে আটকে যাবে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদ…
  • ২০ আগস্ট ২০২৬