এয়ারবাসের ‘এ৩৫০-৯০০’ মডেলের একটি উড়োজাহাজ। © সংগৃহীত
সরকারের মিশ্র-বহর (Mixed Fleet) কৌশলের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কিনবে। আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে এ বিষয়ে চুক্তি সই হবে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
মঙ্গলবার বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা ৩১ আগস্টের মধ্যে এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করব। তিনি জানান, ২০৩১ সাল থেকে ধাপে ধাপে এসব উড়োজাহাজ বিমানের বহরে যুক্ত হবে।
তিনি বলেন, উড়োজাহাজের মূল্য এবং চুক্তির অন্যান্য শর্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রকাশ করা হবে। জাতীয় ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই সরকার এ বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
এর আগে বিমান যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ওই চুক্তিতে রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এয়ারবাস বিমানের কাছে চারটি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি এবং ছয়টি এ৩২১নিও ন্যারোবডি উড়োজাহাজ বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা করতে এয়ারবাসের ভাইস প্রেসিডেন্ট এডওয়ার্ড ডেলাহায়ে সম্প্রতি ঢাকায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম, প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত এবং বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত বলেন, সরকারের লক্ষ্য বিমানকে একটি মিশ্র-বহরের এয়ারলাইন্সে রূপান্তর করা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখাও এ সিদ্ধান্তের অন্যতম বিবেচ্য বিষয়।
এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বিশ্বের দুই বৃহৎ উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং ও এয়ারবাসের উড়োজাহাজ একই বহরে পরিচালনা করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, যা প্রতিষ্ঠানটির বহর ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে।
সরকার ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বিমানের বহর ৪৭টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছে। এর লক্ষ্য জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটিকে আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করা।
এয়ারবাস ও বোয়িং দীর্ঘদিন ধরেই বিমানের ভবিষ্যৎ বহরে জায়গা করে নিতে প্রতিযোগিতা করে আসছে। ২০২৩ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর বাংলাদেশ সফরের সময় এয়ারবাস কেনার বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য আলোচনার প্রেক্ষাপটে বোয়িংয়ের ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি চূড়ান্ত হয়। এরপর এয়ারবাস নতুন করে ওয়াইডবডি ও ন্যারোবডি উড়োজাহাজের সমন্বয়ে প্রস্তাব দেয়।
এ৩৫০-৯০০ উড়োজাহাজ দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে এবং এ৩২১নিও আঞ্চলিক, উপসাগরীয় ও এশিয়ার মাঝারি দূরত্বের রুটে পরিচালনার উপযোগী।
গত সপ্তাহে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও সরকারের মিশ্র-বহর নীতির কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের বোয়িং ও এয়ারবাস—দুটোই প্রয়োজন। আমরা দুই প্রতিষ্ঠান থেকেই উড়োজাহাজ কিনব। তিনি বলেন, সরকার কোনো দেশের চাপে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম, প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও স্পেনের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকেও এয়ারবাস কেনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বাসসকে বলেন, মিশ্র-বহর কৌশল অনুসরণ করলে রুটভিত্তিক উপযোগী উড়োজাহাজ ব্যবহার, পরিচালনায় নমনীয়তা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্যিক দক্ষতা বাড়বে। তবে নতুন উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি রুট পরিকল্পনা ও লাভজনকতার বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।