বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং © সংগৃহীত
ব্রিকসে বাংলাদেশ যুক্ত হওয়ার বিষয়ে চীন ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) চীনের বেইজিং এ ওই বৈঠক শেষে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, আমাদের (বাংলাদেশের) ব্রিকসে সম্পৃক্ততার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং ব্রিকসে বাংলাদেশের সংযুক্তি হওয়ার ক্ষেত্রে ওনারা (চীন) ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন, সেটি বলেছেন।
উল্লেখ্য, ব্রিকস হল উদীয়মান অর্থনীতির পাঁচটি দেশ। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং সাউথ আফ্রিকার প্রথম অক্ষরের সমন্বয়ে নামকরণ করা একটি জোট এই ব্রিকস।
সবশেষ ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা অন্তর্ভুক্ত হবার আগে এটি ‘ব্রিক’ নামে পরিচিত ছিল। মূলত উন্নয়নশীল অথবা সদ্য শিল্পোন্নত এই দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেশ উর্ধ্বমুখী। সেইসাথে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীর উপর তাদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। তাই এই জোটকে বেশ প্রভাবশালী বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
চীনের স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটায় চীনের প্রিমিয়ার বা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এর সঙ্গে ঐতিহাসিক গ্রেট হলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এই বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ১৩টি সমঝোতা স্মারক(মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) স্বাক্ষরিত হয়েছে। একইসঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, বাণিজ্য, বিনিয়োগসহ নানা বিষয়ে বাংলাদেশ ও চীনের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, তিস্তা প্রজেক্টের বিষয়ে আমাদের একটা মহাপরিকল্পনা রয়েছে। যেটা বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে রয়েছে। তার আলোকে এই মহাপরিকল্পনার প্ল্যানিং স্টেজ থেকে শুরু করে যেখানে প্রয়োজন চীন আমাদের টেকনিক্যাল সাপোর্ট প্রোভাইড করবে। তাদের যে জ্ঞান রয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে আমাদের প্রজেক্ট ডিফাইন করা, প্ল্যানিং করা, এক্সিকিউশন সব জায়গায় তারা ধারাবাহিকভাবে ইনভলভ হবে বলে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। জয়েন্ট ফিজিব্যালিটি স্টাডি করাটা খুব প্রয়োজন। এতো বড় একটা প্রজেক্টের জয়েন্ট ফিজিব্যালিটি স্টাডির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে চীন কাজ করতে চায়।
এছাড়া, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনে চীন সহযোগিতা করবে জানিয়ে তিনি বলেন, মায়ানমারের সাথে যদি কোনো ডায়লগ করার দরকার হয় স্পেশালি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য যেটা আমরা সবসময় বলছি যে ভলান্টারি সেইফ এবং ডিগনিফাইড রিপ্যাট্রিয়েশন চাই সেক্ষেত্রে চীন বলেছে তারা ফ্যাসিলিটেট করতে চায়।
এছাড়াও সড়ক, টানেলসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণে চীন ভূমিকা রাখবে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। একইসঙ্গে কর্মসংস্থান তৈরি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে নানা পদক্ষেপের বিষয়েও দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে যেসব বৈঠক ও আলোচনা
তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা ঝুঁকি মোকাবেলা, নদী খনন, নদীভাঙন রোধ এবং সেচ ও নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে বাংলাদেশ ও চীন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই রাষ্ট্রীয় সফরে বৃহস্পতিবার চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রী লি গুয়োয়িংয়ের সাথে এক বৈঠকে এসব বিষয়ে দুই দেশ ঐকমত্য হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানিয়েছেন।
নদী ব্যবস্থাপনাসহ এই খাতে একসাথে কাজ করা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ায় তার প্রথম বিদেশ সফরের পর চীনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বুধবার দেশটিতে সফর করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, চীনের স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এর সঙ্গে ঐতিহাসিক গ্রেট হলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) স্বাক্ষরিত হয় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, এগুলো চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরো জোরদার করার পথে প্রভাবক হবে বলে আশা করছি।
বৃহস্পতিবার বিকেলের বৈঠকের পরে চীনের প্রধানমন্ত্রীর আয়োজিত একটি রাষ্ট্রীয় ভোজে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সফরসঙ্গীরা। এছাড়া শুক্রবার চীনের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে দশটায় অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে আটটায় দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বেইজিং সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মাহ্দী আমিন বলেন, বেইজিং এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রসার, জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক জোরদার করা এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা।
এর আগে, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আমন্ত্রণে প্রথমে চীনের দালিয়ানে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম আয়োজিত ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নস’ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। এ সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং সাতটি দেশের প্রধানমন্ত্রী অংশগ্রহণ করেছেন। যেসব দেশের প্রধানমন্ত্রীরা এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন, তাদের মধ্যে ছিল চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মন্টিনিগ্রো, মঙ্গোলিয়া, গিনি এবং কাজাখস্তান। এছাড়া ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও সিইও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
বিনিয়োগের যেসব বৈঠক
বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার সকালে চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অফ ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (সিসিপিআইটি) এবং বিডার যৌথ উদ্যোগে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ নামে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। এই অনুষ্ঠানে চীনের প্রথম সারির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ৮০ জন শীর্ষ কর্মকর্তা ও মালিক উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
মাহ্দী আমিন জানান, বাংলাদেশে কীভাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা যায়, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান কী এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দের সামনে এই অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রত্যাশা, পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করেন।
চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ উৎপাদন ও শিল্প খাতের নতুন গন্তব্য হিসেবে একটি প্রতিযোগিতামূলক, নির্ভরযোগ্য ও লাভজনক অংশীদার হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। একইসঙ্গে আনোয়ারা ও মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, চীনে বাংলাদেশের প্রথম ইনভেস্টমেন্ট অফিস স্থাপন এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিভিন্ন খাতে বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।বিনিয়োগকারীদের ১৫ দিনের কম সময়ের মধ্যে নতুন লাইসেন্স দেওয়া হবে।
চীনের বেশ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ কর্মকর্তারা এই সফরে তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
এছাড়া চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান, বিনিয়োগকারী, মন্ত্রীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানিয়েছেন মাহ্দী আমিন।
এছাড়াও বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইক্সিংয়ের পার্টি-টু-পার্টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এই বৈঠকে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি ও পারস্পরিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে আরো ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
এই বৈঠকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির সাথে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
মাহ্দী আমিন বলেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে আরও গভীর করতেই এই সফর। কৌশলগত সহযোগিতা থেকে শুরু করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, এবং উন্নয়ন প্রকল্প থেকে জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক, সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পৃক্ততা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
এর আগে, এই রাষ্ট্রীয় সফরের প্রথম পর্বে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া সফর করেছিলেন।