ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো © সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে সাম্প্রতিক বিরোধের অবসান হওয়ার পরও তার এমন সিদ্ধান্ত সবাইকেই বিস্মিত করেছে। প্রায় পাঁচ মিনিটের একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে পর্তুগালের সমর্থকদের উদ্দেশে বিদায় জানান আল নাসরের এই তারকা।
পর্তুগাল জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে ২৩ বছর আগে যে জার্সি গায়ে জড়িয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল, সেই জার্সি পরেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন তিনি। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বিদায়ী বার্তা প্রকাশ করে বিষয়টি নিশ্চিত করেন রোনালদো।
এদিকে নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতির আগে আগামী শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দল ঘোষণা করার কথা ছিল কোচ জেসুসের। তবে তার দল ঘোষণার অপেক্ষা করেননি রোনালদো। এর আগেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন তিনি।
জাতীয় দলের হয়ে ২৩৪ ম্যাচ খেলে ১৪৬ গোল করার পর আন্তর্জাতিক ফুটবলের অধ্যায় শেষ করলেন রোনালদো। দেশের হয়ে তিনটি শিরোপা জিতেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়। এ ছাড়া উয়েফা নেশনস লিগের দুটি শিরোপাও জিতেছেন।
বিদায়ী বার্তায় যা বললেন রোনালদো...
“পর্তুগালের মানুষের উদ্দেশে বলছি, সেই দিনটি এসে গেছে, যখন আমি জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সিটি সবার কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছি। কখনোই মনে করিনি, জার্সিটি শুধু আমার একার। তবে ২৩ বছর ধরে এটি পরার, রক্ষা করার এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মাঠে বয়ে নিয়ে যাওয়ার সম্মান ও দায়িত্ব আমার ছিল।
আজ সেই সময় এসেছে, যখন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব তুলে দিতে হবে। সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। কারণ, কিছু সিদ্ধান্ত শুধু মস্তিষ্ক দিয়ে নেওয়া যায় না, সেখানে হৃদয়েরও অংশগ্রহণ থাকে।
আমি এমন একটি যাত্রার সমাপ্তি টানছি, যার শুরু হয়েছিল ২০০৩ সালের আগস্টে এবং যা চিরতরে আমার জীবন বদলে দিয়েছিল। জাতীয় দলের হয়ে কাটানো সময়ের দিকে ফিরে তাকালে এবং সবকিছু স্মরণ করলে আমার চোখে শুধু ম্যাচ, গোল, রেকর্ড ও ট্রফি ভেসে ওঠে না; ভেসে ওঠে মানুষের মুখ। আমি সেই অভিবাসীদের দেখতে পাই, যারা ৯০ মিনিটের জন্য পর্তুগালকে নিজেদের আরও কাছের বলে অনুভব করেছিলেন। দেখতে পাই লাখ লাখ পর্তুগিজ মানুষকে, যাদের সঙ্গে আমার কখনো সরাসরি দেখা হয়নি, অথচ তারা আমার জীবনের অংশ ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ফুটবল কেবল একটি খেলার চেয়েও অনেক বড় কিছু, এটি মানুষের গল্প।
জাতীয় দলের হয়ে পুরো ক্যারিয়ারে আমি সব সময় নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি জিততে চেয়েছি, সেরা হতে চেয়েছি এবং ইতিহাস গড়তে চেয়েছি। নিজের প্রতি সব সময় কঠোর ছিলাম। আরও ভালো করার স্বপ্ন দেখেছি, বিশ্বাস করেছি আমরা যত দূর সম্ভব যেতে পারব। এই জার্সির জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি।
আমরা অসাধারণ সব সন্ধ্যা ও রাত কাটিয়েছি, এমন সব জয় পেয়েছি, যা আমি কখনো ভুলব না। একইভাবে এমন কিছু পরাজয়েরও মুখোমুখি হয়েছি, যেগুলোর স্মৃতি আজও আমাকে কষ্ট দেয়। কখনো ব্যর্থ হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি এবং এমন কিছু মুহূর্ত পার করেছি, যখন পর্তুগালের মানুষ আমার কাছ থেকে যা গভীরভাবে প্রত্যাশা করেছিলেন, তা দিতে পারিনি। কিন্তু কখনো হাল ছাড়িনি। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করার গর্ব কখনো হারাইনি।
এই দীর্ঘ সময়ে আমি খুব সাধারণ কিছু বিষয় শিখেছি। গোলের স্মৃতি একসময় ফিকে হয়ে যায়, ট্রফি জাদুঘরে জায়গা পায় এবং রেকর্ড ভাঙার জন্য নতুন কেউ আসে। কিন্তু এমন একটি বিষয় আছে, যা সময় কখনো মুছে দিতে পারে না। সেটি হলো মানুষের হৃদয়ে আমাদের অবস্থান। আমার কোনো একটি গোল যদি কখনো আপনাদের আনন্দ দিয়ে থাকে, কাউকে আলিঙ্গন করতে বাধ্য করে থাকে, কোনো কঠিন মুহূর্ত ভুলিয়ে দিয়ে থাকে কিংবা নিজেদের দেশ নিয়ে গর্বিত করে থাকে, তাহলে আমার করা সবকিছুই সার্থক। কারণ পর্তুগিজ হওয়ার অর্থও এটাই। আমরা একসঙ্গে কষ্ট পাই, একসঙ্গে ঘুরে দাঁড়াই এবং নতুন করে বিশ্বাস করতে শিখি।
পর্তুগালের সব সময় এমন তরুণদের প্রয়োজন, যারা স্বপ্ন দেখে; এমন খেলোয়াড়দের প্রয়োজন, যারা হাল ছাড়ে না; এমন নতুন প্রজন্মের প্রয়োজন, যারা বিশ্বাস করে এর আগে কেউ যেখানে পৌঁছাতে পারেনি, সেখানেও পৌঁছানো সম্ভব। কারণ যে দেশ প্রতিনিয়ত নিজেদের নতুন বীর তৈরি করে, সেই দেশ কখনো নিজের ওপর বিশ্বাস হারায় না।
জাতীয় দলের সতীর্থদের উদ্দেশে বিশেষ কিছু বলতে চাই। প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি আলিঙ্গন, প্রতিটি আলোচনা, মাঠে নামার আগে নীরবতার প্রতিটি মুহূর্ত, একসঙ্গে উদ্যাপন করা প্রতিটি জয় এবং আমাদের আরও শক্তিশালী করে তোলা প্রতিটি পরাজয়ের জন্য ধন্যবাদ। তোমাদের অধিনায়ক হতে পারা আমার জন্য সম্মানের ছিল। তবে কোনো অধিনায়ক একা পথ চলেন না। তোমরাও আমার গল্পের অংশ।
আমার সঙ্গে এত বছর কাজ করা সব কোচ, কর্মকর্তা, চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট, কিট ম্যানেজার এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেককে ধন্যবাদ। তোমাদের অনেকেই ছবিতে জায়গা পাওনি, কিন্তু তোমাদের ছাড়া সেই ছবিগুলোর কোনোটিই সম্ভব হতো না।
আমার পরিবারকে ধন্যবাদ, আমার এই স্বপ্নের সঙ্গী হওয়ার জন্য। দীর্ঘ সময় দূরে থাকা, ত্যাগ স্বীকার করা এবং জাতীয় দলকে তোমাদের জীবনেও বিশেষ জায়গা দিতে হয়েছে—এসব কিছু বোঝার জন্যও ধন্যবাদ। আমি এত দূর আসতে পেরেছি, কারণ আমরা সব সময় একসঙ্গে ছিলাম।
আর পর্তুগালের মানুষ এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা পর্তুগালের সব সন্তানের উদ্দেশে শেষ একটি কথা বলতে চাই। এমন একটি দৃশ্য আছে, যা আমি সব সময় নিজের সঙ্গে বয়ে বেড়াব। সেটি হলো জাতীয় সংগীত বাজানোর মুহূর্ত। আমি চারপাশে তাকাই এবং আমার সতীর্থদের দেখি, গ্যালারির দর্শকদের দেখি, শিশুদের দেখি, মা-বাবা ও দাদা-দাদিদের দেখি। দেখি সেই পর্তুগিজ মানুষদের, যারা শুধু সেখানে উপস্থিত থাকার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন। আর সেই কয়েকটি মিনিটে আমরা সবাই নিজেদের ভিন্নতা ভুলে যাই। সেখানে কোনো ক্লাব নেই, কোনো রং নেই, কোনো সামাজিক শ্রেণি নেই, কোনো পেশা নেই, কোনো মতামতের ভিন্নতা নেই। আছে শুধু একটি আবেগ—পর্তুগাল।
এই অনুভূতি আমি সারা জীবন নিজের সঙ্গে বয়ে বেড়াব। আজ জাতীয় দলের হয়ে মাঠে আমার যাত্রা শেষ হচ্ছে। আমি মাথা উঁচু করে বিদায় নিচ্ছি। নিজের পথচলা নিয়ে গর্বিত এবং এটা জেনেই বিদায় নিচ্ছি যে পর্তুগালের জন্য নিজের সবটুকু দিয়েছি। তবে আমি কখনোই তোমাদের একজন হওয়া বন্ধ করব না। পর্তুগালের প্রতিটি জয় ও পরাজয়ে আমি আগের মতোই হৃদয়ের গভীর থেকে কষ্ট পাব, আনন্দিত হব এবং উদ্যাপন করব।
আমি আমার পুরো জীবন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার জন্য পরিশ্রম করেছি। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল বিশ্বের সেরা দেশের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা অর্জন করা।
এই ২৩ বছরের জন্য ধন্যবাদ। আমার ওপর বিশ্বাস রাখার জন্য এবং আমার স্বপ্ন পূরণের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। যে স্বপ্নের শুরু হয়েছিল মাদেইরা দ্বীপে ছোট্ট একটি শিশু হিসেবে, যখন আমি বলের পেছনে ছুটে বেড়াতাম।
৭ নম্বর জার্সিটি থেকে যাবে, আর এটি পরার গর্ব চিরকাল আমারই থাকবে। পর্তুগাল সব সময় আমার হৃদয়ে থাকবে।
আবার দেখা হওয়া পর্যন্ত, সব সময়ের জন্য বিদায়।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।”