আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন © সংগৃহীত
কাতার বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, দলে ছিলেন লিওনেল মেসির মতো মহাতারকা। তাই তো এবারও তাদেরই ফেবারিট ধরা হয়েছিল। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে সেই মর্যাদার প্রতিফলন দেখা যায়নি। উল্টো পুরো ম্যাচজুড়ে আক্রমণে আধিপত্য বিস্তার করেছে স্পেন, আর আর্জেন্টিনাকে কার্যত বোতলবন্দী করে রাখে লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে করা একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে শিরোপা জিতে নেয় স্পেন। এর মধ্য দিয়ে ২০১০ সালের পর ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো লা রোজারা।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দলই গোলের দেখা পায়নি। তবে ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ও আক্রমণে স্পষ্ট আধিপত্য ছিল স্প্যানিশদের। প্রথমার্ধে একের পর এক সুযোগ তৈরি করলেও আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ দুর্দান্ত কয়েকটি সেভ করে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন।
দ্বিতীয়ার্ধে স্পেনের চাপ আরও বাড়ে। লামিন ইয়ামাল, ফেরান তোরেস, দানি ওলমো, পেদ্রি ও নিকো উইলিয়ামসদের আক্রমণে বারবার কেঁপে ওঠে আর্জেন্টিনার রক্ষণ। একাধিক নিশ্চিত গোলের সুযোগও সৃষ্টি করে স্প্যানিশরা। তবে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা এমি মার্টিনেজ একের পর এক অসাধারণ সেভ করে ম্যাচকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করেন। অন্যদিকে পুরো ম্যাচজুড়েই কার্যকর কোনো আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেনি আর্জেন্টিনা। ফলে তাদের পরিকল্পনা ধীরে ধীরে পেনাল্টি শুটআউটের দিকেই এগোচ্ছিল। কিন্তু একপেশে লড়াইয়ে শেষমেশ হতাশাকেই সঙ্গী করে মাঠে ছেড়েছে আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের শুরু থেকেই নিজেদের স্বভাবসুলভ পাসিং ফুটবল খেলতে থাকে স্পেন। মাত্র ৫ মিনিটেই বড় সুযোগ তৈরি করেন লামিন ইয়ামাল। তার ক্রস ডিফ্লেক্ট হয়ে পৌঁছায় দানি ওলমোর কাছে। ওলমোর ফিরিয়ে দেওয়া বলে ইয়ামালের শট যৌথভাবে রুখে দেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ।
১৭তম মিনিটে মেসিকে ফাউল করে স্পেন ফ্রি-কিক উপহার দেয় আর্জেন্টিনাকে। রদ্রিগো ডি পলের নেওয়া সেই ফ্রি-কিক থেকে ব্যাক পোস্টে থাকা নিকো গনসালেসকে খুঁজে পাওয়া গেলেও বল নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি তিনি।
২২তম মিনিটে প্রথমবারের মতো নিজের ঝলক দেখান মেসি। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে এগিয়ে দারুণ এক থ্রু পাস বাড়ান নিকো গনসালেসের উদ্দেশে। তবে নিকোর দুর্বল প্রথম স্পর্শে নষ্ট হয়ে যায় সম্ভাবনাময় আক্রমণ।
এরপরও আক্রমণের ধার কমেনি স্পেনের। ৩৩তম মিনিটে আলেক্স বায়েনার ক্রস আর্জেন্টিনার রক্ষণ সামাল দিলেও চাপ অব্যাহত রাখে স্পেন। ৩৫তম মিনিটে ফাবিয়ান রুইজের চমৎকার পাসে বাম দিক দিয়ে উঠে আসেন মার্ক কুকুরেয়া, কিন্তু তার ক্রস সতীর্থদের কাছে পৌঁছায়নি।
৩৯তম মিনিটে ম্যাচের সবচেয়ে বড় সুযোগ পায় স্পেন। লাপোর্তে, রদ্রি ও বায়েনার সমন্বিত আক্রমণের পর ফাবিয়ান রুইজ বল দেন মিকেল ওইয়ারসাবালকে। বক্সের বাইরে থেকে তার জোরালো বাঁ-পায়ের শট নিচু হয়ে দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ।
৪১তম মিনিটে বিপজ্জনক আক্রমণ থামাতে গিয়ে ওইয়ারসাবালকে ফাউল করেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। এই ঘটনায় ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার। তবে সেই চ্যালেঞ্জেই চোট পান তিনি। চিকিৎসার পরও চালিয়ে যেতে না পারায় ৪৪তম মিনিটে তার বদলে মাঠে নামেন নিকোলাস ওতামেন্দি।
প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে দূরপাল্লার শটে চেষ্টা করেন কুকুরেয়া। তবে তার বাঁ-পায়ের শট অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে চলে যায়।
শেষ পর্যন্ত গোলের দরজা খুলতে পারেনি কোনো দলই। স্পেনের আধিপত্য আর আর্জেন্টিনার প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে গোলশূন্য সমতায় শেষ হয় প্রথম ৪৫ মিনিট।
বিরতির পর ফের ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নেয় স্পেন। একের পর এক আক্রমণে আর্জেন্টিনার রক্ষণকে চাপে রাখলেও গোলের দেখা পায়নি তারা। অন্যদিকে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের অসাধারণ গোলকিপিং আর শেষ দিকে এনসো ফার্নান্দেজের লাল কার্ডে ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া আর্জেন্টিনাকে নিয়ে নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হয় গোলশূন্য সমতায়।
৪৬তম মিনিটে লিয়ান্দ্রো পারেদেসের ভুল পাস থেকে দারুণ সুযোগ পান আলেক্স বায়েনা। তবে তার শট দক্ষতার সঙ্গে ঠেকিয়ে দেন মার্টিনেজ।
৫২তম মিনিটে ম্যাচে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বদলি হিসেবে নামা পারেদেস পিছন থেকে রদ্রিকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে কিছুক্ষণ উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এরপর স্পেনের চাপ আরও বাড়তে থাকে। ৫৫তম মিনিটে নিকোলাস ওতামেন্দির সময়োপযোগী ট্যাকল নিশ্চিত গোল বাঁচায়। এক মিনিট পর গঞ্জালো মন্টিয়েল গোললাইন থেকে বল ক্লিয়ার করে দলকে রক্ষা করেন। ৬৪তম মিনিটে দানি ওলমোর শট মার্টিনেজের হাত ফসকে গেলেও শেষ পর্যন্ত বল জালে জড়ায়নি।
ম্যাচে নতুন গতি আনতে ৬২তম মিনিটে একসঙ্গে দুই পরিবর্তন করেন স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। মিকেল ওইয়ারসাবালের বদলে ফেরান তোরেস এবং ফাবিয়ান রুইজের জায়গায় পেদ্রিকে নামানো হয়। ৭৫তম মিনিটে আলেক্স বায়েনার পরিবর্তে নিকো উইলিয়ামস ও দানি ওলমোর জায়গায় মিকেল মেরিনোকে নামিয়ে আক্রমণ আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন তিনি।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিকে একের পর এক পরিবর্তন করতে হয়। পারেদেসকে মাঠে নামানোর পর চোটের কারণে গঞ্জালো মন্টিয়েল ও ক্রিস্তিয়ান রোমেরো মাঠ ছাড়েন। এ ছাড়া রদ্রিগো ডি পলের পরিবর্তে জুলিয়ানো সিমেওনেকেও নামানো হয়।
ম্যাচের ৬৫ মিনিটের পর স্পেনের আক্রমণের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। লামিনে ইয়ামালের ড্রিবলিং, পেদ্রি, ফেরান তোরেস, আয়মেরিক লাপোর্তে ও পাও কুবার্সির একের পর এক প্রচেষ্টা দুর্দান্ত দক্ষতায় রুখে দেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। বিশেষ করে ৬৭তম মিনিটে ইয়ামালের নিখুঁত ক্রস থেকে ফেরান তোরেসের হেড এবং ৮০তম মিনিটে লাপোর্তের শক্তিশালী হেড ঠেকিয়ে ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে টিকিয়ে রাখেন তিনি।
শেষ ১০ মিনিটে নাটকীয়তা আরও বাড়ে। ৮২তম মিনিটে প্রতিবাদ জানিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন এনসো ফার্নান্দেজ। এরপর যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে মাঝমাঠে পাও কুবার্সির ওপর বিপজ্জনক ট্যাকল করায় সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ। ফলে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ১০ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা।
অতিরিক্ত চার মিনিট যোগ হলেও গোলের দেখা মেলেনি। ফলে নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য সমতায় শেষ হয় এবং বিশ্বকাপ ফাইনালের ভাগ্য নির্ধারণের লড়াই গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল স্পেন। ৯৬তম মিনিটে নিকো উইলিয়ামস বল জালে পাঠিয়ে ভেবেছিলেন দলকে এগিয়ে দিয়েছেন। তবে গোলের আগে মিকেল মেরিনো আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দিকে ফাউল করেছিলেন বলে সিদ্ধান্ত দেন রেফারি। ফলে গোলটি বাতিল হয়ে যায়।
ঘটনাটি ভিএআরেও পর্যালোচনা করা হয়। তবে মাঠের সিদ্ধান্তই বহাল থাকে, আর গোলবঞ্চিত হয় স্পেন।
তবে অপেক্ষা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই কাঙ্ক্ষিত গোল পেয়ে যায় স্পেন। ১০৬তম মিনিটে পেদ্রো পোরোর ক্রস থেকে নিকো উইলিয়ামসের শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ফিরতি বল পেয়ে ঠান্ডা মাথায় জালে পাঠান ফেরান তোরেস। বিশ্বকাপ ফাইনালে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নেমে গোল করার কীর্তি গড়েন তিনি।
এরপর ১১৩তম মিনিটে আবারও গোল করেছিলেন তোরেস। তবে অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়ে যায়।
শেষ মুহূর্তে সমতায় ফেরার চেষ্টা করে আর্জেন্টিনা। ১২০তম মিনিটে মেরিনো ও পাও কুবার্সির প্রচেষ্টা কাজে লাগেনি। লিওনেল মেসির ফ্রি-কিক থেকে জুলিয়ানো সিমেওনে গোলের সুযোগ পেলেও বলের সঙ্গে ঠিকমতো সংযোগ করতে পারেননি। পরে তার আরেকটি শট চলে যায় গোলবারের ওপর দিয়ে।
শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল না হওয়ায় ১-০ ব্যবধানের জয় নিয়ে বিশ্বকাপের মুকুট পরে স্পেন। ২০১৪ সালের ফাইনালে মারিও গোটসের গোলে জার্মানির কাছে হারের পর এবার আবারও বিশ্বকাপ ফাইনালে পরাজয়ের স্বাদ পেল আর্জেন্টিনা।