ব্রাজিলের বিপক্ষে জিনেদিন জিদান © টিডিসি ফটো
২০০৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে ব্রাজিলের বিদায়ের পর সেলেসাওদের কান্নাসিক্ত ড্রেসিংরুমে আকস্মিকভাবে হাজির হয়েছিলেন ফরাসি মহানায়ক জিনেদিন জিদান। ম্যাচসেরা নির্বাচিত হওয়া জিদান সেখানে এসেছিলেন বন্ধুত্বের খাতিরে জার্সি বদল করতে, কিন্তু চরম শোকাবহ সেই মুহূর্তে তাকে ড্রেসিংরুম থেকে বের হয়ে যেতে বলেছিলেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোনাল্ডো ফেনোমেনো।
দীর্ঘ বছর পর ফরাসি সংবাদপত্র ’লা'একিপ’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সেই ঐতিহাসিক বিশ্বকাপের ড্রেসিংরুমের ভেতরকার অজানা ও নাটকীয় এই ঘটনা প্রকাশ্যে এনেছেন রোনাল্ডো, যা ফুটবল বিশ্বে নতুন করে আলোড়ন তৈরি করেছে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যমকে রোনাল্ডো সেই বিশ্বকাপের খুঁটিনাটি প্রকাশ করে বলেন, জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে ১-০ গোলে হারের পর ব্রাজিলের লকার রুমের পরিবেশ ছিল পুরোপুরি থমথমে ও বেদনাদায়ক।
সেদিনের ঘটনার স্মৃতিচারণ করে রোনাল্ডো বলেন, ‘পরে আমাদের কথা হয়েছিল। সে আমাদের লকার রুমে এসেছিল, কিন্তু সেখানকার পরিবেশ ছিল ভয়াবহ, অনেক খেলোয়াড় কাঁদছিল। আমরা বন্ধু ছিলাম এবং এখনও আছি... কিন্তু জার্সি বদল করার জন্য ওটা সত্যিই সঠিক সময় ছিল না। আমি তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম, কিন্তু চলে যেতে বলেছিলাম।’
অথচ সেই টুর্নামেন্টে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলই ছিল আসরের সবচেয়ে হট ফেভারিট। সবুজ-হলুদ দলটিতে তখন রোনাল্ডো ছাড়াও রোনালদিনহো গাউচো, রবার্তো কার্লোস, কাফু, আদ্রিয়ানো এবং কাকার মতো বিশ্বসেরা তারকাদের মেলা ছিল। কিন্তু কোয়ার্টার-ফাইনালের সেই রাতে জিনেদিন জিদানের অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের কাছে একপ্রকার জাদুবন্দী হয়ে পড়ে সেলেসাওরা। মাঝমাঠে বল দখলের লড়াইয়ে একপর্যায়ে জিদান স্বয়ং রোনাল্ডোর পায়ের ফাঁক দিয়ে বল বের করে নেওয়ার মতো অবিশ্বাস্য ক্যারিশমা দেখান, যা ম্যাচটিকে এককভাবে ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যায়।
জিদানের সেই অবিশ্বাস্য ফুটবলশৈলীর প্রশংসা করে রোনাল্ডো আরও যোগ করেন, ‘তিনি সত্যিই অনুপ্রাণিত ছিলেন, এবং এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে তার পারফরম্যান্সকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচনা করা হয়।’
উল্লেখ্য, সেই বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিয়ে ফ্রান্স ফাইনালে পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত ইতালির কাছে টাইব্রেকারে হেরে রানার্স-আপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। আর সেটিই ছিল জিদানের ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ, যেখানে ইতালির ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জিকে ঢুস (হেডবাট) মারার অপরাধে তাকে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল।
সাক্ষাৎকারের শেষ অংশে রোনাল্ডো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের বর্তমান সংকট এবং বিশ্বমঞ্চে আগের সেই একচ্ছত্র আধিপত্য হারানোর পেছনের কারণগুলো নিয়েও নিজের স্পষ্ট মতামত তুলে ধরেন।
১৯৯৪ ও ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী এই কিংবদন্তি বলেন, ‘আমরা বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটি নিয়ে কথা বলছি। সারা বিশ্বেই অসাধারণ খেলোয়াড় এবং দুর্দান্ত দল রয়েছে। বিগত বছরগুলোতে ব্রাজিল তার অবিসংবাদিত ফেভারিটের মর্যাদা হারিয়েছে, কিন্তু ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে এটি এখনও বিবেচিত হয়।’
এর পেছনে সেলেসাওদের গৌরবময় অতীতকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘চিরকালের ফেভারিট হিসেবে ব্রাজিলের ইতিহাস এবং আমাদের সংস্কৃতিতে ফুটবলের গভীরভাবে প্রোথিত অবস্থানের কারণে প্রত্যাশা সবসময়ই অনেক বেশি থাকে।’