আর্জেন্টিনা ফুটবল দল © সংগৃহীত
বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘এইচ’-এ তৈরি হওয়া তীব্র নাটকীয়তা এখন সরাসরি প্রভাব ফেলছে আর্জেন্টিনার নকআউট পর্বের ভাগ্যের ওপর। সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে স্পেন ৪ পয়েন্ট নিয়ে এখন টেবিলের শীর্ষে রয়েছে। অন্যদিকে কেপ ভার্দের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করায় উরুগুয়ের অবস্থান কিছুটা জটিল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে উরুগুয়ে ও কেপ ভার্দের পয়েন্ট সমান ২ করে এবং সৌদি আরবের পয়েন্ট ১।
এই গ্রুপের জটিল সমীকরণের দিকেই এখন বিশেষ নজর রাখছে আর্জেন্টিনা, কারণ গ্রুপ পর্ব শেষে এখান থেকেই নির্ধারিত হবে শেষ বত্রিশে তাদের আসল প্রতিপক্ষ।
নিজেদের ‘জে’ গ্রুপে শীর্ষ দুইয়ের মধ্যে থাকতে হলে আর্জেন্টিনাকে অবশ্যই অস্ট্রিয়াকে হারাতে হবে এবং একই সঙ্গে জর্ডান যেন নিজেদের ম্যাচে জিততে না পারে, সেই অপেক্ষায় থাকতে হবে। ফুটবলপ্রেমীরা এই সহজ সমীকরণ হিসেব করলেও আরও কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি রয়েছে, যার মাধ্যমে আর্জেন্টিনা গ্রুপের শীর্ষে থেকে পরের পর্বে উঠতে পারে। তবে আর্জেন্টিনা যদি কোনো কারণে নিজেদের গ্রুপে তৃতীয় স্থানে শেষ করে, তাহলে শেষ বত্রিশে তাদের প্রতিপক্ষ হতে পারে ‘ডি’, ‘জি’, ‘এল’, ‘বি’ কিংবা ‘কে’ গ্রুপের শীর্ষে থাকা কোনো দল।
আপাতত ফুটবল মহলে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সেই সম্ভাবনা, যেখানে আর্জেন্টিনা গ্রুপের প্রথম বা দ্বিতীয় হয়ে শেষ বত্রিশে উঠবে। আর সেটি হলে ‘এইচ’ গ্রুপের শেষ ম্যাচগুলোর ফলই সরাসরি নির্ধারণ করবে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ কে হচ্ছে। গ্রুপ ‘এইচ’-এর শেষ ম্যাচে আগামী শুক্রবার রাত ৯টায় মুখোমুখি হবে উরুগুয়ে ও স্পেন এবং একই সময়ে অন্য ম্যাচে মাঠে নামবে কেপ ভার্দে ও সৌদি আরব।
আর্জেন্টিনা যদি নিজেদের গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হতে পারে, তাহলে ‘এইচ’ গ্রুপের সমীকরণ অনুযায়ী তাদের প্রতিপক্ষ নির্ধারণের সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলো হবে ঠিক এইরকম—
* উরুগুয়ে জিতলে এবং কেপ ভার্দে ড্র বা হারলে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হবে স্পেন।
* উরুগুয়ে ও কেপ ভার্দে দু'দলই যদি নিজ নিজ ম্যাচে জেতে, তবে গোল ব্যবধানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে কোন দল দ্বিতীয় স্থানে থাকবে। বর্তমানে দুই দলেরই গোল ব্যবধান শূন্য। যদি শেষ পর্যন্ত গোল ব্যবধান সমান থাকে, তবে বেশি গোল করা দল এগিয়ে যাবে। সেখানেও সমতা থাকলে ফেয়ার প্লে পয়েন্ট বিবেচনা করা হবে, যেখানে বর্তমানে এক হলুদ কার্ড কম থাকায় উরুগুয়ে এগিয়ে রয়েছে।
* যদি ‘এইচ’ গ্রুপের দুটি ম্যাচই ড্র হয়, তাহলেও একই নিয়মে উরুগুয়ে ও কেপ ভার্দের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান নির্ধারিত হবে। তবে সে ক্ষেত্রে তারা শীর্ষস্থান নয়, লড়বে দ্বিতীয় স্থানের জন্য।
* কেপ ভার্দে জিতলে এবং উরুগুয়ে ড্র করলে, তবে কেপ ভার্দে যদি চার গোলের কম ব্যবধানে জেতে, তাহলে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হবে কেপ ভার্দে।
* কেপ ভার্দে ঠিক চার গোলের ব্যবধানে জিতলে স্পেনের সঙ্গে তাদের পয়েন্ট সমান হবে এবং তখন গোলসংখ্যা কিংবা ফেয়ার প্লে সূচকে গ্রুপের শীর্ষস্থান নির্ধারিত হবে।
* কেপ ভার্দে চার বা তার বেশি গোলের ব্যবধানে জিতলে এবং উরুগুয়ে ড্র করলে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হবে স্পেন।
* উরুগুয়ে যদি জিততে না পারে এবং সৌদি আরব জয় পায়, তবে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হবে সৌদি আরব।
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য পথও অনেকটা পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। সে ক্ষেত্রে শেষ বত্রিশের নকআউট পর্বে ‘এইচ’ গ্রুপের রানার্সআপ দলের মুখোমুখি হবে লিওনেল স্কালোনির দল। বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী এই ধাপ পার হতে পারলে পরের পর্বে প্যারাগুয়ে অথবা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলতে হতে পারে তাদের। আরও সামনে এগিয়ে যেতে পারলে ‘ডি’ ও ‘জি’ গ্রুপের রানার্সআপদের মধ্যকার অংশ থেকে ইরান অথবা মিসরের মতো দলের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে আর্জেন্টিনার।
তবে এই সমস্ত জটিল হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি নির্ভর করছে নতুন টাইব্রেকার পদ্ধতির ওপর। ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে অলিম্পিক পদ্ধতিতে সমতা ভাঙার নতুন নিয়ম চালু করেছে ফিফা। এই নিয়ম অনুযায়ী দুই বা তার বেশি দল সমান পয়েন্ট পেলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর পারস্পরিক ম্যাচের ফলাফল দেখা হবে। এরপর দেখা হবে সেই ম্যাচগুলোতে কারা বেশি গোল ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। সেখানেও সমতা থাকলে পারস্পরিক ম্যাচে কে বেশি গোল করেছে, তা বিবেচনা করা হবে। এরপরও কোনো সমাধান না হলে পুরো গ্রুপ পর্বের গোল ব্যবধান দেখা হবে। পরে বিবেচনায় আসবে গ্রুপ পর্বে দলগুলোর মোট গোলসংখ্যা। তারপর দেখা হবে লাল কার্ডের সংখ্যা এবং এরপর হলুদ কার্ডের সংখ্যা। সবশেষে কোনো সমাধান না মিললে ফিফা র্যাঙ্কিং বিবেচনা করা হবে।
এই পথ পার হয়ে আর্জেন্টিনা যদি কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পারে, তবে তাদের সামনে কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে আসতে পারে পর্তুগাল। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দল এখন নিজেদের গ্রুপে কলম্বিয়ার সঙ্গে শীর্ষস্থান নিয়ে লড়াই করছে। এছাড়া কাতার ও বসনিয়ার সঙ্গে থাকা ‘বি’ গ্রুপ থেকে সুইজারল্যান্ড বা কানাডাও আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হতে পারে। সেমিফাইনালে যেতে পারলে স্কালোনির দলের পথে ব্রাজিল ও ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দল চলে আসতে পারে, যদি তারা নিজ নিজ গ্রুপে শীর্ষস্থান ধরে রাখতে পারে।
অন্যদিকে টুর্নামেন্টের ড্রয়ের বিশেষ কাঠামোর কারণে জার্মানি,ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, স্পেন কিংবা বেলজিয়ামের মতো পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে আর্জেন্টিনার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কেবল ফাইনালে। তবে সেজন্য ওই দলগুলোকেও নিজেদের নিজ নিজ গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বে এগিয়ে আসতে হবে। ফলে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে নিজেদের ম্যাচের পাশাপাশি এখন আর্জেন্টিনার সমর্থকদের গভীর নজর থাকবে ‘এইচ’ গ্রুপের শেষ রাউন্ডের ম্যাচগুলোর দিকেও। কারণ ওই মাঠের ফলই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মেসিদের সম্ভাব্য পথ কোন দিকে যাচ্ছে।