নেইমার © টিডিসি ফটো
বিশ্বকাপের ব্রাজিল দলে নেইমারের অন্তর্ভুক্তি ঘিরে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে থাকা, চোট প্রবণতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ফুটবল না খেললেও তাকে দলে নেওয়ায় প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
সমালোচকদের মতে, প্রায় আড়াই বছর ধরে জাতীয় দলের বাইরে থাকা একজন ফুটবলারকে হঠাৎ করে বিশ্বকাপ দলে নেওয়া খুব একটা যৌক্তিক নয়। নেইমার ইনজুরিপ্রবণ খেলোয়াড়, চোট কাটিয়ে ফেরার পরও খুব বেশি ম্যাচ খেলতে পারেননি। ফলে তার উপস্থিতি দলের জন্য বাড়তি বোঝা বা ‘শ্বেত হস্তী’ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেও মত তাদের।
অন্যদিকে সমর্থকদের দাবি, ব্রাজিল দলে প্রতিভার অভাব নেই, কিন্তু নেতৃত্ব দেওয়ার মতো একজন ফুটবলার দরকার ছিল। তাদের মতে, পুরো দলকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা নেইমারের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নেইমার কি মূল একাদশে থাকবেন? যদি না থাকেন, তাহলে প্রতি ম্যাচে কত মিনিট খেলবেন? কেন তাকে আরও বেশি সময় মাঠে ব্যবহার করা হবে না? বিশ্বকাপে তার উপস্থিতি উদাসীনতা নয়, বরং নানা ধরনের আবেগ ও আলোচনার জন্ম দেবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি ঠিক কী কারণে সান্তোস তারকাকে দলে নিয়েছেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে তিনি শুরু থেকেই বলে আসছিলেন, নেইমারের শারীরিক সুস্থতা নিয়ে নিশ্চিত হলেই তাকে বিবেচনায় আনা হবে। যদিও প্রশ্ন উঠেছে, ‘শারীরিক সুস্থতা’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে। কারণ কয়েকটি ম্যাচে মাঠে নামলেও পুরোনো নেইমারের সেই গতি, কারিগরি দক্ষতা কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ছন্দ এখনও পুরোপুরি দেখা যায়নি।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রাফিনিয়াকে বাদ দিলে আক্রমণভাগে বড় মাপের তারকার অভাবও হয়তো সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। রায়ান ও ইগর থিয়াগোর মতো ফুটবলারদের জাতীয় দলে অভিজ্ঞতা খুব কম, বড় ম্যাচে তারা কতটা কার্যকর হবেন, তা নিয়েও রয়েছে সংশয়।
হয়তো আনচেলত্তি বুঝেছেন, নেইমারকে বাদ দিলে তার ওপর আরও বড় চাপ তৈরি হতো। দল ঘোষণার অনুষ্ঠানেই নেইমারের নাম ঘোষণার পর যেভাবে উল্লাস দেখা গেছে, তাতে বোঝা যায় সমর্থকদের প্রত্যাশা কতটা বেশি। ‘মিউজিয়াম অব টুমরো’র বাইরে পর্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। আর এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে, আনচেলত্তি কেবল স্বল্পমেয়াদি দায়িত্বে আসেননি; আগামী চার বছরও তিনি ব্রাজিল দলের কোচ হিসেবে থাকবেন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের কারণে নেইমারকে দলে নেওয়া হয়নি। বরং তার অতীত সাফল্য, ব্যক্তিত্ব এবং বিশ্ব ফুটবলে দীর্ঘদিনের প্রভাবই তাকে জায়গা করে দিয়েছে। কোচিং স্টাফ হয়তো বিশ্বাস করেছে, বিশ্বকাপের মঞ্চ আবারও জাগিয়ে তুলতে পারে তার সুপ্ত প্রতিভাকে।
এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি হতাশ হওয়ার কারণ আছে তরুণ জোয়াও পেদ্রোর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করে ব্রাইটন থেকে চেলসিতে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। ক্লাব বিশ্বকাপেও ভালো ছাপ রেখেছেন। কিন্তু জায়গা হারাতে হয়েছে এমন একজনের কাছে, যিনি এই পুরো বিশ্বকাপ চক্রে খুব কম সময় উচ্চ পর্যায়ের ফুটবল খেলেছেন।
সব মিলিয়ে এই দল বর্তমান ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের বাস্তব চিত্রও তুলে ধরেছে। স্থানীয় লিগের সাতজন ফুটবলারের উপস্থিতি দেখাচ্ছে, দেশটির ক্লাবগুলোর আর্থিক শক্তি বেড়েছে। তবে এটাও সত্য, এটি ব্রাজিলের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিভাবান দল নয়।
একসময় ফুলব্যাক পজিশনে যেখানে প্রতিভার ছড়াছড়ি ছিল, এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে অভিজ্ঞ দানিলো ও অ্যালেক্স সান্দ্রোর মতো নাম। ডগলাস সান্তোসও ৩২ বছর বয়সে বিশ্বকাপ দলে জায়গা পেয়েছেন। মিডফিল্ডে ফাবিনিওর উপস্থিতি দেখাচ্ছে, কাসেমিরোর বিকল্প খুঁজে পাওয়া এখনও কঠিন হয়ে আছে। পাশাপাশি আগের মতো খেলা নিয়ন্ত্রণ করতে পারা মিডফিল্ডারও এখন খুব কম তৈরি হচ্ছে ব্রাজিলে।
আক্রমণে রাফিনিয়া ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের প্রতিভা থাকলেও এস্তেভাও ও রদ্রিগোর অনুপস্থিতি চোখে পড়ছে। সেই শূন্যতায় সুযোগ পেয়েছে কম অভিজ্ঞ তরুণ ফুটবলাররা।
এই দলে ম্যাচ জেতানোর মতো প্রতিভা আছে, কিন্তু দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও এলোমেলো পরিকল্পনার কারণে ব্রাজিল এখনও একটি পরিপূর্ণ ও সুসংগঠিত দল হয়ে উঠতে পারেনি। তারা হয়তো এবারের বিশ্বকাপে প্রধান ফেভারিট নয়, তবে ব্রাজিল সবসময়ই শিরোপার অন্যতম দাবিদার।