মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ধূমপানমুক্ত ক্যাম্পাসে প্রতিদিন লাখ টাকার সিগারেট বিক্রি © সংগৃহীত ও সম্পাদিত
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (মাভাবিপ্রবি) প্রশাসন গত ২০২৪ সালের ১২ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়কে শতভাগ ধূমপানমুক্ত ঘোষণা করে ‘স্মোক-ফ্রি পলিসি’ জারি করে। নীতিমালা অনুযায়ী ক্যাম্পাসের ভবন, আবাসিক হল, ক্যাফেটেরিয়া, ক্যান্টিন, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যানবাহনে ধূমপান, তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার, বিক্রি ও সংরক্ষণ নিষিদ্ধ। তবে নীতিমালা জারির প্রায় দুই বছর পরও ক্যাম্পাসসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। এতে ধূমপানমুক্ত নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, হলসংলগ্ন এলাকা, বিভিন্ন গেট ও আশেপাশের এলাকার দোকানগুলোতে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। সম্প্রতি খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শহীদ ওসমান হাদী হলের পাশে আল-আমিন দেড় হাজার, জননেতা আব্দুল মান্নান হলের পাশে নাঈমুর রহমান ৩ হাজার এবং শহীদ আবরার ফাহাদ হল এলাকার শাজাহান মিয়া ১ হাজার টাকার দৈনিক সিগারেট বিক্রি করেন।
হলের পেছনের মার্কেটেও রয়েছে জমজমাট ব্যবসা। সেখানে ইয়াসিন মিয়া ৮শ টাকা, আব্দুর রাজ্জাক ২ হাজার টাকা এবং মাজেদুল ইসলাম ৪ হাজার টাকার সিগারেট দৈনিক বিক্রি করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক এলাকায় সিগারেট বিক্রি সবচেয়ে বেশি। সেখানের আনন্দ সরকারের চায়ের দোকানে ৩০ হাজার টাক দৈনিক সর্বোচ্চ বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া কুশি কুমার ৭ হাজার, জুয়েল রানা ২ হাজার, শাহিনুর রহমান খান ১৫শ এবং মিঠু শিকদার ১৫শ টাকার সিগারেট বিক্রি করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় বাজারেও বিপুল পরিমাণ সিগারেট বিক্রি হয়। সেখানে সৌরভ দাস ২৫ হাজার, উল্লাস ভ্যারাইটিজ স্টোর ১০ হাজার, নিমাই স্টোর ৭ হাজার, আব্দুল আলিম ৫ হাজার, মো. সুহেল ৩ হাজার, আনন্দ সরকার—মুদি দোকান ৩ হাজার, গণেশ চন্দ্র কর্মকার ২৫শ, আইয়ুব খান ২ হাজার, ইমন আলী ২ হাজার, শামীম খান ১৫শ, আবু সাঈদ ১৫শ, শাহ আলম ১ হাজার, জিতেন দাস ১ হাজার এবং রফিকুল ইসলাম ৩শ টাকা পরিমাণে দৈনিক সিগারেট বিক্রি করেন।
ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গেট ও গেটসংলগ্ন বিভিন্ন স্থানেও একই চিত্র। পঞ্চম গেটে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শরিফা বেগম ১৫শ, আশরাফুল ইসলাম ২ হাজার, বিশ্বজিৎ দে ২ হাজার ৫শত টাকার সিগারেট বিক্রি করেন।
ক্যাম্পাসের তৃতীয় গেটে শাহিন শিকদার ৪ হাজার, হাবিবুর রহমান ১৫শ এবং মাসুদ সরকার ১ হাজার টাকার সিগারেট প্রতিদিন বিক্রয় করেন।
দ্বিতীয় গেটে আতাউর রহমান মোল্লা ১৫শ, জামিরুল ২ হাজার, মান্নান ৪ হাজার ও সাব্বির হোসেন ১০ হাজার টাকার সিগারেট বিক্রি করেন।
এছাড়া পুলিশ ফাঁড়ি এলাকায় জাহাঙ্গীরনগর আলম ৮, বিপ্লব হাসান ৫ হাজার, জলিল মিয়া ১৫শ, নুরুল ইসলাম ২ হাজার, নজরুল ইসলাম ২ হাজার, আকাশ রহমান ২ হাজার ও লালন মিয়া ২ হাজার টাকার সিগারেট বিক্রি করেন।
ক্যাম্পাসের আশেপাশে বিভিন্ন মেস ও ছাত্রাবাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের এলাকাগুলোর মধ্যে সেনানগর এলাকায় কুদ্দুস মিয়া ১২শ, লাল মিয়া সাড়ে ৪ হাজার, আবু হানিফ ১২শ, আশরাফ আলী ৫শ, আব্দুল হালিম ৬শত টাকার সিগারেট বিক্রি করেন। আরিফনগর এলাকায় দুই হাজার টাকা, বাগবাড়ি বক্ষব্যাধি হাসপাতাল রোডে সাড়ে ৪ হাজার টাকার সিগারেট বিক্রি করে থাকেন দোকানীরা।
আশেপাশের অন্যান্য এলাকাগুলোর মধ্যে চারাবাড়ি রোডে রাম ঘোষ ১৫শ, বোরহান আলী সাড়ে ৩ হাজার, খোরসেদ আলম ৭ হাজার, সেলিম রেজা ২ হাজার টাকার সিগারেট বিক্রি করেন।
ঘোষপাড়া ঢাল এলাকায়- বীর ঘোষ ৫শ, চান মিয়া ১ হাজার, ইলিয়াস হোসেন উজ্জ্বল ১২শ, অলিদ খান ১ হাজার, সুব্রত চৌধুরী ১ হাজার টাকার সিগারেট বিক্রি করেন। পার্শ্ববর্তী ঘোষপাড়া মন্দির বিল্ডিংয়ে সুব্রত ঘোষ আড়াই হাজার, সহদেব ঘোষ ২ হাজার টাকার সিগারেট বিক্রি করেন।
এছাড়া ধোপাপাড়ায় আল-আমিন সাড়ে ৩ হাজার, লক্ষণ স্টোর ২ হাজার, পালপাড়া রোডের হামিদা বেগম আড়াই হাজার, জাহিদ হাসান ৩ হাজার ও সাইদুর রহমান ১ হাজার টাকার সিগারেট বিক্রি করে থাকেন।
ক্যাম্পাসে ধূমপান বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ধূমপায়ী শিক্ষার্থী বলেন, ক্যাম্পাসের আশপাশে খুব সহজেই সিগারেট পাওয়া যায়। ক্লাসের ফাঁকে বা বন্ধুদের আড্ডায় অনেকেই চায়ের সাথে ধূমপান করেন। অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে এর তেমন কোনো প্রভাব নেই।
ধূমপানবিরোধী এক শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ধূমপানমুক্ত ক্যাম্পাস ঘোষণা করেছে। কিন্তু হলের পাশেই যখন সিগারেট বিক্রি হয়, তখন নীতিমালার বাস্তবায়ন নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
আরেক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, ধূমপান পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হতে পারে। তবে অন্তত শিক্ষার্থীদের নিয়মিত চলাচলের এলাকা ও ক্যাম্পাসসংলগ্ন স্থানে তামাকজাত পণ্যের সহজলভ্যতা কমানো উচিত।
এ বিষয়ে মাভাবিপ্রবির শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. ফজলুল করিম বলেন, আমরা অবশ্যই ধুমপানকে নিরুৎসাহিত করি। তবে আমাদের দেশের মতো একটি দেশে ধূমপান সম্পূর্ণ নির্মূল করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। ইউরোপ-আমেরিকার মতো দেশকেও ধূমপান নির্মূল বিষয়ক আইন প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন নিয়ে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। সবদিক বিবেচনায় আমরা যেটা করতে পারি, সেটি হলো যারা স্মোকিং করে তাদের জন্যে নির্দিষ্ট স্মোকিং জোন তৈরি করা। এতে করে নন-স্মোকার কারোর সমস্যা কম হবে। খোলামেলা পরিবেশ বা যেখানে সেখানে স্মোকিংকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।
প্রসঙ্গত উপ-রেজিস্ট্রার (রেজিস্ট্রার অফিস-একাডেমিক) মো. মাকসুদুর রহমান গত ২০২৪ সালের ১২ নভেম্বর নীতিমালায় স্বাক্ষর করেন এবং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত। স্মোক-ফ্রি পলিসি অনুযায়ী নীতিমালায় বলা হয়েছে- বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন সকল ভবন, হল, ক্যাফেটেরিয়া, অফিস, লাইব্রেরি, উন্মুক্ত স্থান ও যানবাহনে ধূমপান এবং তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার, বিক্রি ও সংরক্ষণ নিষিদ্ধ। নীতিমালার বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রেজিস্ট্রার দপ্তর, প্রক্টর অফিস, ক্যাম্পাস নিরাপত্তা বিভাগ, ছাত্রকল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্র, মেডিকেল সেন্টার এবং আবাসিক হল কর্তৃপক্ষকে। নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
ধূমপানমুক্ত নীতিমালা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন এলাকাগুলোর জন্য প্রযোজ্য। তবে ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকায় সহজলভ্যভাবে সিগারেট বিক্রি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, নীতিমালার উদ্দেশ্য পূরণে কার্যকর নজরদারি ও তামাক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনও দৃশ্যমান হয়নি। একদিকে ধূমপানমুক্ত ক্যাম্পাসের ঘোষণা, অন্যদিকে ক্যাম্পাসের প্রবেশমুখ ও হলসংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকার সিগারেট বিক্রি—এই বাস্তবতা নীতিমালার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।