জাবিপ্রবিতে সম্ভাবনার দীপ্তি থাকলেও বাধা নানা সংকট, ডিপিপির অনিশ্চয়তাও কাটেনি

জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় © টিডিসি ফটো

ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার সবুজে ঘেরা জনপদ জামালপুর। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত বিকাশে পিছিয়ে থাকা এই অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (জাবিপ্রবি)। ২০১৭ সালের ২৮ নভেম্বর যাত্রা শুরু করা দেশের ৪৪তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টি আজ কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের শিক্ষা জাগরণ, গবেষণা সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায়।

মূল শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে, দেবদারু গাছের সারি বেষ্টিত নিরিবিলি পরিবেশে গড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃতির সৌন্দর্য আর জ্ঞানচর্চার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। ছয়টি অনুষদের অধীনে সাতটি বিভাগে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিশ্ববিদ্যালয়টি ইতোমধ্যে প্রযুক্তি, কৃষি, গবেষণা ও সমাজভিত্তিক জ্ঞানচর্চায় নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। তবে এর বিপরীতে রয়েছে তীব্র অবকাঠামোগত সংকট, যা প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করছে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রতিভা বিকাশের পথ।

শিক্ষা ও সমাজ পরিবর্তনের কেন্দ্র

জামালপুর জেলার সাক্ষরতার হার জাতীয় গড়ের তুলনায় এখনও অনেক কম। এমন বাস্তবতায় জাবিপ্রবির প্রতিষ্ঠা এই অঞ্চলের মানুষের জন্য আশার বাতিঘর হয়ে উঠেছে। বিশেষত নারীশিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রভাব দৃশ্যমান। যে পরিবারগুলো একসময় কন্যাসন্তানের উচ্চশিক্ষাকে গুরুত্ব দিত না, তারাও এখন সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে আগ্রহী হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতিতেও এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আবাসন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রম। স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিবছর গুচ্ছভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে হাজারো শিক্ষার্থীর আগমনে পুরো অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে সচল হয়ে ওঠে।

একাডেমিক কার্যক্রমের বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ সমাজের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগ প্রান্তিক মৎস্যচাষিদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ করছে। কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীরা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার ও ডেটাবেজ উন্নয়নে সহায়তা করছে। ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রতিনিধিত্ব করছে। রোবটিক্স, ব্যবস্থাপনা, সমাজকর্ম ও গণিত বিভাগের কার্যক্রমও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সহশিক্ষা কার্যক্রমে প্রাণবন্ত ক্যাম্পাস

জাবিপ্রবি শুধু পাঠদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সহশিক্ষা কার্যক্রমেও বিশ্ববিদ্যালয়টি অত্যন্ত সক্রিয়। রিসার্চ সোসাইটি, ডিবেটিং সোসাইটি, প্রোগ্রামিং ক্লাব, রোবটিক্স ক্লাব, ব্লাড ডোনেশন সোসাইটি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে সহায়তা করছে। ‘সবুজ স্বপ্ন’ নামের সংগঠনটি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করছে। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতি সত্যনিষ্ঠ ও পেশাদার সাংবাদিকতার মাধ্যমে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে।

গবেষণায় এগিয়ে চলা

মাত্র নয় বছরের পথচলায় গবেষণাক্ষেত্রেও জাবিপ্রবি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় অবদান রাখছেন। ইইই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. রাশিদুল ইসলামের বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বড় অর্জন। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা আন্তর্জাতিক জার্নালে (Q1) গবেষণাপত্র প্রকাশ করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সেল নিয়মিত গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম আয়োজন এবং গবেষণার মৌলিকতা যাচাইয়ের কাজ করছে। নিজস্ব জার্নাল প্রকাশের উদ্যোগও গবেষণাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে চলেছে।

নতুন প্রশাসনের উদ্যোগ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে তৈরি হওয়া সংকটের সময় নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণ করে ক্যাম্পাসকে সচল রাখার চেষ্টা শুরু করে। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রোকনুজ্জামানের নেতৃত্বে ছাত্র হল সংস্কার, পরিবহন সুবিধা বৃদ্ধি, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, মেডিকেল সেন্টারের কার্যক্রম ত্বরান্বিতকরণ এবং ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্নতাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে প্রশাসন খুব দ্রুত উপলব্ধি করে যে, সাময়িক সংস্কার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধান সম্ভব নয়। এজন্যই শুরু হয় উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা (ডিপিপি) অনুমোদনের প্রক্রিয়া। বর্তমানে ডিপিপি শিক্ষা মন্ত্রণালয় অতিক্রম করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার।

অবকাঠামোগত সংকট: এক কঠিন বাস্তবতা
সম্ভাবনার বিপরীতে জাবিপ্রবির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো অবকাঠামোগত সংকট। আজও বিশ্ববিদ্যালয়টি পুরোনো ফিশারিজ কলেজের অবকাঠামো ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে। অধিকাংশ বিভাগে পাঁচ-ছয়টি ব্যাচের জন্য রয়েছে মাত্র দুই বা তিনটি শ্রেণিকক্ষ। ফলে ল্যাবরেটরিতেই তাত্ত্বিক ক্লাস নিতে হচ্ছে।

গ্রীষ্মকালে টিনশেড কক্ষগুলোর তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছে যায়, যা শিক্ষার্থীদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ। আবাসন সংকটও প্রকট; মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ হল সুবিধা পাচ্ছে। নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিংবা সীমানাপ্রাচীর।

গবেষণাগার, অডিটোরিয়াম, আধুনিক সেমিনার কক্ষ ও প্রশাসনিক ভবনের অভাব বিশ্ববিদ্যালয়টির স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। এমনকি উপাচার্য ও কর্মকর্তাদেরও নেই স্থায়ী বাসভবন।

ডিপিপি অনুমোদন এখন সময়ের দাবি

এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র কার্যকর পথ হলো দ্রুত ডিপিপি অনুমোদন এবং পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামোগত উন্নয়ন। নতুন একাডেমিক ভবন, গবেষণাগার, অডিটোরিয়াম, আবাসিক হল, প্রশাসনিক ভবন ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দ্রুত ডিপিপি অনুমোদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

জাবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রোকনুজ্জামান বলেন, “দীর্ঘ ৯ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদণ্ড অনুযায়ী অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। ডিপিপি পাস হলে নতুন প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবন, টিএসসি, লাইব্রেরিসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধার দ্বার উন্মোচিত হবে।”

অন্যদিকে জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলও ডিপিপি অনুমোদনের পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরে বলেছেন, “জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের প্রাণের প্রতিষ্ঠান। এর উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ডিপিপি দ্রুত অনুমোদন হওয়া উচিত।”

স্বপ্নপূরণের অপেক্ষায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; এটি একটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারখানা। জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আজ সেই ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এখানকার শিক্ষার্থীরা স্বপ্ন দেখছে গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার।

ডিপিপি অনুমোদনের মাধ্যমে যদি বিশ্ববিদ্যালয়টির দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট দূর করা যায়, তবে প্রান্তিক এই প্রতিষ্ঠান একদিন দেশের অন্যতম সেরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হতে পারে। এখন শুধু প্রয়োজন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও কার্যকর উদ্যোগ। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্ত ভিতের ওপর।

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলায় জাহাজে আগুন, লাইফবোটে আশ্রয় ন…
  • ১২ জুলাই ২০২৬
সমতা ফিরিয়ে ১০ জনের দলে পরিণত সুইজারল্যান্ড
  • ১২ জুলাই ২০২৬
ফরিদপুরে বাসচাপায় নিহত ৫, গাড়িতে আগুন দিল উত্তেজিত জনতা
  • ১২ জুলাই ২০২৬
ডিগ্রি ২য় বর্ষের ফল প্রকাশ, পাসের হার ৯৩.৫৩ শতাংশ
  • ১২ জুলাই ২০২৬
বিশ্বকাপে নতুন ইতিহাস গড়লেন মেসি
  • ১২ জুলাই ২০২৬
এগিয়ে থেকে বিরতিতে গেল আর্জেন্টিনা
  • ১২ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence