শাবিপ্রবি ছাত্রলীগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় © টিডিসি ফটো
কেন্দ্রীয় কমিটিতে ধারাবাহিক পরিবর্তন আসলেও বদল হয়নি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) ছাত্রলীগের কমিটি। এক বছর মেয়াদী কমিটি চলছে দীর্ঘ সাড়ে ৫ বছর ধরে। এতে করে শাখা সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা রাজনীতির অপচর্চা যেমন শুরু করছেন; তেমনি জড়িয়ে পড়ছেন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, যৌন হয়রানি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও হামলা-সংঘর্ষের মত নানা অপকর্মে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠিন সিদ্ধান্ত না নেয়ায় ঘটনার পুুনরাবৃত্তি ঘটছে। যা আগামীতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিই নয়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের জুনিয়র নেতাকর্মীদের মাঝে এক ধরনের ক্ষোভ, হতাশা ও ছন্নছাড়া ভাব দেখা গেছে।
জানা যায়, ২০১৩ সালের ৮ই মে সঞ্জীবন চক্রবর্তী পার্থকে সভাপতি ও ইমরান খানকে সাধারণ সম্পাদক করে এক বছর মেয়াদী ৭ সদস্যের একটি কমিটি অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। সে সময় শিঘ্রই পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার নির্দেশনা দেয়া হলেও অদৃশ্য এক ক্ষমতাবলে মেয়াদ শেষের দু’বছর পর (২০১৬ সাল) পূর্ণ কমিটি গঠন হয়। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কোনো সদস্য বিয়ে কিংবা চাকরি করলে পদ হারাবেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ২১ সহ-সভাপতির অন্তত ১৫ জনের ক্ষেত্রে এই নিয়ম পুরোটাই উল্টো। যা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে অধস্তন স্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে।
গ্রুপিং, সংঘর্ষ ও শিক্ষার্থীর মৃত্যু: কমিটি গঠনের পর পদ বঞ্চিতদের হামলায় আহত হন সাবেক আহ্ববায়ক সামসুজ্জামান চৌধুরী সুমন ও সাধারণ সম্পাদক ইমরান খান। ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে উত্তম কুমার দাসকে সংগঠন থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়। এরপর ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ নেন সহ-সভাপতি অঞ্জন রায় এবং বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ নেতা উত্তম কুমার দাস। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর ক্যাম্পাস দখলে নেওয়ার জন্য অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সভাপতি পার্থ, সহ-সভাপতি আবু সাঈদ, সাধারণ সম্পাদক ইমরান ও যুগ্ম সম্পাদক সাজিদুল ইসালাম সবুজের অনুসারীরা সহ-সভাপতি অঞ্জন এবং উত্তমের কর্মীদের উপর হামলা চালায়। ওই দিন উভয় পক্ষের সংঘর্ষে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমন চন্দ্র দাস নিহত হন। তখন থেকেই সৃষ্ঠ ছাত্রলীগের বিভাজন কমপক্ষে দশটি গ্রুপের সৃষ্টি করে। ২০১৬ সালের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে মামলার আসামী, ছাত্রদল-শিবির, অছাত্র ও বিবাহিত-বিতর্কিতরা স্থান পেলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ।
শিক্ষকদের উপর হামলা: ২০১৫ সালের ৩০ আগস্ট ভিস বিরোধী আন্দোলনে শিক্ষকদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এতে অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হক, ড. ইউনুসসহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক আহত হন। এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ তিনজনকে সাময়িক বহিস্কার করলেও বছর না ঘুরতেই বহিস্কারাদেশ তুলে নেয়।
এছাড়াও নিজেদের মধ্যকার সংঘর্ষ অনেকটাই স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেছে এ ইউনিটটি। ফলে বেশ কয়েকবার হল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন। জানা যায়, ২০১৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কুল ছাত্রীকে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করায় শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি সঞ্জীবন চক্রবর্তীর প্রত্যক্ষ মদদে বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের দুই সাংবাদিক নেতাকে পিটিয়ে আহত করে তার কর্মীরা। এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ এই কমিটিকে স্থগিত করে। পালাবদলে সঞ্জীবন চক্রবর্তী পার্থকে সরিয়ে সহ-সভাপতি রুহুল আমিনকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দিলেও শান্তি ফেরেনি ক্যাম্পাসে।
জানা যায়, হামলা-সংঘর্ষ ছাড়াও ভর্তি জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে শাখা সংগঠনটির এক নেতার বিরুদ্ধে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম। ভর্তি জালিয়াতি ছাড়াও তার বিরুদ্ধে প্রগতিশীল ছাত্রজোটের মিছিলে হামলার অভিযোগ রয়েছে।
বিতর্কিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক: ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রুহুল আমিন ফাওখোর হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত। শাহপরান হলের ক্যাফেটেরিয়া, ক্যাম্পাসের ফুডকোর্ট, টঙসহ বিভিন্ন দোকান মালিকরা তার কাছে লক্ষাধিক টাকা পান বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শিক্ষাজীবন শেষ না করতে পারায় সাধারণ সম্পাদক ইমরান খানের ছাত্রত্ব বাতিল করেছে প্রশাসন। ইয়াবা সেবনের অভিযোগও রয়েছে শীর্ষ এ নেতার বিরুদ্ধে।
নতুন কমিটিতে টালবাহানা: ২০১৭ এর ২৭ জুলাই সহ-সভাপতি রুহুল আমিনকে ওই বছরের ১০ অক্টোবর কাউন্সিল করার দায়িত্ব দিয়ে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করে পাঠালেও নেতৃত্ব ছাড়তে টালবাহানা করছে ছাত্রলীগের সিনিয়র নেতাকর্মীরা। এক বছরের মধ্যে সম্মেলন নিয়ে ‘টু’ শব্দ পর্যন্ত করেনি এই ইউনিটের সিনিয়র দুই নেতা।
এদিকে কমিটিতে ছাত্রত্বহীন ২১ সহ-সভাপতি এবং সংকটকালীন অবস্থায়ও মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে ছাত্রলীগের কার্যক্রম চলায় হতাশা প্রকাশ করেছেন জুনিয়র সারির অনেক নেতা। ছাত্রলীগের প্রতি আস্থা হারিয়ে যাচ্ছে বলেও জানিয়েছেন কেউ কেউ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নেতাকর্মীদের এমন গা-ছাড়া ভাবের প্রভাব গত সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে পড়েছে। কারণ গুটিকয়েক ছাড়া শাবিপ্রবি ছাত্রলীগের কোনো নেতাকর্মীকেই আওয়ামী মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে দেখা যায়নি।
কমিটি গঠনে দীর্ঘ বিলম্ব সম্পর্কে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রুহুল আমিন দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শাবিপ্রবি ছাত্রলীগের কমিটি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক হবে। এখানে আমরা চাইলেও কিছুই করতে পারব না। এই মুহুর্তে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ততা চলছে।
সার্বিক বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানি দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের ইমিডিয়েট পরই শাবিপ্রবিতে সম্মেলনের মাধ্যমে যোগ্য কর্মীদের বাছাই করবে ছাত্রলীগ। আশা করছি নির্বাচন পরবর্তী এক মাসের মধ্যেই শাবিপ্রবি ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষনা হবে। এছাড়াও কাছাকাছি সময়ে সিলেট জেলা, মহানগর ও অন্যান্য কমিটি হবে বলে জানান তিনি।