প্রতীকী ছবি © এআই জেনারেটেড ছবি
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর কামিল (এমএ) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) অডিট কার্যক্রমে অসহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। এ প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীর সরকারি অংশ (এমপিও) স্থগিতের সুপারিশ করেছে ডিআইএর নিরীক্ষা দল। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।
ডিআইএ সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী গত ১০ মে প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন ও নিরীক্ষার জন্য একটি দল মুকসুদপুর কামিল মাদ্রাসায় যায়। কিন্তু নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সময় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সহযোগিতা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে ঘটনাটিকে ‘অডিট কাজে অসহযোগিতা’ হিসেবে উল্লেখ করে বিস্তারিত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। এমন অসহযোতিতার কারণে ব্রডশিট জবাব না পাওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির এমপিও স্থগিত রাখার সুপারিশ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির এমপিও বন্ধ হলে সেখানে কর্মরত ৩৯ জনের (২৯ জন শিক্ষক, ১০ জন কর্মচারী) বেতনই বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানা গেছে।
ডিআইএর তদন্ত দল তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, অধিদপ্তরের পূর্ববর্তী স্মারকের আলোকে প্রতিষ্ঠানটিতে পরিদর্শন ও নিরীক্ষার আদেশ জারি করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সময় ১০ মে সময় নির্ধারণ করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠানপ্রধান লিখিতভাবে জানান, এর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে প্রতিষ্ঠানটি একটি অডিট রিপোর্ট পেয়েছে এবং সেই রিপোর্টের ব্রডশিট জবাবও যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেই বিষয়টির নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। ফলে পূর্ববর্তী অডিটের কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা করা সম্ভব নয় বলে তিনি মত দেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৬ এর অনুচ্ছেদ ১৮.১ (খ) অনুযায়ী, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ অথবা মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মোতাবেক হিসাব সংরক্ষণ ও আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষা না করলে কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের এমপিও স্থগিত বা বাতিল করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে ১৯৮১ সালের ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রেজুলেশনের ধারা-২ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে নিরীক্ষা কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করায় অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার সরকারি অংশ স্থগিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
‘১০ মে অডিটের বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে আগেই অবহিত করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত দিনে আমরা সেখানে গিয়ে প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল কাউকে পাইনি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পর একজনের মাধ্যমে অধ্যক্ষকে ফোন দেওয়া হয়। অধ্যক্ষ আসার পর তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে অডিট করতে দেবেন না।’—এফ এম শাহাবুদ্দীন রুমন, সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক, ডিআইএ
‘প্রতিষ্ঠানে কাউকে পাইনি’
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক এফ এম শাহাবুদ্দীন রুমন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘১০ মে অডিটের বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে আগেই অবহিত করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত দিনে আমরা সেখানে গিয়ে প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল কাউকে পাইনি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পর একজনের মাধ্যমে অধ্যক্ষকে ফোন দেওয়া হয়।’
তিনি বলেন, ‘অধ্যক্ষ আসার পর তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে অডিট করতে দেবেন না। এমনকি তিনি আমাদের বলেন, চাইলে আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দিতে পারেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা তার কাছ থেকে লিখিত বক্তব্য নিয়ে ফিরে আসি। পুরো সময় আমি তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করেছি। কিন্তু তিনি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক আচরণ করেছেন।’
‘সেদিন এসএসসি পরীক্ষা চলছিল। আমি কেন্দ্র সচিবের দায়িত্বে ছিলাম। এমন সময় আমার প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষক ফোন করে জানান, অডিট কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করছেন। পরে আমি মাদ্রাসায় গিয়ে দেখি একজন কর্মকর্তা আমার চেয়ারে বসে আছেন। তখন আমি শুধু বলেছিলাম, অধ্যক্ষ বা সভাপতির চেয়ারে বসা শোভনীয় নয়। এই কথাতেই তারা ক্ষুব্ধ হয়ে চলে যান। দুর্ব্যবহার করার প্রশ্নই ওঠে না।'—অধ্যক্ষ রুহুল আমিন
অধ্যক্ষের পাল্টা অভিযোগ
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মুকসুদপুর কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ রুহুল আমিন। তার দাবি, ঘটনাটিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হচ্ছে। রুহুল আমিন বলেন, ‘সেদিন এসএসসি পরীক্ষা চলছিল। আমি কেন্দ্র সচিবের দায়িত্বে ছিলাম। এমন সময় আমার প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষক ফোন করে জানান, অডিট কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করছেন। পরে আমি মাদ্রাসায় গিয়ে দেখি একজন কর্মকর্তা আমার চেয়ারে বসে আছেন। তখন আমি শুধু বলেছিলাম, অধ্যক্ষ বা সভাপতির চেয়ারে বসা শোভনীয় নয়। এই কথাতেই তারা ক্ষুব্ধ হয়ে চলে যান।
তিনি আরও বলেন, ‘অডিট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমার কোনো খারাপ ব্যবহার হয়নি। তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার প্রশ্নই ওঠে না। ঘটনাটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।’ তবে অডিট কার্যক্রম পরিচালনায় আপত্তি জানিয়ে লিখিত বক্তব্য দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি ।
উদ্বেগে শিক্ষক-কর্মচারীরা
এদিকে এমপিও স্থগিতের সুপারিশের খবরে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, বিষয়টির দ্রুত সমাধান না হলে নিয়মিত বেতন-ভাতা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে মুকসুদপুর কামিল মাদ্রাসার এক শিক্ষক বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অডিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অধ্যক্ষের বিরোধের কারণে সব শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন বন্ধের সুপারিশ গ্রহণযোগ্য নয়। যারা অসহযোগিতা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (অডিট ও আইন) ওয়াহিদা সুলতানা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিষয়টি জানা নেই। রিপোর্ট দেখে পরবর্তীতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’