বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কাঁঠাল রপ্তানি নিয়ে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হওয়ায় দেশের কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকরা। তবে তারা বলছেন, এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে পণ্যের মান, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও প্যাকেজিং সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে তারা মনে করেন, কাঁঠাল রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশের অন্যান্য কৃষিপণ্যের জন্যও চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানিকারক চীন বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল আমদানিতে আগ্রহ দেখানোয় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল আমদানির ব্যাপারে চীনের আগ্রহ নতুন নয়।
২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো কাঁচা আম আমদানি শুরু করার সময়ই বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত কাঁঠাল ও পেয়ারাসহ আরও কয়েকটি ফল আমদানির আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে মোট ১৭টি মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। অবকাঠামো, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল অর্থনীতিসহ বিভিন্ন খাতের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে চীনে কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়টিও এসব চুক্তির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও কৃষিপণ্য রপ্তানিখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে চীনে কাঁঠাল রপ্তানির প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাদের ভাষ্য, কৃষিনির্ভর দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো কৃষিপণ্য রপ্তানিতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। ফলে চীনের মতো বড় বাজারে কাঁঠাল বা কাঁঠালজাত পণ্য রপ্তানির সুযোগ দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। একই সঙ্গে এটি অন্যান্য কৃষিপণ্যের জন্যও নতুন বাজার সৃষ্টি করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কাঁঠাল বা কাঁঠালজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং সক্ষমতার ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির পরিমাণ এখনো সন্তোষজনক নয়। বর্তমানে যে পরিমাণ রপ্তানি হয় তার বেশিরভাগই নির্দিষ্ট জাতিগত বা এথনিক মার্কেটে যায়। তিনি বলেন, পণ্যের মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে না পারায় ইউরোপীয় বাজারে এখনো বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিতভাবে প্রবেশ করতে পারেনি। উল্লেখ্য, এথনিক মার্কেট বলতে নির্দিষ্ট জাতি, গোষ্ঠী বা সংস্কৃতিভিত্তিক বাজারকে বোঝায়।
বিশ্বব্যাপী কাঁঠালের বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০১২ সালে যেখানে বৈশ্বিক কাঁঠাল রপ্তানির বাজার ছিল প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭০ কোটি ডলারে। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, চীন ও ইকুয়েডর মিলিয়ে বৈশ্বিক রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এর মধ্যে এককভাবে ভিয়েতনামের দখলে রয়েছে বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ২৫ শতাংশ।
আরও পড়ুন: দুপুরের মধ্যে দেশের ১১ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের আভাস
চীন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঁঠাল আমদানিকারক দেশ। তাদের চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয় ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক কাঁঠাল রপ্তানিতে বাংলাদেশের অংশ মাত্র শূন্য দশমিক তিন শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানিকৃত কাঁঠালের প্রায় ৮৫ শতাংশ যায় যুক্তরাজ্য, ইতালি, কানাডা ও ফ্রান্সে। এর মধ্যে শুধু যুক্তরাজ্যেই যায় মোট রপ্তানির প্রায় ৭৬ শতাংশ। ফলে চীনের বিশাল বাজার বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর আট থেকে ১০ লাখ মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ চাহিদা কম এবং পর্যাপ্ত রপ্তানি সুযোগ না থাকায় প্রতিবছর উৎপাদিত কাঁঠালের ৪৫ শতাংশেরও বেশি নষ্ট হয়ে যায়।
ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, দেশে উৎপাদিত ফলের মধ্যে আম প্রথম, কলা দ্বিতীয় এবং কাঁঠাল তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। কাঁঠালের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে কাঁঠালের ছয়টি জাত উদ্ভাবন করেছে। এছাড়া কাঁঠাল ব্যবহার করে ভেজিটেবল মিট, চিপস, আচার, জেলি, আইসক্রিম, কেকসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য তৈরির গবেষণাও চলছে। কয়েক বছর আগে উদ্ভাবিত 'কাঁঠালসত্ত্ব'ও ব্যাপক আলোচনায় আসে। তিনি বলেন, বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ফলে রপ্তানির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাঁঠাল দিয়ে তৈরি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের জনপ্রিয়তা থাকায় এই খাতে বড় সম্ভাবনা দেখছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কাঁঠালজাত খাদ্যপণ্যের চাহিদা রয়েছে। চীনের সঙ্গে এই সমঝোতা বাংলাদেশের সার্বিক কৃষি অর্থনীতির জন্য বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করবে।
ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, এর মাধ্যমে একটি নতুন ব্যবসায়িক চ্যানেল তৈরি হবে। বাংলাদেশ যেহেতু ইতোমধ্যে কিছু ফল রপ্তানি করে, তাই এই উদ্যোগ কৃষকদের জন্যও ইতিবাচক হবে।
তবে রপ্তানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দেশের রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্যের অভাব রয়েছে এবং মোট রপ্তানির বড় অংশই তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। কৃষিনির্ভর দেশ হওয়া সত্ত্বেও নীতিগত ও আইনগত নানা জটিলতার কারণে কৃষিপণ্য রপ্তানি এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-বেজড প্রোডাক্ট প্রডিউসারস অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, কাঁঠাল দিয়ে তৈরি কিছু পণ্য ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তবে চীন কীভাবে কাঁঠাল গ্রহণ করবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। কারণ কাঁঠাল সংরক্ষণ ও পরিবহনে কিছু ঝুঁকি রয়েছে। তার মতে, চীন যদি এ খাতে বিনিয়োগ করে বা প্রক্রিয়াজাতকরণে কারিগরি সহায়তা দেয়, তাহলে বিষয়টি অনেক সহজ হবে।
তিনি আরও জানান, অতীতে তাদের সংগঠন বাংলাদেশেই কাঁঠাল থেকে চিপস ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য উৎপাদনের জন্য কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে রপ্তানির বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তবে শুধু চীন নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশ থেকে কাঁঠালজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের আগে কৃষিপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, চীন যখন বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল আমদানির চুক্তিতে যাবে, তখন তারা নিশ্চয়ই প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রযুক্তিগত সহায়তাও দেবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন প্রযুক্তি শিখে স্থানীয় বাজারেও তা কাজে লাগাতে পারবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও পুষ্টির বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দাম পাওয়ার কারণে সব পণ্য বিদেশে পাঠানোর প্রবণতা যেন না তৈরি হয়; দেশীয় ভোক্তা ও পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা