সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী © টিডিসি সম্পাদিত
দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তা বেড়ে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপনকালে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করা হয়।
বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে এনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনা হবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার বিবেচনায় বাজেট প্রস্তাব প্রণয়ন করেছে।
এ সময় তিনি বিগত সরকারের সময়ের সঙ্গে বিএনপির পূর্ববর্তী সরকারের আমলের বিভিন্ন সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। অর্থমন্ত্রী জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। কিন্তু পরবর্তীতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, ২০০৫-০৬ সময়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ, যা বেড়ে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছায়। সম্পদের অসম বণ্টন, সুশাসনের অভাব এবং দুর্নীতির কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্যও বেড়েছে। ২০০৫ সালে আয়ভিত্তিক জিনি কো-ইফিশিয়েন্ট ছিল ০ দশমিক ৪৬৭, যা ২০২২ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী বেড়ে ০ দশমিক ৪৯৯ হয়েছে।
আরও পড়ুন: বাজেটে ১০ অগ্রাধিকারের কথা জানাল সরকার
অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনও নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে এবং তা ৮ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।
ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০৫ সালে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে মূলধন পর্যাপ্ততার হার ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষে তা ঋণাত্মক হয়ে মাইনাস ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পতনের কথা উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন স্ক্যাম এবং ভুল নীতির কারণে দেশের পুঁজিবাজার ধ্বংস হয়ে গেছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিএনপি সরকার যখনই ক্ষমতায় ছিল, তখন ব্যাংক, আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজারে কোনো সংকট সৃষ্টি হয়নি।
বৈদেশিক ঋণের চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০০৬ সালে দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা প্রায় সাড়ে ছয় গুণ বেড়ে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি সরকারের রেখে যাওয়া ৬৫ হাজার কোটি টাকার অভ্যন্তরীণ ঋণ বর্তমানে প্রায় ১৬ গুণ বেড়ে ১০ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা উদ্বেগজনক।
সুদ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের বৃদ্ধি হয়েছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সুদ ব্যয় ছিল ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ১৩ গুণের বেশি বেড়ে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
তিনি জানান, ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাংলাদেশের ঋণঝুঁকির অবস্থান ‘নিম্ন’ ঝুঁকির দেশ থেকে ‘মধ্যম’ ঝুঁকির দেশে অবনমন হয়েছে।
রপ্তানি ও আমদানি পরিস্থিতি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ১২ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উভয় সূচকের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক অবস্থায় নেমে গেছে।
বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ছিল ৬৮ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছেছে, যা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।