অকার্যকর নীতিমালা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থামছেই না বুলিং © প্রতীকী ছবি
ঢাকার একটি নামি বিদ্যালয়ে পড়ে রিমু (ছদ্মনাম)। হঠাৎ একদিন বিদ্যালয় ছুটির পর ঘরে ফিরে কাঁধের ব্যাগ না রেখেই বেসিনের সামনে চলে যায়। দ্রুত ব্রাশ করতে শুরু করে সে। তাড়াহুড়োয় টুথপেস্ট নিতেও ভুলে গেছে। ফলে ব্রাশ করতে গিয়ে মাড়ি থেকে রক্ত ঝরছে। তবুও ব্রাশ করা থামাচ্ছে না।মেয়ের এমন আচরণ দেখে তার মা বেশ ঘাবড়ে যান। অনেক কষ্টে তাকে থামানোর পর রিমু বলে, ‘আমার দাঁতগুলো উঁচু কেন, মা? আমি তো রোজ ব্রাশ করি। তবু তো নিচে নামে না।’ দাঁত নিয়ে এত দুশ্চিন্তার কারণ জানতে চান তার মা। তখন মেয়েটি বলে, ‘আমাকে সবাই দাঁত-দানব বলে ডাকে।’
শিশুর জন্মের পর সাধারণত ছয় মাস বয়স থেকে দাঁত উঠতে শুরু করে। এগুলোকে দুধদাঁত বলা হয়। ছয় থেকে সাত বছর বয়সে দুধদাঁত পড়ে গিয়ে স্থায়ী দাঁত ওঠা শুরু হয়, যা সাধারণত ১২ বছর বয়স পর্যন্ত চলতে থাকে। শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশের এই ধাপটিই সহপাঠীদের কটূক্তি ও উপহাসের কারণে রিমুর কাছে হয়ে উঠেছে মানসিক যন্ত্রণার কারণ।
সন্তানের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন রিমুর মা। তিনি বলেন, ‘দুধদাঁত তো সমান ছিল। কিন্তু এগুলো পড়ে আঁকাবাঁকা আর উঁচু দাঁত উঠতে শুরু হলো। আয়নায় নিজেকে দেখে মেয়েটা বেশ কষ্ট পায়। এর মধ্যেই তার সহপাঠীরা এভাবে ডেকে তার কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।’
রিমুর ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। কখনো শারীরিক গঠন, দাঁত, গায়ের রং বা পোশাক নিয়ে উপহাস কিংবা নাম বিকৃত করে ডাকা, কখনো সামাজিকভাবে একঘরে করে রাখা বিষয়গুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহপাঠীদের এমন আচরণকে অনেক সময় ‘মজা’ হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। অথচ গবেষণা বলছে, এই ‘মজা’ শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য, পড়াশোনা এমনকি জীবনযাপনের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতি চারজনে একজন বুলিংয়ের শিকার
বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের বুলিংয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে করা গবেষণা ও জরিপে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
২০১৯ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের ‘বিহাইন্ড দ্য নাম্বারস: এন্ডিং ভায়োলেন্স অ্যান্ড বুলিং’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বুলিংয়ের শিকার হওয়ার হার ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি চারজন শিক্ষার্থীর একজন বুলিংয়ের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। এই প্রতিবেদনে ছেলেদের ক্ষেত্রে এই হার ২৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘গ্লোবাল স্কুল-বেজড স্টুডেন্ট হেলথ সার্ভে (জিএসএইচএস)’ শীর্ষক ২০১৪ সালের একটি জরিপে বাংলাদেশ ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সি ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থীই জরিপের আগের মাসের অভিজ্ঞতা জানিয়েছিল যে গত ৩০ দিনে অন্তত একদিন তারা বুলিংয়ের শিকার হয়েছে। ছেলেদের মধ্যে এ হার ২৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং মেয়েদের মধ্যে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে বুলিংয়ের প্রকৃতি ও ব্যাপ্তি জানতে ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৫৫৬ জন মাধ্যমিক শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গবেষণায় বাংলা ভাষায় অনূদিত ‘মাল্টিডাইমেনশনাল বুলিং ভিকটিমাইজেশন স্কেল’ বা ‘বহুমাত্রিক বুলিংয়ের শিকার হওয়ার পরিমাপ স্কেল’ ব্যবহার করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, এতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক গত এক বছরে স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হয়েছে। সবচেয়ে বেশি যে ধরনের বুলিংয়ের শিকার হয়েছে এর মধ্যে ছিল ধাক্কা বা ঠেলে দেওয়া, উপহাস করা এবং গুজব ছড়ানো। এরমধ্যে ছেলে শিক্ষার্থী, সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থী এবং শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বুলিংয়ের শিকার হওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়।
এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বুলিংয়ের প্রাদুর্ভাব নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের জরিপ নয়। বরং তিন জেলার ছয় স্কুলের ৫৫৬ শিক্ষার্থীকে নিয়ে নমুনা নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে গবেষণাটি করা হয়েছিল।

ঢাকার স্কুলে বুলিংয়ের যত ধরন
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিংয়ের ধরন ও প্রকৃতি বুঝতে ২০১৭ সালে ঢাকা শহরের দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ওপর একটি গবেষণা করা হয়। ‘বুলিং অ্যাট হাই স্কুলস: সিনারিও অব ঢাকা সিটি’ শীর্ষক গবেষণাটি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের গবেষক সাবরিনা মাহমুদ ও শাহীনা ইসলাম। গবেষণাটি ‘জার্নাল অব অ্যাডভান্সড ল্যাবরেটরি রিসার্চ ইন বায়োলজি’র ২০১৭ সালের অষ্টম ভলিউমের চতুর্থ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
গবেষণায় একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি মাধ্যমের মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মোট ৬০ জন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দুই মাধ্যম থেকেই ১০ জন শিক্ষার্থী, ১০ জন শিক্ষক ও ১০ জন অভিভাবকের মতামত নেওয়া হয়।
অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা বুলিংয়ের সাতটি ধরন শনাক্ত করেন। ধরনগুলো হলো মৌখিক, আবেগীয়, সামাজিকভাবে একঘরে করা, শারীরিক, যৌন, সাইবার এবং জাতিগত বুলিং।
গবেষণায় শারীরিক বৈশিষ্ট্য যেমন খাটো হওয়া, চশমা পরা, অতিরিক্ত ওজন বা কম ওজন, প্রতিবন্ধিতা এবং জাতিগত, ধর্মীয় ও আর্থসামাজিক পার্থক্যকে বুলিংয়ের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে অংশগ্রহণকারীরা উল্লেখ করেন।
গবেষণায় মাধ্যমভেদেও বুলিংয়ের ধরনে পার্থক্যের কথা উঠে আসে। শিক্ষকদের দেওয়া মতামত অনুযায়ী, বাংলা মাধ্যমে শারীরিক ও আবেগীয় বুলিং বেশি দেখা গেছে। অন্যদিকে, ইংরেজি মাধ্যমে মৌখিক, যৌন ও সাইবার বুলিংয়ের প্রবণতা বেশি ছিল। একই সঙ্গে নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে যৌন ও সাইবার বুলিং অন্য শ্রেণির তুলনায় বেশি বলে শিক্ষকরা জানিয়েছেন।
বুলিংয়ের স্থানও ছিল বিস্তৃত। গবেষণায় শ্রেণিকক্ষ, স্কুলবাস, খেলার মাঠ, বাথরুম এবং স্কুলের চারপাশে বুলিংয়ের অভিজ্ঞতার কথা উঠে আসে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা বুলিংকে নিছক দুষ্টুমি হিসেবে দেখেননি। তাদের বক্তব্যে বুলিংয়ের সঙ্গে মানসিক চাপ, হতাশা, রাগ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব এবং স্কুলে অনুপস্থিতির সম্পর্ক উঠে এসেছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ভাবনার মতো গুরুতর মানসিক সংকটের কথাও আলোচনায় আসে।
অনলাইনেও পিছু ছাড়ছে না বুলিং
শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণেই থেমে নেই এই নিপীড়ন। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে বুলিংয়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে অনলাইনেও। শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম কিংবা অন্যান্য অনলাইন মাধ্যমে হয়রানি, অপমান, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাকে সাইবার বুলিংয়ের আওতায় দেখা হয়।
বাংলাদেশে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তার চিত্র জানতে ২০১৯ সালে ‘অনলাইন সেইফটি অব চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণা করে ইউনিসেফ। দেশের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় পড়ুয়া ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১ হাজার ২৮১ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে গবেষণাটি করা হয়। গবেষণায় শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের ধরন, অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়া এবং সাইবার অপরাধসহ অনলাইন নিরাপত্তার বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইনে বুলিংয়ের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে। চেহারা, পরীক্ষার ফলসহ বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে অনলাইনে বুলিং করা হয়েছে বলে তারা জানায়। একই গবেষণায় অনলাইনে ধর্মীয় উসকানিমূলক কনটেন্টের মুখোমুখি হওয়ার কথাও জানায় প্রায় ১০ শতাংশ শিশু।
গবেষণায় শিক্ষার্থীদের অনলাইন ব্যবহারের ধরনেও ঝুঁকির কিছু চিত্র উঠে আসে। প্রায় ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ১১ বছর বয়সের আগেই ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু করে। আবার ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী নিজেদের ঘরকে ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রধান স্থান হিসেবে উল্লেখ করে। এ কারণে বিদ্যালয় ছুটি শেষেও বুলিং শেষ হয়ে যাচ্ছে না। সহপাঠীদের ফোন, মেসেঞ্জার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেই নিপীড়ন শিক্ষার্থীর ঘর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।
ইউনিসেফ বলছে, সাইবার বুলিংয়ের একটি বড়ো পার্থক্য হলো এটি বিদ্যালয় বা নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া অপমানজনক বা হয়রানিমূলক কনটেন্ট দ্রুত অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে এবং দীর্ঘ সময় অনলাইনে থেকে যেতে পারে।

যে প্রভাব পড়ে জীবনে
বুলিংয়ের প্রভাব শুধু সাময়িক মন খারাপ বা স্কুলে যেতে অনীহায় সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা আরেক গবেষণায় বুলিংয়ের সঙ্গে মানসিক ও আচরণগত নানা ঝুঁকির সম্পর্ক আরও গভীরভাবে উঠে এসেছে।
বুলিংয়ের প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে, তা বুঝতে ২০১৪ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে পরিচালিত ‘গ্লোবাল স্কুল-বেজড স্টুডেন্ট হেলথ সার্ভে (জিএসএইচএস)’ বা বৈশ্বিক স্কুলভিত্তিক শিক্ষার্থী স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০২০ সালে একটি গবেষণা প্রকাশ করা হয়। স্কুলভিত্তিক এই জরিপে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় যেমন বুলিং, একাকিত্ব, ঘুমের সমস্যা এবং আত্মহত্যার চিন্তা, পরিকল্পনা ও চেষ্টার মতো বিষয়েও তথ্য নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের ২ হাজার ৯৮৯ জন শিক্ষার্থীর সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটিতে বুলিংয়ের সঙ্গে এসব শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকির সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, শুধু এক মাসেই অন্তত একদিন বুলিংয়ের শিকার হওয়ার হার ছিল ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
বুলিংয়ের সঙ্গে আত্মহত্যার চেষ্টার সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায়। যারা বেশি দিন বুলিংয়ের শিকার হয়েছে, তাদের আত্মহত্যার চেষ্টা করার সঙ্গে সম্পর্কের মাত্রাও বেশি ছিল।
গবেষণায় বুলিংয়ের সংস্পর্শে থাকার সময় অনুযায়ী আত্মহত্যার প্রবণতার অ্যাডজাস্ট অডস রেশিও সমন্বিত অডস অনুপাত ১ থেকে ২ দিনের ক্ষেত্রে ২. ৯২, ৩ থেকে ৫ দিনের ক্ষেত্রে ৩. ৫৫, ৬ থেকে ৯ দিনের ক্ষেত্রে ৫. ৩৩ এবং ১০ দিন বা তার বেশি সময় বুলিংয়ের শিকার হওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ৯. ৮৩ পাওয়া যায়। অর্থাৎ বুলিংয়ের দীর্ঘস্থায়ী অভিজ্ঞতার সঙ্গে আত্মহত্যার চেষ্টার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার একটি শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ফলে বুলিংকে শুধু শিশুদের পারস্পরিক দুষ্টুমি বা ‘নিজেদের ব্যাপার’বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়েও চলছে নিপীড়ন
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার অসম সম্পর্ক, ভয় দেখানো ও দলবদ্ধভাবে মানসিক চাপ তৈরির সংস্কৃতি শুধু স্কুলের শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও তা ভিন্ন নামে টিকে আছে। এটি হলো‘র্যাগিং’। ‘আদব-কায়দা শেখানো’ কিংবা ‘সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কের অংশ’ হিসেবে এটাকে দেখা হয়।
২০২৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রকিকে র্যাগিংয়ের নামে নির্যাতন ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সিনিয়র শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে তিনি লিখিত অভিযোগও করেন।
লিখিত অভিযোগে রকি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়ররা শেষবারের মতো তার মাকে ফোন করে ‘আর কোনো দিন দেখা নাও হতে পারে’এমন কথা বলতে বাধ্য করেছিল। একপর্যায়ে তাকে আবরার ফাহাদের হত্যার প্রসঙ্গ টেনে মারধরের হুমকি দেওয়া হয় এবং হলের গেস্টরুমে যেতে চাপ দেওয়া হয়। তিনি যেতে অস্বীকৃতি জানালে মেসে ‘শিবির ডেকে’ তাকে মারার হুমকিও দেওয়া হয়।
নীতিমালা হয়েছে, বাস্তবায়নে ধীরগতি
২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনা এবং ২০২১ সালের জুলাইয়ে স্থূলকায় হওয়ার কারণে এক কিশোরকে সহপাঠী ও শিক্ষকের লাঞ্ছনার ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদন যুক্ত করে একজন আইনজীবী উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন।
রিটের ধারাবাহিক শুনানির একপর্যায়ে সুপ্রিম কোর্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশনার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধসংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৩’ প্রণয়ন করে।
নীতিমালায় বুলিং ও র্যাগিংয়ের বিভিন্ন ধরন ও উদাহরণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মৌখিক বুলিং : উপহাস করা, খারাপ নামে ডাকা, অশালীন শব্দ বা গালিগালাজ করা, শিস দেওয়া, হুমকি দেওয়া এবং কারও শারীরিক সক্ষমতা বা বৈশিষ্ট্য নিয়ে উপহাস করা।
শারীরিক বুলিং ও র্যাগিং : আঘাত করা, চড়-থাপ্পড়, লাথি বা ধাক্কা দেওয়া, শরীরে রং বা পানি ঢেলে দেওয়া, থুথু দেওয়া, খোঁচা দেওয়া, বেঁধে রাখা, বিশেষ ভঙ্গিতে দাঁড়াতে বা বসতে বাধ্য করা, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নষ্ট করা এবং অসৌজন্যমূলক অঙ্গভঙ্গি করা।
সামাজিক বুলিং : গুজব ছড়ানো এবং গায়ের রং, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, পেশা বা অঞ্চলকে কেন্দ্র করে কাউকে অপমান বা গালি দেওয়া।
সাইবার বুলিং : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাউকে নিয়ে কটু বা অপমানজনক মন্তব্য করা, ছবি প্রকাশ করা কিংবা অশালীন বা ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট পোস্ট করা।
যৌন বুলিং ও র্যাগিং : শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেওয়া, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ চিহ্ন বা অঙ্গভঙ্গি করা, আঁচড় দেওয়া কিংবা কাউকে জামাকাপড় খুলতে বাধ্য করা।
নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা, অভিযোগ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তি এবং শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের সচেতন করার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে নীতিমালাটি প্রজ্ঞাপন ও গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এর বাস্তবায়ন এবং এর বিষয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের জানাতে আদালতও সময়সীমা বেঁধে দেন। সুপ্রিম কোর্ট ১৪ আগস্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তিন মাসের মধ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নীতিমালাটি প্রচার এবং সচেতনতামূলক সভার মাধ্যমে বিষয়টি জানানোর নির্দেশ দেন।
উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর নীতিমালা বাস্তবায়ন ও এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির জন্য মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নীতিমালা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোর ওপর ছিল। কিন্তু মাউশির আওতাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নীতিমালা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, কোথায় বুলিং-র্যাগিং প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে, অভিযোগ পেয়ে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এসব বিষয়ে তিন বছরেও মাউশির কাছে কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (মাধ্যমিক-২) এস এম মোসলেম উদ্দিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘নীতিমালা বাস্তবায়নে তখন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনি এটি কোন পর্যায়ে আছে তা জানা নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তথ্য হালনাগাদ করে শিগগির পাঠানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হবে।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র্যাগিংবিরোধী কমিটি এবং র্যাগিং পর্যবেক্ষণে স্কোয়াড গঠনের নির্দেশনা চেয়ে ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি হাইকোর্টে রিটটি করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ২০২০ সালে রিটটি করার পেছনে আমার মূল উদ্বেগ ছিল শিক্ষার্থীদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা। র্যাগিংকে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিছক মজা, পরিচিতিপর্ব বা ক্যাম্পাস-সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু, বাস্তবে এর আড়ালে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন, অপমান, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং কখনো কখনো যৌন হয়রানির মতো ঘটনাও ঘটছিল। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমার শিকার হচ্ছিল, এমনকি আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে।
তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থী যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে, তখন তার নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের অধিকার রয়েছে। তাকে ভয়, অপমান বা নির্যাতনের মধ্যে রেখে শিক্ষা গ্রহণ করতে বাধ্য করা তার জীবন ও মর্যাদার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সে সময় কার্যকর ও সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা না থাকায় আমি জনস্বার্থে রিটটি করি। পরবর্তীতে হাইকোর্টও র্যাগিংকে শিক্ষার্থীদের জীবন, মর্যাদা, মানসিক সুস্থতা ও মৌলিক অধিকারের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখেছেন।
তিনি আরও বলেন, নীতিমালা প্রণয়ন অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কারণ, দীর্ঘদিন যে সমস্যাটি অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বাইরে ছিল, ২০২৩ সালের নীতিমালার মাধ্যমে সরকার সেটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে প্রতিরোধ ও প্রতিকারের একটি কাঠামো তৈরি করেছে। কিন্তু নীতিমালা থাকা এবং সেটি বাস্তবে কার্যকর হওয়া এক বিষয় নয়।
বাস্তবায়নের জায়গায় এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এখনও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং ও র্যাগিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করলে পরবর্তীতে আরও হয়রানি, সামাজিক চাপ বা একাডেমিক সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কায় অভিযোগ করতেই ভয় পায়। আবার কোথাও কমিটি থাকলেও শিক্ষার্থীরা জানে না কোথায়, কীভাবে এবং কার কাছে নিরাপদে অভিযোগ করবে। তাই শুধু কমিটি গঠন করলেই হবে না। অভিযোগ জানানোর গোপন ও সহজ ব্যবস্থা, দ্রুত তদন্ত, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এজন্যই হাইকোর্ট পরবর্তীতে ২০২৩ সালের নীতিমালা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন এবং পূর্ণাঙ্গ রায়ে ২৪ ঘণ্টার টোল-ফ্রি অ্যান্টি-র্যাগিং হেল্পলাইন ও কেন্দ্রীয় ওয়েবসাইটের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।