অপরাধে জড়ানো প্রতি তিন শিশুর একজনের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ, কেন অপরাধে জড়াচ্ছে শিশুরা, সমাধান কী?

১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৯ PM
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি © টিডিসি সম্পাদিত

অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুদের মধ্যে প্রায় প্রতি তিনজনের একজনের বিরুদ্ধে রয়েছে হত্যার অভিযোগ। ধর্ষণ, ধর্ষণে সহায়তা, অপহরণ, চুরি, মাদক ব্যবহার ও উত্ত্যক্ত করার মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। পুলিশ স্টাফ কলেজের (পিএসসি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার এমন উদ্বেগজনক চিত্র। গবেষণায় বন্ধুদের প্রভাব, কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা, দারিদ্র্য, পারিবারিক অস্থিতিশীলতা ও অভিভাবকের দুর্বল নজরদারিকে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে ব্যক্তিগত আচরণের পাশাপাশি পরিবার, বন্ধুমহল ও সামাজিক পরিবেশের প্রভাব রয়েছে। তাই অপরাধে জড়ানো শিশুদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তাদের পেছনে থাকা পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন সংশোধন, পুনর্বাসন ও অপরাধ থেকে দূরে রাখার কার্যকর উদ্যোগ। গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত কিশোরদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে পৃথক কিশোর কারাগার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন কেউ কেউ। তবে শিশুদের অপরাধ থেকে ফিরিয়ে আনতে বিদ্যমান আইন ও ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন আইনজীবীরা।

গবেষণায় হত্যার অভিযোগ ৩২.৯২ শতাংশ শিশুর বিরুদ্ধে

‘সোশিওইকোনমিক ডিটারমিন্যান্টস অব চিলড্রেন ইন কনফ্লিক্ট উইথ দ্য ল ইন বাংলাদেশ: আ ক্রিমিনোলজিক্যাল অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক গবেষণাটি প্রকাশ করেছে পুলিশ স্টাফ কলেজ। পিএসসি জার্নালের ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত গবেষণাটি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান ও রামন চন্দ্র তালুকদার।

গবেষণায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট বিভাগের ১৬০টি থানার মামলা পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি গাজীপুরের বালক ও বালিকা এবং যশোরের বালক শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ৪০৪ শিশু ও তাদের ১৫৬ অভিভাবকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। গবেষণায় পরিমাণগত ও গুণগত—দুই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অপরাধে জড়ানো শিশুদের মধ্যে ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, এ গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত অপরাধে জড়ানো শিশুদের প্রায় প্রতি তিনজনের একজনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।

হত্যার অভিযোগের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ শিশুর বিরুদ্ধে ধর্ষণ, ধর্ষণে সহায়তা বা প্ররোচনার মামলা রয়েছে। এ ছাড়া ১৫ দশমিক ৮৪ শতাংশের বিরুদ্ধে চুরি, ১০ দশমিক ৯৭ শতাংশের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবহারের, ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশের বিরুদ্ধে অপহরণ এবং ৯ দশমিক ৬১ শতাংশের বিরুদ্ধে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। অন্যান্য অপরাধের মামলা রয়েছে ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ শিশুর বিরুদ্ধে।
তবে এসব পরিসংখ্যান শিশুদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ ও মামলার ধরন তুলে ধরে; প্রতিটি মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি নয়।

অপরাধের পেছনে বন্ধু ও কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব

গবেষণায় দেখা গেছে, অপরাধ সংঘটনের সময় ৫২ দশমিক ৯৭ শতাংশ শিশু অন্য কারও সঙ্গে ছিল। তাদের মধ্যে ৮৬ দশমিক ৯২ শতাংশের সঙ্গী ছিল বন্ধু। এসব বন্ধুত্বের গড় মেয়াদ ছিল আট বছর।

গবেষণার এ তথ্য বলছে, শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে বন্ধুমহলের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, দলগত চাপ ও কিশোর গ্যাংয়ের সংস্কৃতি কোনো কোনো শিশুকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তবে বন্ধুত্ব বা দলগত সম্পর্ক থাকলেই কেউ অপরাধে জড়াবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

গবেষণায় বন্ধুদের চাপ, কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, মাদকের সংস্পর্শ ও অভিভাবকের দুর্বল নজরদারিকে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি দারিদ্র্য, পারিবারিক অস্থিতিশীলতা, সামাজিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতিও শিশুদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

আর্থিক সংকট ও পারিবারিক পরিবেশও বড় কারণ

শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতারও প্রভাব রয়েছে বলে উঠে এসেছে গবেষণায়। এতে অন্তর্ভুক্ত শিশুদের ৪৪ দশমিক ০৬ শতাংশের পরিবারের আয় ছিল ব্যয়ের তুলনায় কম। এসব পরিবারকে আর্থিক ঘাটতিতে থাকা পরিবার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, পরিবারগুলোর গড় মাসিক আয় ছিল ১৯ হাজার ২৭৫ টাকা। তবে কোনো কোনো পরিবারের মাসিক আয় ছিল মাত্র ২ হাজার টাকা, আবার কোনো পরিবারের আয় ছিল ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া অপরাধে জড়ানো শিশুদের ১৭ দশমিক ৮ শতাংশের পরিবারের কোনো না কোনো সদস্যের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি মামলা ছিল। এসব পরিবারের অভিযুক্ত সদস্যদের মধ্যে বাবার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের মধ্যে হত্যার অভিযোগও উল্লেখযোগ্য; এ হার ৩৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

তবে পরিবারের সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা থাকা বা আর্থিক সংকটে বসবাস করাই কোনো শিশুর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার নিশ্চিত কারণ নয়। বরং এসব তথ্য পারিবারিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক সুরক্ষার ঘাটতির মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

চট্টগ্রামে আড়াই হাজারের বেশি শিশু মামলা বিচারাধীন

শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার উদ্বেগজনক চিত্র শুধু গবেষণার পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোর নথিতেও দেখা যাচ্ছে বিপুলসংখ্যক শিশু-সংশ্লিষ্ট মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শিশু অপরাধ দমন করা দুরূহ। অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুদের সংশোধনের ব্যবস্থাও করতে হবে। তারা যেন পুনরায় অপরাধে না জড়ায়, সেজন্য রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করে শিশুর যথাযথ বিকাশের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।— এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন, এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর), পুলিশ সদর দপ্তর

আদালতের নথিপত্রের চলতি বছরের আগস্ট মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলার সাতটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মোট ৭ হাজার ৫৮৬টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে শিশুদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা ২ হাজার ৬৪১টি। অর্থাৎ, বিচারাধীন মামলার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই শিশুদের সংশ্লিষ্টতায়।

ট্রাইব্যুনালভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ট্রাইব্যুনাল-১-এ মোট ২ হাজার ৮৫০টি মামলার মধ্যে শিশু মামলা ৭৫০টি। ট্রাইব্যুনাল-২-এ ৭৮৪টি মামলার মধ্যে শিশু মামলা ২৮০টি। ট্রাইব্যুনাল-৩-এ ৯১৫টি মামলার মধ্যে শিশু মামলা ২৫৩টি। ট্রাইব্যুনাল-৪-এ ১ হাজার ১৯৪টি মামলার মধ্যে শিশু মামলা ৪৭০টি।

অন্যদিকে, ট্রাইব্যুনাল-৫-এ ১ হাজার ২৯টি মামলার মধ্যে শিশু মামলা ৩৫৬টি, ট্রাইব্যুনাল-৬-এ ৭৭১টি মামলার মধ্যে শিশু মামলা ৩৫১টি এবং ট্রাইব্যুনাল-৭-এ ৫২৯টি মামলার মধ্যে শিশু মামলা ১৮১টি।

একটি জেলায় শিশুদের বিরুদ্ধে এত বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারাধীন থাকার বিষয়টি শিশুদের সুরক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। অপরাধ সংঘটনের পর বিচার নিশ্চিত করা জরুরি হলেও তার আগেই শিশুরা যাতে অপরাধের পথে না যায়, সে জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের ভূমিকা কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।

হত্যা ও ধর্ষণের মতো মামলাতেও অভিযুক্ত শিশু

চট্টগ্রামে শিশুদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর কয়েকটি ঘটনা অপরাধের ধরন ও এর ভয়াবহতা সামনে নিয়ে এসেছে। ২০২০ সালের ২৬ মে নগরীর হামজারবাগ এলাকায় সাগর নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ‘বাইরের ছেলেকে নিজেদের এলাকায় কেন নিয়ে আসা হলো’—এমন প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি ঘটে বলে মামলার বিবরণে উঠে এসেছে। সাব্বির হোসেন নামের এক কিশোর গ্যাং নেতার নেতৃত্বে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় ১৭ বছর বয়সী কিশোর সালমানের (ছদ্মনাম) নাম আসে। তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে আলাদা অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়। মামলাটি বর্তমানে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এ সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে বিচারাধীন রয়েছে।

অন্যদিকে, হামজারবাগের পাশের এলাকা আতুরার ডিপোতে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে এক কিশোরীকে জোরপূর্বক ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার প্রধান আসামি শিশু ফয়সাল (ছদ্মনাম)। তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলে আদালত অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন। মামলাটি বর্তমানে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এ সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে বিচারাধীন।

খেলতে বেরিয়ে বন্ধুদের হাতে খুন

এ ছাড়া কুমিল্লায় স্কুলছাত্র অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে দুজনের বয়স ১৫ ও ১৬ বছর। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় আদালত তাদের কারাগারে না পাঠিয়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এসব ঘটনা শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ভয়াবহতা তুলে ধরলেও প্রতিটি মামলায় অভিযোগের বিচারিক অবস্থান বিবেচনায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই শিশুদের শনাক্ত করা, তাদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ থেকে সরিয়ে আনা এবং কার্যকর সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী।

শিশু আইনে শাস্তির চেয়ে সংশোধন ও পুনর্বাসনে গুরুত্ব

বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তিকে আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ ধরনের শিশুর বিচার ও ব্যবস্থাপনায় সাধারণ ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ার পরিবর্তে শিশুদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ ব্যবস্থা অনুসরণের বিধান রয়েছে।

আইনের মূল দর্শন হলো শিশুকে কেবল শাস্তি দেওয়া নয়, বরং তার সংশোধন, পুনর্বাসন এবং সমাজে ফিরে আসার সুযোগ নিশ্চিত করা। এ কারণে শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স, অপরাধের ধরন, পারিবারিক পরিস্থিতি ও সংশোধনের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলেও শিশুদের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের মতো দণ্ডবিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রয়োগ করা যায় না।

অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে তাদের সংশোধন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার কথা। তবে এসব কেন্দ্রের পরিবেশ, নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ কতটা কার্যকর—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কেন্দ্রে পাঠানোই যদি শেষ পদক্ষেপ হয়, তাহলে শিশুকে অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে আনার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তাদের ব্যবহার করে, আশ্রয় দেয় কিংবা অপরাধে উৎসাহিত করে, তাদের দায়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব, অপরাধে প্ররোচনা এবং শিশুদের ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণের ভিত্তিতে পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক এবং ঢাবি সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আমরা বারবার বলছি, বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বর্তমানে শিশু-কিশোর কারাগার প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে শিশুর বিরুদ্ধে ভয়াবহ অপরাধের অভিযোগ আছে, তাকে ওই কারাগারে থাকতে হবে। সেখানে সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে শিশুদের অপরাধ কমানো সম্ভব হবে। 

তার বক্তব্যে গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত কিশোরদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে পৃথক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে শিশুদের জন্য যেকোনো নতুন ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের অধিকার, নিরাপত্তা, সংশোধন ও পুনর্বাসনের লক্ষ্য নিশ্চিত করাও জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

এসব বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, দেশের প্রতিটি থানায় শিশুদের জন্য বিশেষ ডেস্ক রয়েছে। কোনো শিশুর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ পাওয়া গেলে যথাযথ আইন ও বিধি অনুসরণ করে ব্যবস্থা নেয়া হয়। শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শিশু অপরাধ দমন করা দুরূহ। অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুদের সংশোধনের ব্যবস্থাও করতে হবে। তারা যেন পুনরায় অপরাধে না জড়ায়, সেজন্য রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করে শিশুর যথাযথ বিকাশের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

করণীয় কী?

শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে শুধু আইন প্রয়োগ বা অপরাধ সংঘটনের পর শাস্তির ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।

প্রথমত, পরিবারকে শিশুদের দৈনন্দিন জীবন, বন্ধুমহল, চলাফেরা ও অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। তবে নজরদারির নামে দমনমূলক আচরণ না করে শিশুদের সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি, যাতে তারা সমস্যায় পড়লে পরিবারের কাছে সাহায্য চাইতে পারে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঝরে পড়া, সহিংস আচরণ, মাদকের সংস্পর্শ ও কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি চিহ্নিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় সমাজকর্মীদের সমন্বয়ে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জন্য কাউন্সেলিং ও সহায়তার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের শিশুদের শিক্ষা, পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। অর্থনৈতিক সংকট বা পারিবারিক অস্থিতিশীলতার কারণে কোনো শিশু যেন অপরাধী গোষ্ঠীর প্রলোভন বা চাপের শিকার না হয়, সে জন্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

চতুর্থত, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে মানসম্মত শিক্ষা, মনোসামাজিক সহায়তা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সংশোধন শেষে সমাজে ফিরে আসা শিশুদের জন্যও ধারাবাহিক সহায়তা থাকা দরকার, যাতে তারা আবার অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে।

পঞ্চমত, শিশুদের অপরাধে ব্যবহারকারী বা পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে প্রমাণসাপেক্ষে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের বিরুদ্ধে মামলার দ্রুত ও ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি, আইনি সহায়তা এবং শিশু-বান্ধব বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি।

স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কমিটি গঠনের কার্যক্রম স্থগিত গভীর ষড়…
  • ১৫ অক্টোবর ২০২৬
যশোর শিক্ষা বোর্ডের সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠােনে ম্যানে…
  • ১৫ অক্টোবর ২০২৬
‎প্রকাশিত হলো স্যার এ. এফ. রহমান হল সংসদের বার্ষিক ম্যাগাজি…
  • ১৫ অক্টোবর ২০২৬
ডাকসু নেতা মুসাদ্দিকের প্রচেষ্টা, চুরি হওয়া মুঠোফোন ফিরে পে…
  • ১৫ অক্টোবর ২০২৬
পূজার ছুটির আগে সাজেক ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
  • ১৫ অক্টোবর ২০২৬
চরিত্রহীন-লম্পট-টাউট-বাটপাররা ক্ষমতার লোভে এনসিপিতে জড়ো হয়ে…
  • ১৫ অক্টোবর ২০২৬