কুমিল্লার শিশু অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে আসামিদের সঙ্গে তার পূর্বপরিচয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ছবি ও ভিডিওসহ বিভিন্ন তথ্যের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এ সময় সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার মোঃ আনিসুজ্জামান বলেন, ‘Picture speaks thousand words’—অর্থাৎ ছবি অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সংবাদ সম্মেলনে এই কথা বলেন পুলিশ সুপার।
পুলিশ কর্মকর্তা জানান, নিহত অপ্রতীমের বয়স ১৩ বছর এবং সে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অন্যদিকে গ্রেপ্তার তুহিনের বয়স ১৯, ফাহাদের ১৫ এবং কামরুলও অপ্রতিমের চেয়ে বয়সে বড়। ফলে তাদের মধ্যে বন্ধুত্বটি ছিল অসম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের একসঙ্গে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও পাওয়া গেছে বলেও জানায় পুলিশ।
অপ্রতীমকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়ার পর হত্যার অভিযোগে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তুহিনের বাসা থেকে অপ্রতিমের আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আসামিদের পূর্বপরিচয়ের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতেও দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘Picture speaks thousand words।’ এরপর সাংবাদিকদের পুলিশের প্রস্তুত করা এক থেকে দুই মিনিটের ছবি সম্বলিত প্রেজেন্টেশন দেখার অনুরোধ করেন তিনি।
তবে অপ্রতিম ও আসামিদের পূর্বপরিচয়ের সূত্র, তাদের মধ্যে কী ধরনের যোগাযোগ ছিল এবং এ ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা আরও তদন্তের বিষয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সুপার বলেন, নিহত শিশুটি ক্লাস সেভেনে পড়ত। তার বয়স ১৩ বছর। আর আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিনের বয়স ১৯ বছর। সে কুমিল্লা সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে ২০২৫ সালে ফেল করে ড্রপআউট হয়। মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদের বয়স ১৫ বছর। সে ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। কামরুলও একই স্কুলের শিক্ষার্থী। সিয়াম আব্দুল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। তাদের মধ্যে অসম বন্ধুত্ব ছিল। অর্থাৎ অপ্রতিম ক্লাস সেভেনে পড়ত। এরা তার সহপাঠী ছিল না। যারা তার বন্ধু ছিল, তারা বয়সে তার চেয়ে সিনিয়র ছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন বখাটে ছিল।
আমার কাছে এই হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটনের কিছু ভিডিও ফুটেজ এবং টিকটক করার বিষয়সহ কিছু তথ্য রয়েছে। অপ্রতীমসহ বাকি যারা আসামি, তাদের বিষয়ে আমরা তথ্য পেয়েছি। আমরা ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করেছি, মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করেছি এবং যে আইফোনটির কারণে হত্যাকাণ্ড, সেই আইফোনটিও আসামির দেখানো মতে তার বাসা থেকে উদ্ধার করেছি।
যেভাবে হত্যা, আসামীদের বর্ণনা তুলে ধরলেন পুলিশ
পুলিশ সুপার বলেন, চাঞ্চল্যকর অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটন করতে আমরা জিডির ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করি। তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে আমরা নিশ্চিত হই যে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর তারিখ আনুমানিক ২টা থেকে সোয়া ২টার দিকে তুহিন অপ্রতীমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা নামক স্থানে চারপাশে পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের পর আমরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখি ও পর্যালোচনা করি। এতে অপ্রতীমের সঙ্গে থাকা তুহিনকে মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার আগেই আমরা হেফাজতে নিই।
কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, একটানা জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন আমাদের কাছে স্বীকার করে যে, অপ্রতীমের মোবাইল আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পনা করে সে তাকে ওই নির্জন ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়। তুহিন আরও জানায়, এই ঘটনায় ফাহাদ এবং ফাহাদের এক বন্ধু জড়িত ছিল। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আমরা তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান পরিচালনা করি এবং ফাহাদকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করি। জিজ্ঞাসাবাদে ফাহাদ জানায়, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার আরেক বন্ধু কামরুলও জড়িত। ফাহাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা কামরুলকে হেফাজতে নিই।
পুলিশ সুপার বলেন, তুহিনের দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে, প্রথমে সে আমাদের ভুল পথে পরিচালিত করেছিল। আইফোনটি উদ্ধারের জন্য আমরা তিন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করি। কোথাও না পাওয়ার পর অবশেষে তার স্বীকারোক্তি ও দেখানো মতে তার বাসায় অভিযান পরিচালনা করি। সেখানে তার দেখানো স্থান থেকে আইফোনটি আমরা উদ্ধার করতে সক্ষম হই।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি, ঘটনার দিন বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে সানন্দা নামক স্থানে চারপাশে পাহাড়ঘেরা নির্জন বনের ভেতরে অপ্রতীমের আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতীম বাধা দেয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। এ সময় প্রথমে তুহিন এবং পরবর্তীতে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতীমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে। একপর্যায়ে অপ্রতীমের মৃত্যু নিশ্চিত হলে তুহিন অপ্রতীমের আইফোনটি নিয়ে ফাহাদ ও কামরুলসহ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এ ছাড়া আমরা সিয়াম নামে আরেকজনকে আটক করেছি। তার বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করছি।