বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস
বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস © সংগৃহীত
আজ ১৫ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘অংশীদার ভবিষ্যতের জন্য দক্ষতা’। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সবুজ অর্থনীতির দ্রুত বিস্তারের প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ উপযোগী দক্ষতা অর্জনে তরুণদের সক্ষম করে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে ইউনেস্কো-ইউনেভক।
ইউনেস্কো-ইউনেভকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী দক্ষতার ঘাটতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে ২৭ কোটি ৩০ লাখ শিশু ও তরুণ এখনো শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী প্রতি পাঁচজনের একজন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় আসেননি। একই সঙ্গে বর্তমান কর্মীবাহিনীর ৪০ শতাংশের দক্ষতা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ২২ শতাংশ কর্মীকে নতুন পেশা বা কাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চিত্রটি একই সঙ্গে সম্ভাবনাময় ও উদ্বেগের। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ। আর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ অনুযায়ী, দেশে ১১ কোটি ৭১ লাখ কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে প্রায় চার কোটি এখনো কর্মের বাইরে রয়েছেন।
২০১৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ দিবসটি ঘোষণার পর ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর এটি বৈশ্বিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। মূলত প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং কর্মসংস্থানের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরতেই এই আয়োজন।
বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস উপলক্ষে আলাদা বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ উপলক্ষে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দেশজুড়ে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, সেমিনার ও দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ অনুযায়ী, দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় দুই কোটি ৬৮ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ ৪০ হাজার তরুণ বেকার, যা শতাংশের হিসাবে ৭ দশমিক ২। উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৯ শতাংশই এই বয়সসীমার আওতাভুক্ত।
অন্যদিকে, সরকারের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) ‘হারনেসিং দ্য পটেনশিয়ালস অব ইয়ুথ’ শীর্ষক নীতিপত্রের তথ্য আরও আশঙ্কাজনক। সেখানে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ৫৫ লাখ তরুণ-তরুণী বর্তমানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা কোনো প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নেই। একই নীতিপত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্নকারীর মধ্যে বেকারত্বের হার ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও)-এর এক জরিপে দেখা গেছে, গত তিন বছরে ৯৩ দশমিক ৪ শতাংশ বাংলাদেশি অন্তত এক দিনের জন্যও কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেননি। অথচ অর্ধেকের বেশি মানুষ জানিয়েছেন, কর্মভিত্তিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। দক্ষতার এই ঘাটতির কারণেই অনেকেই আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—উভয় ধরনের কর্মসংস্থানে কাঙ্ক্ষিত সুযোগ পাচ্ছেন না।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালে দেশের প্রতি পাঁচজন তরুণীর মধ্যে তিনজনই কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের (NEET) বাইরে ছিলেন।
বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২২ অনুযায়ী, ওই বছর নারীদের মধ্যে এনইইটি হার বেড়ে ৬১ দশমিক ৭১ শতাংশে পৌঁছায়। একই সময়ে দেশের সামগ্রিক এনইইটি হার ৩৯ দশমিক ৬১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ দশমিক ৬৭ শতাংশে দাঁড়ায়। তুলনায়, আইএলওর তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে বিশ্বে গড়ে এনইইটি হার ছিল ২১ দশমিক ৭ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে বাংলাদেশের জনমিতিক সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা কঠিন হবে।