ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়া কমন সেন্স

০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪০ PM
ড. মো. শিবলুর রাহমান

ড. মো. শিবলুর রাহমান © টিডিসি সম্পাদিত

একসময় বাবা-মা সন্তানকে লালনপালন ও বড় করতে শিখিয়েছেন—বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করতে হবে, ছোটদের স্নেহ করতে হবে, রাস্তায় শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে, অন্যের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে, কাউকে অপমান করা যাবে না। এগুলো ছিল সামাজিক জীবনের মৌলিক শিষ্টাচার। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে আমাদের জীবনের একটি বড় অংশ বাস্তব জগতের বাইরে, ডিজিটাল জগতে। অথচ এই নতুন জগতের আচরণবিধি—"ডিজিটাল কমন সেন্স”—আমরা কোথাও আনুষ্ঠানিকভাবে শিখি না। ফলে প্রায় প্রতিদিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন সব ঘটনা ঘটছে, যা ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান এমনকি রাষ্ট্রের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

প্রতিদিনই কেউ না কেউ ট্রল, গুজব, ব্যক্তিগত আক্রমণ, চরিত্রহনন, ভুয়া তথ্য প্রচার, বুলিং কিংবা অনলাইন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। একজন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিল্পী কিংবা সাধারণ নাগরিক—কেউই এর বাইরে নন।

প্রশ্ন হলো, সমস্যাটা কি প্রযুক্তির, নাকি প্রযুক্তি ব্যবহারের সংস্কৃতির?

উত্তরটি দ্বিতীয়টিই, সমস্যাটা প্রযুক্তি ব্যবহারের সংস্কৃতির ।

প্রযুক্তি অনেক দূর এগিয়েছে, কিন্তু এখনও ডিজিটাল আচরণ শেখানো হয় না সামাজিক জীবনের মৌলিক শিষ্টাচারের মত করে । বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের বরাতে জানা যায় যে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন প্রায় ১৪ কোটি। স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। তরুণদের বড় একটি অংশ প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটায়। কিন্তু আমাদের স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পাঠ্যক্রমে নেই, কী পোস্ট করা উচিত? কোন ছবি শেয়ার করা নিরাপদ? কার পোস্টে কী ধরনের মন্তব্য করা শোভন? মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর মানহানির সীমারেখা কোথায়? গুজব কীভাবে ছড়ায়? সাইবার বুলিং কী? ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট কী? বা অনলাইনে মতবিরোধ কীভাবে সভ্যভাবে প্রকাশ করতে হয়? ফলে আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শিখেছি, কিন্তু প্রযুক্তির সামাজিক দায়িত্ববোধ এখনও শিখিনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ (UNICEF) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইন বুলিং বা সাইবার বুলিং কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় ঝুঁকি। গবেষণায় নিয়মিতভাবে পাওয়া যায় যে, সাইবার বুলিংয়ের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আত্মসম্মানবোধের অবনতি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ইউনিসেফের বৈশ্বিক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় প্রতি তিনজন তরুণের একজন কোনো না কোনো সময় অনলাইন বুলিংয়ের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অনেকেই স্বীকার করেছেন যে, বুলিংয়ের কারণে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন অথবা স্কুলে যাওয়া পর্যন্ত বন্ধ করেছেন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনলাইনে একজন মানুষ এমন মন্তব্য লিখে ফেলেন, যা তিনি সামনাসামনি কখনোই বলতেন না। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় অনলাইন ডিসহিবিশন ইফেক্ট । পর্দার আড়ালে থাকায় মানুষ নিজের ভাষা, আবেগ ও আচরণের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু শেয়ার করার আগে যদি আমরা মাত্র পাঁচটি প্রশ্ন নিজেদের করি, তাহলে অনেক সমস্যাই এড়ানো সম্ভব। প্রথমত, এটি কি সত্য? দ্বিতীয়ত, এটি কি প্রয়োজনীয়? তৃতীয়ত, এটি কি কাউকে অযথা আঘাত করবে? চতুর্থত, এটি কি আইনগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে? পঞ্চমত, এই পোস্টটি যদি দশ বছর পরও ইন্টারনেটে থেকে যায়, আমি কি তখনও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করব? এই পাঁচটি প্রশ্নই হতে পারে ডিজিটাল কমন সেন্সের সবচেয়ে সহজ পরীক্ষা।

মন্তব্যও একটি সামাজিক দায়িত্ব। অনেকে মনে করেন, "আমি তো শুধু একটা কমেন্ট বা মন্তব্য করেছি।" কিন্তু বাস্তবে একটি অবমাননাকর মন্তব্য কয়েক হাজার মানুষকে একই ধরনের আক্রমণে উৎসাহিত করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক মন্তব্য খুব দ্রুত সামাজিক সংক্রমণের মতো ছড়িয়ে পড়ে। একজন শুরু করলে অনেকেই যাচাই না করেই তাতে যোগ দেন। এভাবে একজন মানুষ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শত শত অপমানজনক মন্তব্যের লক্ষ্যবস্তু হয়ে যান। এটি শুধু মতপ্রকাশ নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি ডিজিটাল গণপিটুনি।

মতের বিরোধ থাকতেই পারে,  তাই বলে মতের বিরোধ মানেই শত্রুতা নয়। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজে মতভেদ থাকবে। কিন্তু মতভেদ কখনোই ব্যক্তিগত অপমান, ঘৃণা কিংবা চরিত্রহননের কারণ হতে পারে না। আমরা যুক্তির বদলে ব্যক্তিকে আক্রমণ করছি। তথ্যের বদলে গুজব শেয়ার করছি। সমালোচনার বদলে বিদ্রূপ করছি। এভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ধীরে ধীরে সংলাপের জায়গা হারিয়ে সংঘাতের জায়গায় পরিণত হচ্ছে।

তাহলে মনে প্রশ্ন জাগতেই  পারে এমন অবস্থায়কী করা প্রয়োজন?  শুধু আইন দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন ডিজিটাল নাগরিকত্ব গড়ে তোলা।  প্রথমত, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল লিটারেসি ও সোশ্যাল মিডিয়া এথিক্স বা ডিজিটাল আচরণবিধি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।  দ্বিতীয়ত, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের জন্য এবং অভিভাবকদের জন্য নিয়মিত “ডিজিটাল আচরণবিধি” বিষয়ক প্রশিক্ষণ চালু করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাইবার বুলিং প্রতিরোধ নীতিমালা এবং অভিযোগ গ্রহণের সহজ ব্যবস্থা থাকতে হবে। চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য যাচাই (ফ্যাক্ট চেকিং) এবং গুজব শনাক্ত করার দক্ষতা বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, পরিবার থেকেই শিশুদের শেখাতে হবে—অনলাইনে যে আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়, অফলাইনেও তা গ্রহণযোগ্য নয়; আবার অফলাইনে যা অগ্রহণযোগ্য, অনলাইনেও তা কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

অবশেষে বলা যায়, প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোচ্ছে, আমাদের ডিজিটাল কমন সেন্স তত দ্রুত গড়ে উঠছে না। এই ব্যবধানই তৈরি করছে নতুন ধরনের সামাজিক সংকট।

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন একটি সামাজিক শিক্ষা—কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে হয়। কারণ একটি অসচেতন পোস্ট, একটি যাচাইহীন শেয়ার কিংবা একটি অবমাননাকর মন্তব্য কখনো কখনো একজন মানুষের জীবন, একটি পরিবারের শান্তি কিংবা একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম ধ্বংস করে দিতে পারে। ডিজিটাল যুগে তাই শুধু প্রযুক্তি জানা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রজ্ঞা। আর সেই প্রজ্ঞার নামই—"সোশ্যাল মিডিয়া কমন সেন্স”।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

ট্যাগ: মতামত
রফিকুল ইসলাম মিয়ার মৃত্যুর খবর, পোস্ট ডিলিট করল বিএনপির ভের…
  • ০৮ অক্টোবর ২০২৬
মিলভিক বাংলাদেশ নিয়োগ দেবে ৯৯ সেলস অ্যাসোসিয়েট, আবেদন ৩ নভে…
  • ০৮ অক্টোবর ২০২৬
দুই মাসের মধ্যে ১০০০ খেলার মাঠ স্থাপনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্…
  • ০৮ অক্টোবর ২০২৬
ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়া কমন সেন্স
  • ০৮ অক্টোবর ২০২৬
মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ নিয়োগ দেবে বাংলাদেশ স্পাইন অ্যান্ড অর…
  • ০৮ অক্টোবর ২০২৬
কুরআন শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে কাজ করবে সরকার: রাষ্ট্রপতি
  • ০৮ অক্টোবর ২০২৬