শতবর্ষের আলোকবর্তিকা ও জাতি বিনির্মাণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার

৩০ জুন ২০২৬, ১০:০২ PM , আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬, ১০:২০ PM
ড. মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন ভূঁইয়া

ড. মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন ভূঁইয়া © টিডিসি সম্পাদিত

একটি জাতির সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার মানদণ্ড নির্ণয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো তার গ্রন্থাগার ব্যবস্থা। গ্রন্থাগার মূলত জ্ঞান, গবেষণা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের প্রাণকেন্দ্র। বাঙালি জাতি বিনির্মাণে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একাডেমিক গ্রন্থাগার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ব্রিটিশ ভারতের পূর্বাঞ্চলে উচ্চশিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে ১লা জুলাই ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই গ্রন্থাগারটি শুধু বাংলাদেশের নয় বরং বিশ্বের জ্ঞান পিপাসু মানুষের জ্ঞান বিতরণে তীর্থস্থান হিসেবে সমাদৃত। গ্রন্থাগারটি শতবর্ষ ধরে শিক্ষা, গবেষণা, সৃজনশীলতা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র হিসেবে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারটি গৌরবের শতবর্ষ অতিক্রম করে ২০২৬ সালে ১০৬তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। একটি গ্রন্থাগার সমৃদ্ধ হয় তার নিজস্ব সংগ্রহে।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারটির যাত্রা শুরু হয় ঢাকা কলেজ এবং ঢাকা ল’ কলেজ থেকে প্রাপ্ত প্রায় ১৮,০০০ (আঠারো হাজার) বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে। বর্তমানে গ্রন্থাগারটির সংগ্রহ সংখ্যা প্রায় ৯,০০,০০০ (নয় লক্ষ)। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, ভারতীয় উপ-মহাদেশের প্রথম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের বর্তমান সংগ্রহ সংখ্যা প্রায় ১০,০০,০০০ (দশ লক্ষ)। গ্রন্থাগারের সংগ্রহ তুলনা করলে দেখা যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৪ বছর পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও এই গ্রন্থাগারের সংগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান গ্রন্থাগার

দেশি-বিদেশি দুর্লভ সংগ্রহের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারটিতে রয়েছে বিপুলসংখ্যক জার্নাল, ম্যাগাজিন ও সাময়িকী। বিশ্বের খ্যাতনামা ই-বুক, ই-জার্নাল ও ই-রিসোর্স সংযুক্তি গ্রন্থাগারটিকে আধুনিক জ্ঞানচর্চার এক পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রে পরিণত করেছে। গ্রন্থাগার রিপোজিটরিতে বর্তমানে ৪৪৫৬টি এম.ফিল. এবং পিএইচডি থিসিস সংরক্ষিত আছে। এই গ্রন্থাগারের গর্বের অধ্যায় হচ্ছে এর দুস্প্রাপ্য পান্ডুলিপি।

বর্তমানে গ্রন্থাগারটিতে প্রায় ৩০,০০০ (তিরিশ হাজার) এর অধিক প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় দুস্প্রাপ্য পান্ডুলিপি রয়েছে। ১৫ থেকে ১৯ শতকের মধ্যে রচিত পান্ডুলিপিগুলো সংস্কৃত, বাংলা, আরবি, হিন্দী, মৈথিলি এমনকি প্রাচীন বাংলাভাষা ও হরফে তালপাতা, তেরেটপাতা, কলা পাতা, গাছের বাকল এবং হাতে তৈরী তুলট কাগজে লেখা রয়েছে। এই পান্ডুলিপিগুলো শুধু বাংলাদেশে নয় বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জ্ঞানভান্ডার। দুস্প্রাপ্য পান্ডুলিপিগুলো  ডিজিটাল সংরক্ষণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গবেষণার সুবিধার্থে গ্রন্থাগারটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণের জন্য পুরাতন ও দুর্লভ সংবাদপত্রগুলো বাঁধাই করে সংরক্ষণ করার পাশাপাশি ১০৩টি শিরোনামের নতুন ও পুরাতন পত্রিকা ডিজিটাল সংরক্ষণ করেছে।

লেখক

গ্রন্থাগারটিতে বর্তমানে ২০০০ ছাত্রছাত্রীর একত্রে সিটিং ক্যাপাসিটি রয়েছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে গ্রন্থাগারটিতে বইপত্র ও জার্নাল ক্রয় বাবদ বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা এবং অনলাইন সাবস্ক্রিপশন বাবদ বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৩২ লক্ষ টাকা। গ্রন্থাগারের বইপত্র ও জার্নাল ক্রয় বাবদ বরাদ্দ প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। গ্রন্থাগারটি বর্তমানে ১০টি শাখার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। শাখাগুলো হচ্ছে প্রশাসন শাখা, সংগ্রহ শাখা, ডিজিটাইজেশন শাখা, প্রস্তুতিকরণ শাখা, পাণ্ডুলিপি শাখা, পুস্তক বাঁধাই শাখা, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা, তথ্য প্রযুক্তি শাখা, পাঠকসেবা শাখা এবং বিজ্ঞান শাখা। গ্রন্থাগারের সমস্ত কার্যক্রম বর্তমানে তিনটি পৃথক ভবন থেকে পরিচালিত হয়ে থাকে যা প্রশাসনিক ভবন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবন এবং বিজ্ঞান গ্রন্থাগার ভবন নামে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের প্রথম গ্রন্থাগারিক ছিলেন ঢাকা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ এফ. সি. টার্নার। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিকের দায়িত্বে আছেন অধ্যাপক ড. কাজী মোস্তাক গাউসুল হক।

উপ-গ্রন্থাগারিক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে কর্মরত থাকার কারণে আমার দৃষ্টিতে বর্তমানে গ্রন্থাগারের উল্লেখযোগ্য সমস্যাগুলো হলো- গ্রন্থাগার ভবনগুলো অত্যধিক পুরাতন হয়ে পড়েছে, বাজেটের অপর্যাপ্ততা রয়েছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ৩৭০০০ ছাত্রছাত্রীর তুলনায় গ্রন্থাগারে সিটিং ক্যাপাসিটি কম, আন্তর্জাতিক ডাটাবেজে এক্সেস সীমিত, অপর্যাপ্ত ই-রিসোর্স, প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাব, প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবলের অভাব এবং গ্রন্থাগারের রিডিং রুমগুলোতে এয়ারকন্ডিশন ফ্যাসিলিটির অভাব।

দুস্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি

উপর্যুক্ত সমস্যাগুলো সমাধানকল্পে ভবিষ্যৎ করণীয় হচ্ছে- আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন গ্রন্থাগার ভবন নির্মাণ করা, গ্রন্থাগারটিকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল গ্রন্থাগারে রূপান্তর করা, গ্রন্থাগার পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ রাখা, আন্তর্জাতিক গবেষণা ডাটাবেজে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি করা, কৃত্রিম বুদ্ধমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, গবেষণা সহায়তা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন বৃদ্ধি করা, উন্মুক্ত জ্ঞানভাণ্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহ সংরক্ষণ ও ঐতিহ্য রক্ষা করা, গ্রন্থাগার মানবসম্পদের উন্নয়ন করা, বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চতর গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে কোলাবোরেশন স্থাপন করার ব্যবস্থা করা, আন্তর্জাতিক গ্রন্থাগার ও তথ্য সংস্থার সদস্য গ্রহণ করা উচিত এবং সর্বোপরি, পাঠাভ্যাস ও জ্ঞান সংস্কৃতির পরিবেশ গড়ে তোলা।

এক শতাব্দীর অধিককাল ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও সংস্কৃতির বিকাশে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। এটি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারই নয় বরং জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। সত্যিই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার শতবর্ষের আলোকবর্তিকা, যার আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে অতীত, সমৃদ্ধ হচ্ছে বর্তমান এবং নির্মিত হচ্ছে আগামী বাংলাদেশের স্বপ্নময় ভবিষ্যৎ।

লেখক: উপ- গ্রন্থাগারিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার

ফেনির অপহৃত ৪ তরুণকে টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে উদ্ধ…
  • ৩০ জুন ২০২৬
নকআউটে বড় চমক নরওয়ের, ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ হতে একসঙ্গে ১০ …
  • ৩০ জুন ২০২৬
গলায় বাদাম আটকে প্রাণ গেল তিন বছরের মানহার
  • ৩০ জুন ২০২৬
শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যা…
  • ৩০ জুন ২০২৬
বছরে গড়ে ৪০ দিন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন বিশ্বের ৬৮ শতাং…
  • ৩০ জুন ২০২৬
বিএনপি নেতাকে অতিথি না করায় স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের বি…
  • ৩০ জুন ২০২৬