রাজধানীতে আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা সময়ের দাবি

৩০ জুন ২০২৬, ০৯:৩০ PM
এম এ মতিন

এম এ মতিন © টিডিসি সম্পাদিত

ঢাকা শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা বলতে আমরা বুঝি, বাসা থেকে বের হয়ে কাছাকাছি কোন বাস স্টেশনে পৌঁছে দেখবো – লক্করঝক্কর, রং উঠে যাওয়া বিবর্ণ চেহারার রাইদা, তুরাগ, ভিক্টর, আসমানী, শতাব্দী, মঞ্জিল, ইত্যাদি বাস দাঁড়িয়ে আছে একটার গা ঘেষে আর একটা। কোনটা সোজা হয়ে, কোনটা তেসড়া হয়ে! হেল্পার ডাকাডাকি করছে যাত্রীদের। যাত্রীরা কিন্তু তার ঈপ্সিত বাস দেখতে পাচ্ছেন না। কারণ বাস তো রাস্তার মাঝখানে, তার সামনে যে আর একটা বাস দাঁড়িয়ে! যাত্রীকে ঈপ্সিত বাসের কাছে যেতে হলে আর একটা বাসের সামনে দিয়ে, দুই বাসের মাঝখান দিয়ে ঝুকি নিয়ে অনেক সাবধানে বাসের কাছে যেতে হবে। হেল্পার টেনে/ধাক্কিয়ে কোন মতে বাসে তুলে দেন যাত্রীকে – সে পুরুষই হোক কিংবা মহিলা। বাস তো চলার মধ্যে! বাসে উঠে খেই হারিয়ে ফেলেন যাত্রী। কিসে ধরবেন, কোথায় দাঁড়াবেন, কোথায়ই বা বসবেন? সিটের কাছে যাওয়ার কোন জো নেই। ধরার কিছুই পাচ্ছেন না! পড়ে যাওয়ার যোগাড়, আর কি! অনেকে পড়েও যান। বয়স্ক ও বৃদ্ধদের তো দুরবস্থার শেষ নেই – বাসে উঠতে গিয়ে! কারণ, এই বাসগুলো যাত্রীবান্ধব নয়। এগুলো যথেষ্ট উঁচু,  চলতো আন্ত-জেলা বাস হিসেবে – শহরের স্বল্প গতির বাস এ গুলো নয়। যে কোম্পানীগুলোর নাম উপরে বলা হলো – এগুলো সবই একই ধরণের বাস। বাসে উঠার যে বিপজ্জনক কাহিনী বললাম, নামার ক্ষেত্রে অবস্থা তথৈবচ – বরং এর চেয়েও খানিকটা ভয়াবহ। নামার সময়ও আপনি ধরার কোন সাপোর্ট পাবেন না – চলতি বাসে দাঁড়িয়ে থাকাও সম্ভব নয়। ওদিকে চালক হঠাৎ করে ব্রেক চাপলে আপনার সামনের দিকে ঝুকে পড়ার বিকল্প কিছু নেই। গেট থেকে কোন রকমে নেমে দেখবেন আপনি রাস্তার মাঝখানে। আপনার সামনে আর একটা বাস দন্ডায়মান। দুই বাসের মাঝখানে পড়ে যাত্রী হত্যার ঘটনা ঢাকা শহরে বিরল নয়। তবু আপনাকে নামতেই হবে। বাস যে স্টেশন ছেড়ে চলে যাচ্ছে! ভাড়া দেয়া – সে আর এক ঝক্কী! ভাঙতি নেই আপনার কাছে। দুই শত টাকার নোট দিয়েছিলেন। বাকি টাকার জন্যে হেল্পারকে স্মরণ করাতে হচ্ছে। নয়তো বাকি টাকা জলে যাবে! অবশেষে আপনি নামতে পেরেছেন বাস থেকে। ঘর্মাক্ত কলেবর। স্রষ্টাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে ঘরমুখো রওয়ানা দিয়েছেন এবং বাড়ি পৌছে চিন্তা করছেন – রাজধানী শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা এর চেয়ে উন্নত হতে পারে না? ঢাকা শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা সম্পর্কে এতক্ষণ যা বলা হয়েছে প্রকৃত অবস্থা তার চেয়ে ভয়াবহ। বিদ্যমান বাস ব্যবস্থাকে বলা যায় “বাস যুদ্ধ"।

বর্তমানে ঢাকার বাস ব্যবস্থা মূলত একটি প্রতিযোগিতামূলক নেট-কস্ট মডেলে পরিচালিত হয়, যেখানে অপারেটরদের আয় নির্ভর করে যাত্রীসংখ্যার উপর। এর ফলে সৃস্টি হয় “বাস যুদ্ধ”। এতে বেপরোয়া গাড়ি চালনা, এবং অনিয়ন্ত্রিত স্টপেজ তৈরি হয়েছে। লাভজনক রুটে প্রায় ৪,০০০ বাস কেন্দ্রীভূত, অন্যদিকে অনেক এলাকা পরিবহনসেবা থেকে বঞ্চিত। এই অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা প্রতিদিন যাত্রীদের ৮০ লাখের বেশি কর্মঘণ্টা নষ্ট করছে। বিখ্যাত ট্রেইনার টনি রবিন্সের পরিভাষায় বললে এই অবস্থাকে বলতে হয়, ‘প্যারাডাইম’ (মানসিক মানচিত্র)। এর অর্থ হলো: "বাস মানেই বিশৃঙ্খলা—যাত্রী কষ্ট পাবেন, তবু চলবে"। কোন নিয়ম নেই। একটা বাস কোন রুটে যাবে, কখন ছাড়বে, কখন পৌঁছাবে— তার কোনো স্পষ্ট সময়সূচী নেই। অপারেটরদের ইচ্ছামাফিক বাস চলে। লাভজনক রুটে (যেমন গুলিস্তান-আশুলিয়া) একসঙ্গে ৪,০০ বাস নামে, অথচ অনেক এলাকায় (যেমন কেরানীগঞ্জের অলি-গলি) একটিও নিয়মিত বাস নেই। ফলে যাত্রীকে অপেক্ষা করতে হয় অনির্দিষ্টকাল। অধিকাংশ বাসের বয়স ১৫-২০ বছর। দরজা খোলা, বন্ধ হয় না, আসন ছেঁড়া, ফ্লোর ময়লা, জানালায় কাঁচ নেই — বৃষ্টি এলেই যাত্রী ভিজে যায়। ব্রেক, হেডলাইট, হর্ন— অর্ধেকের বেশি কাজ করে না। রাস্তায় প্রতি ১০০ কিলোমিটারে গড়ে ৩-৪টি বাস বিকল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যা যানজট আরও বাড়ায়। বাসগুলো যেন দূষণের কারখানা। পুরোনো ডিজেল ইঞ্জিনের ধোঁয়ায় ঢাকার বায়ুদূষণের ২৫% আসে বাস থেকে। গাড়ির ভেতরেই যাত্রীরা শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন। গাড়ি চালনায় চালক-হেলপারদের "যুদ্ধংদেহী" মানসিকতায় যাত্রীরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে অপেক্ষা করেন কখন গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছাবেন। আবার যাত্রী কম থাকলে যাত্রীরা চালককে বলেও গাড়ি নাড়াতে পারেন না। যেহেতু আয় নির্ভর করে যাত্রী সংখ্যার উপর তাই চালকরা রাস্তায় "রেস" করে— যে আগে যাত্রী তুলবে, সেই বেশি আয় করবে। সিগন্যাল না মেনে উল্টোপথে বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে ফুটপাতে উঠিয়ে দাঁড় করায়। এতে প্রতিদিন গড়ে ৬টি বাস দুর্ঘটনা ঘটে, যার ৮০% যাত্রী-পথচারী হতাহত হন। ধারণক্ষমতার ৩ গুণ যাত্রী নেওয়া হয় প্রতিটি বাসে। একটা ৪০ আসনের বাসে ১০০-১২০ জন মানুষ ঠাসা থাকেন। হেল্পাররা অবমাননাকর আচরণ করে যাত্রীদের সাথে, গালিগালাজ করে যাত্রীকে ধাক্কা দেয়, ভাড়া বেশি নেয়। যাত্রীদের কোন  নিরাপত্তা নেই বাসে, ছিনতাই, ইভ-টিজিং, এমনকি ধর্ষণের ঘটনার খবর পাওয়া গিয়েছে। নাই কোনো ক্যামেরা বা হেল্পলাইন। এজন্যে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করেন অনেকে। বেশির ভাগ গাড়ির লাইসেন্স নেই, অনেক বাসের ফিটনেস সার্টিফিকেট মেয়াদোত্তীর্ণ, কিন্তু "তদবির" দিয়ে সেগুলো দেদারসে রাস্তায় চলছে। মাঝেমধ্যে ট্রাফিক পুলিশ চালককে ৫০০-১০০০ টাকা জরিমানা করলেও, তার পক্ষে দিনে ৫-৬ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব— তাই জরিমানা তার জন্যে কোন ব্যাপারই নয়।

এই অবস্থায় ঢাকার শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা আধুনিকায়নের কোন বিকল্প নেই। কারণ - রাজধানী শহর ঢাকার প্রেক্ষাপটে গণপরিবহন মানে শুধু বাস বা মেট্রো নয়— এটা একটা জীবনরেখা। যেখানে ৫০ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন কাজে যান, যেখানে একজন শ্রমিক থেকে শুরু করে গার্মেন্টস কর্মী, সরকারি কর্মচারি, ব্যাংকার— সবাই নির্ভর করেন। আর এই ব্যবস্থা যদি "হযবরল" হয়, তবে পুরো শহরের উৎপাদনশীলতা, স্বাস্থ্য ও মানসিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিরক্ত হয়ে মানুষ প্রাইভেট গাড়ি কেনার প্রতি ঝুকেছে। বর্তমান অবস্থায় বৃদ্ধ, মহিলা, স্কুল পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরা তো বাসে চড়ার কথা চিন্তাই করতে পারে না। ফলে রাস্তায় বাসের তুলনায় ছোট গাড়ির সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। যাদের প্রাইভেট গাড়ি কেনার সামর্থ নেই তারা থ্রি হুইলার/অটো ব্যবহার করছেন। ফলে দেখা যায় রাস্তায় থ্রি হুইলার আর অটোর প্রাধান্য। বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, ঢাকা শহরের যানজটের জন্যে বাসের বিশৃঙ্খল চলাচল, ট্রাফিক আইন না মানা ও ছোট গাড়ির ক্রমবর্ধমান সংখ্যাই মূলত দায়ী। এমতাবস্থায় একটি কার্যকর জনবান্ধব গণপরিবহান ব্যবস্থাই পারে মানুষের মধ্যে স্বস্থি আনতে এবং মানুষের অপরিমেয় কর্মঘন্টা বাঁচিয়ে প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে। তাই যে কোন মূল্যে রাজধানী শহর ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার কোন বিকল্প নেই।

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের তালিকায় নাম লেখাবে– আশা করি। কিন্তু উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থা কি এমনই সেকেলে থাকবে? নাকি এর উন্নতি হবে?

মনে রাখা দরকার, উন্নয়নশীল দেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে বিদেশীদের কাছে উপস্থাপনের জন্যে বিদ্যমান এই ‘প্যারাডাইম’ আমাদের ভাংতেই হবে। গ্ণপরিবহন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ‘প্যারাডাইম শিফট’– এর কোন বিকল্প নেই।

আমাদের মনে আছে – পাকিস্তান আমলে আমরা ঢাকা শহরে সেকেলে ধরণের বাসে (মুড়ির টিন) চড়েছি। বাংলাদেশ হওয়ার পর ভারতের টাটা কোম্পানীর লাল রং এর বি আর টি সি বাস দেখে আমরা বিমোহিত হয়েছি। বি আর টি সি’র দোতলা/এক তলা বাস এখনও ঢাকা শহরে চলে। এ গুলোর গঠন যাত্রী বান্ধব। উঠতে নামতে যেকোন বয়সের যাত্রীদের কোন অসুবিধা হয় না। কিন্তু বাসের সংখ্যা কম বলে বি আর টি সি কে প্রাইভেট কোম্পানীর বাস শহরে নামতে দিতে হয়েছে। এই সুযোগে মালিকরা যাত্রীদের জিম্মি করে যেনতেন/পরিত্যক্ত বাস নামিয়ে প্রতিযোগিতা করে শহরে সন্ত্রাসের সৃস্টি করে বাস চালায়। বাস মালিকদের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণেই এমনটি হয়ে থাকে। বাস মালিকদের সাথে সরকারের চুক্তি এমন যদি হয় যে, কোম্পানীকে যাত্রীবান্ধব (বি আর টিসি/ভলভো বা অনুরূপ) নতুন বাস নামাতে হবে। এক কোম্পানীর বাস এক রূটে চলবে। টিকেট বিক্রয় ব্যবস্থা হবে স্বয়ংক্রিয়। বাসে কোনরূপ ভাড়া আদায় হবে না। এক কোম্পানীর বাস স্টপেজে এসে নির্দিষ্ট জায়জায় থামবে – যাত্রী নামিয়ে অতঃপর যাত্রী উঠাবে। বাসগুলো হবে দুই দরজাবিশিষ্ট। সামনের দরজা দিয়ে যাত্রী উঠবে এবং পেছন দরজা দিয়ে যাত্রী নামবে। উঠার সময় যাত্রীর কার্ড চার্জ হবে। কিছুকাল আগে বি আর টি সি’র এসি বাসে এ ধরণের ব্যবস্থা ঢাকা শহরে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। কিন্তু অজানা কারণে সেই ব্যবস্থা রহিত হয়ে গেল!

আমাদের মনে পড়ে – ঢাকার প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক বাস মালিকদের সাথে আলাপ আলোচনা করে ঢাকা শহরকে ছয়টি রুটে ভাগ করে ছয় রং এর নতুন বাস চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। উদ্যোগটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। কিন্তু আনিসুল হক -এর অকাল মৃত্যুতে তার পরিকল্পনারও অকাল মৃত্যু ঘটে। ঢাকাবাসীর ভাগ্য একই থেকে যায়।

বিএনপি সরকার ক্ষতায় আসার পর ঢাকা শহরে আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর কথা যোগাযোগ মন্ত্রী ইতোমধ্যে একাধিকবার বলেছেন। ঢাকাবাসী আশা করে, অচিরেই রাজধানী শহর ঢাকায় আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু হবে।  

ঢাকা শহরে আধুনিক ‘গণপরিবহন ব্যবস্থা’ চালুর জন্যে সরকার কী করতে পারে?

 পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ব্যাবস্থার অধীনে গণপরিবহন ব্যাবস্থা চালু: বর্তমানে ঢাকা শহরে বি আর টি সি’র দেঢ় সহস্রাধিক বাস রয়েছে। তবে এর মধ্যে ৫৭৯টি (৩৮%) বাস অচল বলে জানা যায়। এ ছাড়া প্রায় ২০০ টি প্রাইভেট কোম্পানী প্রায় পাঁচ হাজার বাস চালায়। অতএব দেখা যাচ্ছে ঢাকা শহরে প্রাইভেট কোম্পানীর বাসের প্রাধান্য দৃশ্যমান। শুধু ঢাকা শহরেই নয় আন্তঃজেলা বাস চলাচলেও প্রাইভেট কোম্পানীর প্রাধান্য বিরাজমান। এমতাবস্থায় প্রাইভেট কোম্পানী বাদ দিয়ে শুধুমাত্র সরকার ঢাকা শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে চালাতে পারবে বলে প্রতীয়মান হয় না। সেজন্যে কোম্পানীর মালিকদের সাথে আলাপ আলোচনা করে একটি হোল্ডিং কোম্পানীর অধীনে গ্ণপরিবহন ব্যবস্থাকে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এখানে ‘সরকার বনাম বাস মালিক’ সম্পর্ক একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। এ বিষয়ে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক অনেকটা সফল হয়েছিলেন বলে জানা যায়। বর্তমান সরকারের নিগোশিয়েশন স্কিল (দর কাষাকষির ক্ষমতা) –এর উপর বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করে বলে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা। বাস মালিকদের বোঝাতে হবে হোল্ডিং কোম্পানী হলে তাদের লভ্যাংশ কমবে না, বরং বাড়তে পারে। কারণ আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা চালু হলে বাস ভাড়া কিছুটা হলেও বাড়বে। তাছাড়া সরকার এতে সাবসিডি দেবে। এতে মালিকদের ঝুকি অনেকাংশে কমবে। তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ অনুযায়ী তারা লভ্যাংশ পাবেন। সরকারী ব্যবস্থাপনায় বাস মালিকগণ তাদের বিনিয়োগের পরিমাণের আনুপাতিক ব্যাংকঋণ পাবেন। একটি হোল্ডিং কোম্পানীর অধীনে পুরো ঢাকা শহর ৬-৮ টি রুটে বিভক্ত হতে পারে। এক এক রুটে এক এক রং এর বাস চলবে। বাস গুলো অবশ্যই নতুন এসি/নন-এসি হবে।

সেবার মান: বাসগুলোতে জিপিএস ট্র্যাকিং সুবিধা থাকবে। যাত্রীরা অ্যাপে দেখতে পাবেন বাস কোথায় আছে? নির্ধারিত সময়সূচী অনুযায়ী প্রতি ১০-১৫ মিনিট পর পর বাস আসা যাওয়া করবে। বাসে নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরা থাকবে। ইউনিফর্ম পরিহিত চালক-হেলপার থাকবেন। তাদের আচার আচরণ হবে মার্জিত ও বিনয়ী। কেউ দুর্বিনীত আচরণ করলে যাত্রীরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কম্প্লেইন করতে পারবেন, যা সরাসরি হোল্ডিং কোম্পানীর দায়িত্বশীল অফিসারের গোচরীভূত হবে।

ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও টিকিটিং: ভাড়া নির্ধারণ করবে হোল্ডিং কোম্পানী। ই-টিকিট বা কার্ড চালু করা হবে যাতে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার সুযোগ না থাকে।

এতক্ষণ আমরা রাজধানী শহর ঢাকার আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে বাস চলাচল ও সেগুলোর ব্যবস্থাপনার উপর আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা বলতে শুধুমাত্র বাস সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনাই বোঝায় না। মেট্রোরেল, মনোরেল, ইত্যাদি সকল কিছু মিলিয়েই আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠে।

 এ কথা সত্য যে, বিশ্বের অন্যান্য দ্রুত নগরায়নশীল রাজধানীগুলোর মতো ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাও এক গুরুত্বপূর্ণ সংকটময় মুহূর্ত অতিক্রম করছে। ২০২৩ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, বৃহত্তর ঢাকা এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩.৮৭ কোটি যাত্রাপথ তৈরি হয়, যেখানে পাবলিক ট্রানজিটের (বাস, লেগুনা, টেম্পো) ভাগ মাত্র ৯.৩%, যা ২০০৯ সালে ছিল ২৮.৫%। এই উদ্বেগজনক অবস্থা প্রমাণ করে যে বর্তমান ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে এবং যাত্রীরা ব্যক্তিগত বা ছোট যানবাহনে ঝুঁকছে, যা যানজটকে আরও ঘনীভূত করছে। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের রাজধানীগুলোর সাথে তুলনামূলকভাবে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, তার একটি ধারাবাহিক বিবরণ নিচে প্রদান করা হলো।

ভারতের দিল্লি বা কেনিয়ার নাইরোবির মতো শহরগুলো বাস ব্যবস্থাকে একটি সুশৃঙ্খল করিডোরভিত্তিক নেটওয়ার্কে রূপান্তরের উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। ঢাকার শহরের জন্য বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ মডেল -এর মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ (হোল্ডিং কোম্পানী) রুট নির্ধারণ, সেবার মান ও ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যা পূর্বেই বলা হয়েছে। এটি অপারেটরদের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমিয়ে সেবার মান নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি, পরিচ্ছন্ন ও বৈদ্যুতিক বাস চালু করার যে উদ্যোগের কথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে ঘোষনা করেছেন তা ঢাকার ভয়াবহ বায়ুদূষণ (PM2.5 মাত্রা ৮৫ µg/m³) কমাতে সাহায্য করবে।

 ৪। মেট্রোরেল ও বিআরটি: স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা: ঢাকার মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৬) চালু হয়েছে, এবং আরও পাঁচটি লাইনের পরিকল্পনা চলছে। তবে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো - বাস রেপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাস্তবায়নের অবিমৃষ্যকারী সিদ্ধান্ত। ২০১২ সালে ২,০৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের ব্যয় এখন ৬,৫৯৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা একে ‘আত্মঘাতী’ ব্যয় বলে অভিহিত করেছেন, যেখানে মেট্রোরেলের মতো ব্যয়েও বিআরটির সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। মেট্রোরেল লাইন-৫ -এর দক্ষিণ রুটের জন্য এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ২.৬ বিলিয়ন ডলারের তহবিল দিতে যাচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। তবে ভূগর্ভস্থ নির্মাণের উচ্চ ব্যয় উদ্বেগের কারণ বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন।

 বিশেষজ্ঞরা পুরান ঢাকার সংকীর্ণ রাস্তার জন্য মনোরেলের কথা বিবেচনা করার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিআরটি প্রকল্পের করিডোর নির্বাচন (গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত) ভুল ছিল, কারণ যাত্রীরা কেন্দ্রীয় ঢাকায় যেতে চায়, বিমানবন্দরে নয়। তাই অন্যান্য শহরের মতো ঢাকারও পরিবহন পরিকল্পনা যাত্রীদের প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।

 ৫। নগর পরিকল্পনা ও আন্তঃসংযোগ: স্বতন্ত্র প্রকল্প থেকে সমন্বিত ব্যবস্থায়: বর্তমান সমস্যা: ঢাকায় পরিবহন পরিকল্পনা বিচ্ছিন্ন প্রকল্পভিত্তিক। বিআরটি, মেট্রোরেল ও বাস কর্তৃপক্ষ আলাদাভাবে কাজ করে, যার ফলে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। বিআরটি ডেডিকেটেড লেন বাস্তবায়নে আইএমইডি সতর্ক করেছে যে এটি পার্শ্ববর্তী লেনে যানজট বাড়াতে পারে। ২০০৫ সালের স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) বাস্তবায়িত না হওয়ায় মানুষকে ব্যয়বহুল মেট্রোরেল ব্যবহার করতে হচ্ছে।

ট্রানজিট-ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি)-এর মাধ্যমে দিল্লি ও নাইরোবির মতো শহর তাদের মেট্রো স্টেশনগুলোর আশেপাশে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসন ও কর্মক্ষেত্র তৈরি করছে, যা যানজট কমাচ্ছে। ঢাকাকেও মেট্রো, বিআরটি ও বাস পরিষেবাগুলোর মধ্যে একটি সমন্বিত টিকিটিং ও সময়সূচী ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে যাত্রীরা নির্বিঘ্নে একটি মোড থেকে অন্যটিতে পরিবর্তন করতে পারে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রকল্প প্রতিবেদনেও আন্তঃসংযোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

অন্যান্য উন্নয়নশীল রাজধানীর তুলনায় ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে টেকসই, সাশ্রয়ী ও যাত্রীবান্ধব করতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে সরকার একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করে তাদের পরামর্শ মোতাবেক রাজধানী শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।

ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন’ থেকে ‘সিস্টেম চিন্তা’-তে রূপান্তরের মাধ্যমে। একটি সমন্বিত, পরিকল্পিত ও যাত্রী-কেন্দ্রিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হতে পারে টেকসই ঢাকার চাবিকাঠি, যা বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল রাজধানীগুলোর সঙ্গে ঢাকাকে সমতুল্য করতে পারে।

লেখক: উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি)

ট্যাগ: মতামত
শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যা…
  • ৩০ জুন ২০২৬
বছরে গড়ে ৪০ দিন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন বিশ্বের ৬৮ শতাং…
  • ৩০ জুন ২০২৬
বিএনপি নেতাকে অতিথি না করায় স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের বি…
  • ৩০ জুন ২০২৬
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস নিয়োগ দেবে এক্সিকিউটিভ, আবেদন ৯ জুলা…
  • ৩০ জুন ২০২৬
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের…
  • ৩০ জুন ২০২৬
প্রধান শিক্ষকের কক্ষে সাবেক স্ত্রীর অনশন, বিক্ষোভের মুখে পদ…
  • ৩০ জুন ২০২৬