সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসারের কার্যালয় © সংগৃহীত
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে তিস্তার চরাঞ্চলে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছেন হাজারো মানুষ। তবে অসুস্থ পশুর চিকিৎসা ও সময়মতো ভ্যাকসিন না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন এসব খামারি। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ১১টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র পাঁচজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার সেবা কার্যক্রম চালানোয় চরাঞ্চলের খামারিদের প্রয়োজনীয় সেবা পেতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত উপজেলার এই দপ্তরে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১১টি পদে ৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। একে একে অবসর, বদলি ও পদোন্নতিতে খালি হয়ে যায় ৬টি পদ। বর্তমানে রয়েছেন মাত্র ৫জন—একজন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, একজন ভেটেরিনারি সার্জন, একজন সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, একজন ড্রেসার এবং একজন অফিস সহকারী। এর মধ্যে দুইজন যোগদান করেছেন মাত্র কয়েক মাস আগে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এই দপ্তরটি কার্যত নেতৃত্বশূন্য।
এদিকে বন্ধ হয়ে গেছে বামনডাঙ্গা ও ধর্মপুর উপকেন্দ্র। ২০২০ সাল থেকে বামনডাঙ্গা এবং ২০২১ সাল থেকে ধর্মপুর উপকেন্দ্রে কোনো কর্মী না থাকায় সেবা বন্ধ। অথচ বামনডাঙ্গা উপকেন্দ্রটি একসময় পাঁচটি ইউনিয়নের খামারিদের সেবা দিত। উপকেন্দ্র দুটি বন্ধ হওয়ার পর এসব ইউনিয়নের খামারিরা ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। অসুস্থ গবাদি পশু নিয়ে এতটা পথ অতিক্রম করা যে কতটা কষ্টের, তা বলাই বাহুল্য।
খামারি মামুন মিয়া জানান, ফিড, ওষুধ ও শ্রমিকের দাম বেড়ে যাওয়ায় খামার চালানো এমনিতেই কঠিন। এরমধ্যে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি হলেও ফোন দিলে বা ডেকেও প্রাণিসম্পদ অফিসের লোক পাওয়া যায় না। ১০ বছর ধরে গরু পালন করা বিদ্যুৎ চন্দ্র সরকার বলেন, নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব হলেও প্রাণিসম্পদ অফিসে গিয়ে ডাক্তার পাওয়া যায় না। সঠিক সময়ে ভ্যাকসিন না পাওয়ায় ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।
তিস্তার চরাঞ্চলের হরিপুর ডাঙ্গার চরের খামারি জরিফ মিয়ার অভিযোগ, চরে কোনো পশু অসুস্থ হলে ডাক্তারদের হাজার ডেকেও পাওয়া যায় না। তারা লোকবলের অজুহাত দেখিয়ে উপজেলা সদরের হাসপাতালে পশু নিয়ে আসতে বলেন, যা চরাঞ্চলের প্রেক্ষাপটে একেবারেই অসম্ভব। চরের এই সংকট নিরসনে কোনো বিকল্প পরিকল্পনা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানা যায়নি।
বেলকা বাজারের পল্লিচিকিৎসক রাজেন্দ্র কুমার সরকার বলেন, বৈজ্ঞানিক ও খামারভিত্তিক পশু চিকিৎসায় প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের বিকল্প নেই। অথচ খামারের তুলনায় সরকারি চিকিৎসকের সংখ্যা নগণ্য।
সীচা বাজারের পল্লি চিকিৎসক মো. আতাউর রহমান জানান, প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় গ্রামগঞ্জে হাতুরে চিকিৎসকের কাছে খামারি ও পশু পালনকারীদের চিকিৎসা সেবা নিতে হচ্ছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মোজাম্মেল হক বলেন, মাত্র পাঁচজন লোক নিয়ে এত বড় উপজেলার সেবা দেওয়া অসম্ভব। জরুরি প্রয়োজনে মাঠে গেলে বা অফিসিয়াল কাজে বাইরে থাকলে হাসপাতালে আসা রোগীদের অপেক্ষা করতে হয়।
সদ্য যোগদান করা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কে এম ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, সুন্দরগঞ্জ একটি বৃহৎ উপজেলা। এখানে প্রাণিসম্পদের হার অনেক বেশি। সে তুলনায় জনবল অত্যন্ত নগণ্য। শতভাগ সেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত জনবল বাড়ানো একান্ত প্রয়োজন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার প্রাণিসম্পদ খাত একসময় জেলার মধ্যে অন্যতম সমৃদ্ধ ছিল। ২০১০ সালের দিকে এই উপজেলায় গবাদি পশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার এবং হাঁস-মুরগির সংখ্যা ছিল ৫ লাখের বেশি। কিন্তু জনবল সংকট ও সেবার অভাবে এই খাতটি ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরগঞ্জে বর্তমানে মোট গবাদি পশুর সংখ্যা ৪ লাখ ২৮ হাজার ৩২৪টি। এর মধ্যে গরু ২ লাখ ৫৪ হাজার ৪২৪টি, ছাগল ১ লাখ ৬৬ হাজার ১৯৫টি, ভেড়া ৭ হাজার ৩৮০টি এবং মহিষ ২৫টি। হাঁস-মুরগির মোট সংখ্যা ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৬৬৬টি। এর মধ্যে হাঁস ১ লাখ ৬৪ হাজার ১টি, দেশি মুরগি ১ লাখ ৬০ হাজার ২০২টি, লেয়ার মুরগি ১ লাখ ৫১ হাজার ৪৮৭টি, ব্রয়লার মুরগি ১ লাখ ৫২ হাজার ৩০৮টি, সোনালি মুরগি ৮০ হাজার ৩০৫টি, কবুতর ৩২ হাজার ৩০২টি এবং কোয়েল ১৮ হাজার ৬১টি। এর মধ্যে তিস্তার চরাঞ্চলে রয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার গবাদি পশু ও ১ লাখ ২০ হাজার হাঁস-মুরগি। অথচ এই বিশাল প্রাণিসম্পদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন মাত্র পাঁচজন।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি উপজেলায় প্রতি ৫০ হাজার গবাদি পশুর জন্য অন্তত একজন ভেটেরিনারি সার্জন ও দুইজন প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন। সুন্দরগঞ্জে সেই হিসাবে প্রয়োজন অন্তত চারজন ভেটেরিনারি সার্জন ও আটজন সম্প্রসারণ কর্মকর্তা। কিন্তু বাস্তবে রয়েছেন একজন করে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে সমতল ভূমিতে বসবাসরত অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প, প্রাণীপুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প এবং পিপিআর রোগ নির্মূল ও ক্ষুরারোগ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প। অথচ এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় জনবল নেই।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. জোবাইদুল কবীর জানান, সুন্দরগঞ্জসহ জেলার সব উপজেলাতেই কমবেশি জনবল সংকট রয়েছে। তবে সুন্দরগঞ্জে সংকট সবচেয়ে তীব্র। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাণিসম্পদ খাতে সঠিক সময়ে সেবা না পেলে খামারিদের গড় আয় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে যায়। অন্যদিকে পশুর মৃত্যুহার বেড়ে যায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। সুন্দরগঞ্জে এই ক্ষতি ইতোমধ্যে দৃশ্যমান।
গত এক বছরে সুন্দরগঞ্জে গবাদি পশুর মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। এর মধ্যে বাছুরের মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। খামারিরা বলছেন, সময়মতো টিকা না পাওয়া ও চিকিৎসকের অভাবে এই মৃত্যুহার বেড়েছে।
স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত এক বছরে সুন্দরগঞ্জে গরুর দুধের উৎপাদন কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ এবং ডিমের উৎপাদন কমেছে ১৫ শতাংশ। এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। অনেক খামারি খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরগঞ্জে জনপ্রতি দৈনিক দুধের উৎপাদন ২৮৮ মিলিলিটার, চাহিদা ২৫০ মিলিলিটার, উদ্বৃত্ত ৩৮ মিলিলিটার। দৈনিক ডিমের উৎপাদন ১৯৭টি, চাহিদা ১০৪টি, উদ্বৃত্ত ৯৩টি। দৈনিক মাংসের উৎপাদন ২৮৮ গ্রাম, চাহিদা ১২০ গ্রাম, উদ্বৃত্ত ৬৮ গ্রাম। তবে খামারিরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। জনবল সংকট ও সেবার অভাবে প্রকৃত উৎপাদন ক্রমেই কমছে।
সুন্দরগঞ্জের খামারিরা দীর্ঘদিন ধরে এই সংকটের কথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরেছেন। কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপে তারা অভিযোগ করেছেন, প্রশাসন তাদের কথা শুনছে না। কেউ কেউ ইতোমধ্যে খামার বিক্রি করে দিয়েছেন। কেউ আবার অন্য পেশায় চলে গেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রাণিসম্পদ খাত দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সুন্দরগঞ্জে এই খাতের অবকাঠামো ও জনবল সংকট দীর্ঘদিনের। প্রশাসনিক উদাসীনতায় সংকট আরও গভীর হচ্ছে। খামারিরা দ্রুত নতুন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, বন্ধ সাবস্টেশন চালু এবং চরাঞ্চলে ভ্রাম্যমাণ ভেটেরিনারি টিম গঠনের দাবি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এই সংকটের সমাধান হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তবে শুধু জনবল বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করছেন স্থানীয় খামারিরা। তাদের মতে, প্রাণিসম্পদ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, খামারিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন করা জরুরি। অন্যথায় সুন্দরগঞ্জের মতো সম্ভাবনাময় উপজেলাগুলোয় প্রাণিসম্পদ খাত ক্রমেই পিছিয়ে পড়বে।