চবি শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলামের বাবা মনসুর আলীর আহাজারি © টিডিসি
‘আরে ওন আব্বা বলি কে ডাইকবো, বহুত কষ্ট করি আর পোলাডারে পড়ালেকা করাইছি। আর বড়ো পুতের পড়ালেখা বন্ধ করি, আরিফেরে পড়ালেখা করাইছি। আই মনে কইচ্ছিলাম আর লাশ আর পোলা কান্দে নিবো, ওন আই আর পোলার লাশ কেমনে কান্দে নিমু।’
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলামের নিজ বাড়ি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় বাবা মনসুর আলীর বাড়ির দৃশ্য এটি। ষাটোর্ধ্ব বাবা মনসুর আলী হাউমাউ করে কাঁদছেন। আর বুক চাপড়ে বিলাপ করে বলছেন কথাগুলো।
একই সঙ্গে আরিফুলের লাশ দেখে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছেন তার মা। তিনি বলছেন, ‘আর পোলারে ছাড়া আই এহন ক্যামনে থাকমু।’
আরিফুলের বাবা মনসুর আলী আরও বলেন, ‘গত ১০-১২ দিন ধরি আর মনে ক্যান জানি ভাল্লাগে না, কেন জানি আর মনে হইতো কোনো একটা বিপদ আইয়ে। কিন্তু আইজ্জ্যা এত বড়ো বিপদ আইবো কে জাইনত।’
মঙ্গলবার রাত ১০টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শহীদ আবদুর রব হলের ফটকে একটি ব্যানার টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মৃত্যু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলামের।
এরপর রাত ২টায় তাকে ক্যাম্পাসে নেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সহপাঠীরা শেষ বিদায় জানায়। এরপর লাশ নিয়ে রওনা দেওয়া হয় আরিফুলের নিজ বাড়ি খাগড়াছড়িতে। বেলা ২টায় জানাজার নামাজের মাধ্যমে কবরস্থানে শায়িত করা হবে আরিফুলকে।
জানাজায় অংশ নিতে ক্যাম্পাস থেকে আরিফুলের বাড়িতে এসেছেন তার চবির শহিদ আবদুর রব হলের প্রভোস্ট প্রফেসর ড. আরেফিন সিদ্দিকী এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ মুমিন। চোখে অশ্রু নিয়ে ড. আরেফিন সিদ্দিকী আরিফুলের বাবাকে জরিয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বারবার হুশ হারিয়ে ফেলার অবস্থা আরিফুলের বাবার। একই সঙ্গে বিভিন্ন কথা বলে ধৈর্য ধরার সান্ত্বনা দিচ্ছেন চবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ মুবীন।
আরও পড়ুন: ৯ ক্যাটাগরিতে প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন ৩ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষক-ইনস্ট্রাক্টর ও প্রতিষ্ঠান প্রধান
বাল্যকালের সহপাঠী মোহাম্মদ আরমান জানান, আরিফুলের বাড়ি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙা উপজেলার ৮ নম্বর আমতলী ইউনিয়নের দেওয়ান বাজার এলাকায়। জীবিকার তাগিদে আরিফুলের বাবা মোহাম্মদ মনসুর আলি পাশের দেওয়ান বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন। তার মা গৃহিণী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে আরিফুল সর্বকনিষ্ঠ।
আরিফুলের মামা আমির হোসেন বলেন, বসতভিটা ছাড়া তাদের আর থাকার জায়গা নেই। তবে তাদের পরিবার উচ্চ শিক্ষিত। বর্তমানে তার মা অসুস্থ পিত্তথলিতে পাথর হয়েছিল। তার অপারেশন করানোর জন্য চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল আজকে। কিন্তু আজ আরিফুল বাড়ি ফিরল লাশ হয়ে।
দীর্ঘদিন ধরে দুবাইপ্রবাসী ছিলেন আরিফুলের আরেক মামা নূর ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের আরিফের অনেক ইচ্ছে ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ওরকম পজিশনে যাব এবং এক দিন সাংবাদিক এনে তার বাবার সবজি চাষের বিষয়গুলো গণমাধ্যমে তুলে ধরবেন।’