গোড়পাড়া ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ হাসপাতাল © টিডিসি
সরকারি অর্থে নির্মিত একটি হাসপাতাল যেখানে চিকিৎসা পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন সীমান্ত অঞ্চলের লাখো মানুষ। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজও অধরাই। যশোরের শার্শা উপজেলার গোড়পাড়া বাজারে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ হাসপাতালটি নির্মাণ শেষ হওয়ার ১১ বছর পার হলেও আজও চালু হয়নি। ফলে নিজামপুর, ডিহি, লক্ষণপুরসহ আশপাশের চারটি ইউনিয়নের লাখ লাখ মানুষ এখনো মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
জানা গেছে, ২০১৩ সালে সীমান্তবর্তী নিজামপুর ইউনিয়নের গোড়পাড়া বাজারে হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৫ সালে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ শেষ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাসপাতালটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। স্থানীয়দের আশা ছিল, অল্প সময়ের মধ্যেই হাসপাতালটিতে চিকিৎসাসেবা চালু হবে। কিন্তু এক যুগের কাছাকাছি সময় পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালটি এখনো তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের প্রতিটি কক্ষ ফাঁকা। নেই কোনো চিকিৎসক, নার্স কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামও সরবরাহ করা হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি বছরের পর বছর অচল পড়ে থেকে ধীরে ধীরে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় হাসপাতাল ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। দেয়ালের রং উঠে যাচ্ছে, দরজা-জানালা নষ্ট হয়ে পড়েছে। নির্মাণকালে আনা রোগীর বেড, চেয়ার-টেবিল ও অন্যান্য আসবাবও অযত্নে পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার পথে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ভবনের ভেতরে প্রায়ই মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। এতে সরকারি সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ফজলে ওয়াহিদ বলেন, ‘হাসপাতালটি নির্মাণের সময় আমরা ভেবেছিলাম এলাকার মানুষ সহজেই চিকিৎসাসেবা পাবে। কিন্তু ১১ বছরেও হাসপাতালটি চালু হয়নি। অসুস্থ রোগীদের নিয়ে এখনো দূরের হাসপাতালে যেতে হয়। আমরা দ্রুত হাসপাতালটি চালুর জোর দাবি জানাই।’
জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে এখনো তাদের নাভারণ বা যশোর শহরের হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হয়। অনেক সময় রোগীকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে সংকট আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, নবজাতক, শিশু ও বয়স্ক রোগীদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে।
শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফজলে ওয়াহিদ বলেন, হাসপাতালটি চালু হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করা হবে। স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসন আন্তরিক রয়েছে।
মা, শিশু স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, হাসপাতাল ভবন নির্মাণ হলেও প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং প্রশাসনিক অনুমোদন না থাকায় কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় রয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও জনবল পেলেই হাসপাতালটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
যশোর-১ (শার্শা) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, ‘গোড়পাড়া মা ও শিশু কল্যাণ হাসপাতালটি দীর্ঘদিন অচল থাকা দুঃখজনক। সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতালটি দ্রুত চালু হওয়া প্রয়োজন। আমি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করব।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সমন্বয়হীনতা এবং প্রয়োজনীয় জনবল সংকটের কারণেই হাসপাতালটি দীর্ঘদিন চালু করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং হাসপাতালের কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে সীমান্ত অঞ্চলের চারটি ইউনিয়নের লাখ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তাদের মতে, আর কোনো অবহেলা নয় জনগণের করের টাকায় নির্মিত এই হাসপাতালকে দ্রুত মানুষের সেবায় উন্মুক্ত করাই এখন সময়ের দাবি।