দোকান ভাঙচুর-লুটপাট © টিডিসি ফটো
পাবনার সাঁথিয়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে বিএনপি সমর্থকদের বাড়িঘর, দোকানপাটে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (২২ মে) রাতে উপজেলার নাগডেমড়া ইউনিয়নের পাথাইলহাট এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের অভিযোগের তির পাবনা-১ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেনের সমর্থক জামায়াত নেতাকর্মীদের দিকে হলেও, অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই পাথাইলহাট এলাকায় জামায়াত ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে চরম বিরোধ চলে আসছে। এর আগে চলতি বছরের মার্চ মাসে বিএনপি সমর্থকদের দোকানপাট ভাঙচুর এবং ভুক্তভোগীদের জমি থেকে জোরপূর্বক পেঁয়াজ লুটে নেয়ার অভিযোগে জামায়াত সমর্থকদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের হয়েছিল। ওই মামলায় আটক আসামিরা সম্প্রতি জামিনে মুক্ত হয়ে মামলা তুলে নেয়ার জন্য ভুক্তভোগী রাসেল ও তার পরিবারকে ক্রমাগত চাপ এবং হুমকি দিয়ে আসছিল।
শুক্রবার দুপুরে স্থানীয় ছোট পাথাইলহাট ঈদগাহ মাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং প্যান্ডেল সাজানো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে দ্বন্দ্ব বাধে। জামায়াত সমর্থকরা এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করতে মরিয়া হয়ে ওঠে এবং তাদের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কাউকে ঈদের নামাজ আদায় করতে না দেয়ার হুমকি দেয়।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বিরোধ চরমে পৌঁছালে স্থানীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন মোকছেদ প্রামাণিককে জিম্মি করে বা জোরপূর্বক মাইক ছিনিয়ে নেয়া হয়। মুয়াজ্জিন জানান, নজরুল নামের একজন আমার সামনেই মাইকে ঘোষণা দেয় সবাই লাঠি-ফালা নিয়ে বাইর হ’। এরপর একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বের হয়েই ভাঙচুর করে।
এ বিষয়ে পাথইলহাট গ্রামের নাসিমা বেগম বলেন, আমার ভাসুর ও ছেলেরা বলেছিল, মরলেও এক জায়গাতেই কবর হবে, তাহলে নামাজ আলাদা হবে কেন? সবাই মিলেমিশে পড়ব। এই নিয়ে কথা-কাটাকাটির পর সবাই বাড়ি চলে যায়। কিন্তু পরে তারা মাইকিং করে এই তাণ্ডব চালায়।
গ্রামের বাসিন্দা আসাদুর রহমানের ভাষ্য, উত্তেজিত জামায়াত সমর্থকরা দলবল নিয়ে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রফিক ও শফিক নামের দুই ভাইয়ের বাড়িঘর এবং রাসেল নামের এক ব্যবসায়ীর দোকানে হামলা চালায় ভাঙচুর করে লুটপাট চালায়।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী রাসেল হোসেন বলেন, আমার খৈল, ভুষি, সার ও কীটনাশকের দোকান রয়েছে, পাশাপাশি বিকাশের ব্যবসাও আছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় জামায়াত সমর্থক হযরত মাস্টারের নেতৃত্বে একদল লোক দোকানে ভাঙচুর চালায়। এরপর তারা আমার বাড়িতে গিয়ে আমার স্ত্রী ও বাচ্চাকেও মারধর করে। দোকান থেকে বিকাশের নগদ ২ লাখ টাকা, ৬ ক্যান দুধ ও অন্যান্য মূল্যবান কীটনাশক লুট করে নিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে আমার প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
নাগডেমরা ইউনিয়ন যুবদলের ২ নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, এর আগেও জামায়াত নেতা হযরত মাস্টার, নজরুল, কালু ও ইউনুসদের নেতৃত্বে তার ১১ বিঘা জমি জোরপূর্বক দখল করে পেঁয়াজ লুটে নেয়া হয়েছিল। ধানের শীষে ভোট দেয়ায় তারা ক্ষুব্ধ হয়ে এমপি নাজিবুর রহমান মোমেনের নির্দেশে এসব অপকর্ম করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে, সহিংসতার ঘটনায় শুক্রবার রাতেই ভুক্তভোগী রাসেল বাদী হয়ে ২০ জনের নাম উল্লেখ করে সাঁথিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামি হযরত আলী মাস্টার, শাকিল, রবিউল ইসলাম কালু ও মেহেদী হাসান জুয়েলসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে।
এদিকে, ঘটনার বিচার ও অভিযুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে শনিবার (২৩ মে) দুপুরে লুণ্ঠিত দোকানপাটের সামনে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় জনতা একটি মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।
হামলা ভাঙচুর লুটপাটের সঙ্গে তার নিজের লোকদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, ঝামেলার বিষয়টি আমি প্রথম আপনাদের (সাংবাদিকদের) কাছ থেকে শুনলাম। এ ধরনের অপরাধমূলক ঘটনাকে দলীয় রঙ দেয়া ঠিক নয়। অপরাধী যে দলেরই হোক, তার বিচার হওয়া উচিত। আমরা কোনও দলীয় প্রভাব খাটাই না এবং অভিযুক্তরা আমাদের দলের কেউ না।
ঘটনার বিষয়ে সাঁথিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে আটক করা হয়েছে এবং পরে এই বিষয়ে একটি নিয়মিত মামলা রুজু হয়েছে। মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান ওসি।