মতলব উত্তরের অবৈধ ইটভাটা © টিডিসি
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় কৃষিজমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ ইটভাটার দৌরাত্ম্যে বাড়ছে পরিবেশ ঝুঁকি ও জনভোগান্তি। সরকারি বিধিনিষেধ ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে পরিচালিত এসব ইটভাটার কারণে ফসলি জমির ক্ষয়, বায়ুদূষণ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
২০২২ সালে অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদের দাবিতে উচ্চ আদালতে দায়ের করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট সারা দেশে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ ও উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। ২০২৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট এ রায় দেন। রায়ে বলা হয়, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ইটভাটা পরিচালনা করা যাবে না, কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ এবং শিশু শ্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে ওই নির্দেশনার বাস্তবায়নে চাঁদপুরের মতলব উত্তরের চিত্র ভিন্ন। ইটভাটাগুলোর পরিবেশগত ছাড়পত্র যেমন নেই, তেমনি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিও গ্রহণ করেনি। এসব ভাটার কার্যক্রমে কৃষিজমির মাটি (টপ সয়েল), কাঠ পোড়ানো এবং ধুলো-বালুতে বায়ুদূষণ আরও তীব্র হয়েছে।
এদিকে অবৈধ ভাটায় আশপাশের এলাকা, নদী, গ্রামীণ জনপদের জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইটভাটার সৃষ্ট দূষণে কৃষিজমি ও কৃষি উৎপাদন ক্ষতির মুখে পড়ছে এবং বয়স্ক ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইটভাটাগুলোয় অবাধে পোড়ানো হচ্ছে জ্বালানি কাঠ। এতে উজাড় হচ্ছে গাছপালা। অধিকাংশ ইটভাটায় পরিবেশগত ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স ছাড়াই চলছে ইট পোড়ানোর কার্যক্রম।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তথ্যনুযায়ী, মতলব উত্তর উপজেলাধীন কার্যক্রম চলমান আছে এমন ইটভাটাগুলোর ১২টির মধ্যে ১০টিই অবৈধ। ইটভাটাগুলো হলো মেসার্স হালিমা ব্রিকস, মেসার্স মতিন মনোয়ারা ব্রিকস, মেসার্স ফাইভ স্টার ব্রিকস, মেসার্স ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড, মেসার্স টরকী ব্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং, মেসার্স এস বি এম ব্রিকস, মেসার্স নাবিলা ব্রিকস ম্যানুফেকচারিং, মেসার্স ইসলাম ব্রিকস, মেসার্স সরকার ব্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং ও মেসার্স নাজির আহাম্মদ চৌধুরী ব্রিকস।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে রাত-দিন চলছে ইট তৈরি ও পোড়ানোর কাজ। অধিকাংশ ভাটাই গড়ে উঠেছে কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে। এতে বায়ুদূষণের পাশাপাশি ফসলি জমি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে, যা আদালতের নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের শুরুতেই যদি এসব অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হতো, তাহলে পরিবেশদূষণ, ধোঁয়া, কৃষিজমির ক্ষয় ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি থেকে রেহাই পাওয়া যেত। তারা বলছেন, মাঝেমধ্যে লোকদেখানো অভিযানে সাময়িকভাবে ভাটা বন্ধ থাকলেও কয়েক দিন পরই আবার আগের মতোই কাজ শুরু হয়ে যায়। এসব অভিযানের বাস্তবে কোনো ফল নেই বলেই অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় কৃষক আবদুল জব্বার বলেন, কৃষিজমিতে বা জমির পাশে এসব ইটভাটা স্থাপন করায় তাদের ফসলের ক্ষতি হয়। জমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়ায় ভালো ফলন পাওয়া যায় না। এসব ইটভাটার মালিক স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তারা প্রতিবাদ করতেও সাহস পান না।
কবির আহমেদ নামের একজন বলেন, ইটখোলাগুলো থেকে নির্গত দূষিত উপাদানের প্রাদুর্ভাবে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সালফার অক্সাইড ও কার্বন ডাইঅক্সাইড প্রতিনিয়ত বায়ুমণ্ডলে নির্গত হচ্ছে। এটা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতির বড় কারণ। এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে চলতি মৌসুমের শুরুতেই কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এবার যেন কর্তৃপক্ষ সত্যিকার অর্থেই লাগাম টেনে অবৈধ ইটভাটা বন্ধে দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করে। গ্রামীণ সড়কের পাশে গড়ে ওঠা এসব ভাটার ট্রলি ও ট্রাকের কারণে এলজিইডির সড়কগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইট পরিবহনের সময় কাভার না থাকায় সড়কে বালু জমছে এবং বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। রাতে অনেক ভাটায় কাঠ পোড়ানোর ফলে কালো ধোঁয়া এলাকায় ছড়িয়ে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইটভাটা বলেন, ‘আমাদের ইটভাটার ব্যবসা অনেক পুরোনো। সব কর্তৃপক্ষের লাইসেন্স গ্রহণ এবং নবায়ন করেই আমরা ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি। কিন্তু নতুন আইনের কারণে পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র না দেওয়ায় লাইসেন্স পাওয়া যাচ্ছে না।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘চলতি মৌসুমে মতলব উত্তরে দুটি ছাড়া বাকি সব ভাটাই অবৈধ। ইতোমধ্যে দুটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে প্রায় ৭ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। শিগগিরই জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হবে।’
জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে এবং যেগুলো নবায়নযোগ্য নয়, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে।