মৌচাষি লিমন মধু সংগ্রহের জন্য মৌচাক বের করছে
ফুলের কানে গুনগুনিয়ে ভ্রমর যায় গান শুনিয়ে; ঐ ফুল ফোটে বনে যাই মধু আহরণে –কবির ভাবনায় মৌমাছি আর মধু নিয়ে রয়েছে হাজার কবিতা গল্প। বিশুদ্ধ মধুর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করছে পাবনার বেড়াসহ পাশের উপজেলায় গড়ে উঠা ইব্রাহিম, খলিল, লিমনদের মত মৌ-চাষিরা। উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী উপজেলা গুলোতে প্রচুর পরিমাণে সরিষার চাষ হয়ে থাকে। মৌ-চাষিরা তাদের মৌ-বাক্স নিয়ে বছরের গুরুত্বপূর্ণ মধু সংগ্রহের সময়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। উৎসাহিত হয়ে উঠছে এলাকার বেকার যুবকেরা।
মৌচাষিরা কাঠের বাক্স দিয়ে কৃত্রিম বাসা তৈরি করে মৌমাছি পালন করছে। এ ধরনের বিকল্প মৌ-বাসায় তৈরি মৌচাকে মৌমাছির কোনরূপ ক্ষতি না করে সহজেই মধু সংগ্রহ করা যায়। বেড়া বিবি সরকারী পাইলট স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবু ওহাব বলেন, বাংলাদেশে ৪টি প্রজাতির মৌমাছি রয়েছে। এর মধ্যে এ সি ইন্ডিকা প্রজাতির মৌমাছি মৌ-চাষিরা কাঠের বাক্সে পালন করে থাকে। মৌমাছি একান্তভাবেই সামাজিক। একটি মৌচাকে তিন ধরনের মৌমাছি থাকে, একটি রানী, কয়েকশত পুরুষ ও হাজার হাজার শ্রমিক। দেশে ব্যবসা ভিত্তিক মৌমাছি পালন এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। প্রচুর পরিমাণের মধুর উৎসের উপযুক্ত নির্যাস পাওয়া যায় সরিষা ফুল থেকে, কারণ বেশি সংখ্যক ফুল নিয়ে এত বিশাল এলাকাব্যাপী অন্য কোন উদ্ভিদের চাষ হয়না।
দেশের অনেক জেলাতেই সরিষার চাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলায় সরিষার চাষ হয়ে থাকে সর্বাধিক। মধু তৈরীর জন্য মৌমাছিদের প্রচুর পরিমাণ মিষ্টি নির্যাস যোগায় সরিষার ফুল। আম, কুল সজিনা ও তিলসহ বিভিন্ন ফসলের ফুলের নির্যাস উৎকৃষ্ট মধুর উৎস। প্রত্যেকটি ফুলের রং, ঘ্রাণ ও স্বাদ যেমন স্বতন্ত্র তেমনি ফুলের উপর নির্ভর করে মধুর স্বাদ, রং ও গন্ধ স্বতন্ত্র হয়ে থাকে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন ও বাংলাদেশ মৌমাছি পালন ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে মাঝে মধ্যে পেশাদার ও সৌখিন মৌ মাছি পালকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে।
বাংলাদেশ মৌমাছি পালন ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষক মো. রহুল কবীর বলেন, মৌমাছি ফুল থেকে নির্যাস নিয়ে তাদের হানি স্টমাক বা মধু-থলিতে সংগ্রহ করে এবং মধু-থলিতে উৎসেচকের বিক্রিয়ায় তা ডেক্সটোজ ও লিভিউলোজে পরিণত হয়। পরবর্তীতে এই অশংটুকুই মধু।
শাহজাদপুর উপজেলার জুগনিদহ গ্রামের মৌচাষি যুবক লিমন ৫৮টি মৌবাক্স নিয়ে এলাকার বিভিন্ন মাঠে সরিষার ক্ষেতের পাশে রেখে মধু সংগ্রহ করে থাকে। আগাম ও নাবী সরিষা চাষের ফলে প্রায় তিন মাস শুধু সরিষার ফুল থেকে সর্বাধিক পরিমাণ মধু সংগ্রহ হয়ে থাকে। সরিষার পর বরই, আম, লিচুর ফুল থেকেও মৌমাছি যথেষ্ট পরিমাণ নির্যাস নিয়ে মধু তৈরি করে থাকে। জ্যৈষ্ঠ মাসে তিল ও বাদাম ফুল থেকে শেষ মধু সংগ্রহ করা হয় বলে বেড়ার আমিন পুরের মৌচাষি হবিবুর জানায়। ৫০টি মৌবাক্স নিয়ে তার মৌমাছির খামার।
৫৮টি মৌবাক্স থেকে কতটুকু মধু পাওয়া যায় জানতে চাইলে, মৌচাষি লিমন জানায়, সে তিন জন সহকারী নিয়ে সপ্তাহে একদিন মৌ-বাক্স থেকে প্রায় ১২০ কেজি মধু সংগ্রহ করে, মধু সংগ্রহ করতে প্রায় ৫ঘণ্টা সময় লাগে। সরিষা ফুল থেকে সবচেয়ে বেশী মধু পাওয়া যায়।
তিনি আরো জানান, বছরের প্রায় ৬মাস মধু সংগ্রহ করা গেলেও আষাঢ় থেকে অগ্রহায়ণ এই ছয় মাস মৌমাছিকে বিকল্প খাবারের যোগান দিতে হয়। ২ভাগ চিনি ও ১ভাগ পানি মিশিয়ে সিরাপ তৈরি করে মৌমাছির বিকল্প খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। ফাউল ব্রুড রোগ মৌমাছির একটি মারাত্মক ব্যাধি, এ ছাড়াও আরও কিছু সংক্রামক রোগে ও উপদ্রবের কারণে মৌচাক নষ্ট হয়ে যায়।
বাংলাদেশের এপি, স্কয়ার, ডাবর ও বিদেশে রপ্তানিকারক ডেকোসহ বিভিন্ন কোম্পানি এসব মৌচাষিদের থেকে মধু নিয়ে থাকে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হলে বছর শেষে খরচ খরচা বাদ দিয়ে দু’আড়াই লাখ টাকা আয় হয় বলে মৌ-চাষিরা জানায়।