কর্মসংস্থান ইস্যুতে গলদঘর্ম হবে সরকার

০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:০০ PM

© টিডিসি

উন্নয়ন সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলতে ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই হবে আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জের প্রত্যক্ষ মুখোমুখি হতে যাচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসা শেখ হাসিনার সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। একইসঙ্গে কমছে শিশু ও বৃদ্ধ তথা নির্ভরশীল মানুষের অনুপাত। যেহেতু বিগত বিগত বছর দফায় দফায় রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে ওঠার পেছনে প্রধান কারণ ছিল তরুণদের বেকারত্ব। তাই কমর্সংস্থানমুখী অর্থনীতি গড়ে তুলতে না পারলে বিগত ১০ বছরের সফলতা ম্লান হবে। সেইসঙ্গে গলদঘর্ম অবস্থা তৈরি হতে পারে পুরো কর্মসংস্থান ব্যবস্থায়।

তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ কোটি ৬১ লাখ মানুষ রয়েছে কর্মক্ষম। এর মধ্যে ৬ কোটি ২১ লাখ মানুষ কাজের মধ্যে রয়েছে। আর কর্মের বাইরে রয়েছে ৪ কোটি ২৪ লাখ। ২৬ লাখ রয়েছে শিক্ষিত বেকার। এ কর্মসক্ষম মানুষগুলোর সঠিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারলে এরাই অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। কিন্তু তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মত, দেশে অনেক সমস্যা রয়েছে। তবে এর মধ্যে বেকারত্ব সবচেয়ে গুরুতর এ কারণে যে, বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী ক্ষুব্ধ তরুণদের কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে। তরুণদের ক্ষোভের সঙ্গে যখন রাজনৈতিক জ্বালানি যুক্ত হবে; যা বারুদের মতো জ্বলে ওঠার ঝুঁকি রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে পাওয়া তথ্যমতে, দেশে জিডিপি বাড়লেও প্রতিবছরই কর্মসংস্থান হ্রাস পাচ্ছে। ২০১৭ সালে দেশের বাইরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ কাজের জন্য গেলেও ২০১৮ সালে এতে বড় ছেদ পড়েছে। এই প্রবণতা আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে বলেও আভাস দেয়া হয়েছে। দেশে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের কারণে যে হতাশা কাজ করছে, সেটা ২০১৮ সালে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমকে ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল রাজপথে। কোটা সংস্কার আন্দোলন, চাকরিতে বয়স বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন নামে-বেনামে ক্ষুব্ধ তরুণরা মূলত একটি কাজের আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। এসব তরুণদের জন্য কাজের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হলে তা সরকারকে বিপাকে ফেলবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরাও।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অথর্বছরে দেশের ভেতর কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে ১৩ লাখ, যেটা আগের বছর ছিল ১৪ লাখ। অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অথর্বছরে পুরোপুরি বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ৬০ হাজার, যেটা আগের অথর্বছরে (২০১৫-১৬) ছিল ২৬ লাখ। অথার্ৎ এক বছরের ব্যবধানে বেকার বেড়েছে ৬০ হাজার। শ্রমশক্তি জরিপ ২০০২ অনুযায়ী, তখন দেশে বেকার মানুষ ছিল ২০ লাখ। এরপর বেকার মানুষ কমানো যায়নি, বরং প্রতিবছরই বেড়েছে।

সরকারী-বেসরকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয় করতে হবে।উদ্যোক্তা হয়ে যুবকদের কাজে কাজে লাগাতে হবে

 

এদিকে গত ৩ অক্টোবর তৎকালীন অথর্মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন, দেশে প্রতিবছর পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেয়া তথ্যের চেয়ে অনেক কম। ফলে পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেয়া তথ্য কতটা সত্য, সেটা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অথর্নীতিবিদরা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) সম্প্রতি বাংলাদেশসহ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের মানুষের মধ্যকার বেকারত্বের ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সেখানেও দেখানো হয়েছে, গত সাত বছরে বাংলাদেশে বেকারের হার বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে একটি কাঙ্ক্ষিত কাজ পাওয়া এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আঞ্চলিক কর্মসংস্থান নিয়ে এক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। ‘এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীষর্ক এই প্রতিবেদনে ২০০০-২০১৭ সাল পযর্ন্ত এই অঞ্চলের ২৮টি দেশের বেকারত্ব, তরুণদের কর্মসংস্থান, আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, কমর্সন্তুষ্টি ইত্যাদির তুলনামূলক চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যেটা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সবোর্চ্চ। বাংলাদেশের ওপরে আছে কেবল পাকিস্তান।

এদিকে দেশের ভেতরের চেয়ে বাইরের অবস্থা আরও খারাপ। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে সাত লাখ ১২ হাজার ৩৪২ জন কর্মী বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পেশায় কাজ করতে গেছেন। অথচ ২০১৭ সালে ১০ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে চাকরির জন্য গিয়েছিলেন। এই হারে এক বছরের ব্যবধানে দেশের বাইরে প্রায় তিন লাখ কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে ২০১৮ সালে। যদিও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছিল, ২০১৮ সালে তারা ১২ লাখ মানুষ দেশের বাইরে পাঠানোর লক্ষ্য ঠিক করেছেন। কিন্তু লক্ষ্যের চেয়ে পাঁচ লাখ মানুষ কম বিদেশে যেতে সক্ষম হয়েছে। এসব চিত্র তুলে ধরে দেশের কর্মসংস্থান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। দেশকে স্থিতিশীল রাখার জন্য এখনই বহুমুখী কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলছেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘বিশ্ববাজারে চাকরির চাহিদার ভিত্তিতে বাংলাদেশে বিপুল কর্মক্ষম মানুষকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাকে বাজার মুখী শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে’

এদিকে সরকারের প্রদত্ত জিডিপি বৃদ্ধির হার নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, জিডিপি অথার্ৎ মোট জাতীয় উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে। কারণ, বেশি উৎপাদনে বেশি লোকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা সে সঙ্গে মিলছে না বলেও দাবি অর্থনীতিবিদদের। আইএলওর সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা রিজওয়ানুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তা বাড়তি হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কতটুকু ভূমিকা রাখছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আবার তরুণদের যে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, তা কর্মসংস্থানে কাজে লাগছে কিনা, সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সায়মা হক বিদিশা মনে করেন, ‘গত কয়েক বছরে অর্থনীতিতে যে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, এখন সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সবাই পাচ্ছে কি-না, সেটাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মসংস্থান সেভাবে তৈরি হচ্ছে না; এটা আর একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই উন্নতি বা প্রবৃদ্ধির সুবিধা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ।’

বেকারত্ব দূর করার জন্য কর্মসংস্থানমুখী কাজের সন্ধানের পাশাপাশি আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির মুলোৎপাটন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্য শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় সংস্কারসহ বিভিন্ন সুপারিশও করছেন বিশেষজ্ঞরা। আর তা না হলে বিশাল বেকারের ভার বহন করা সরকারের জন্য রীতিমতো অসাধ্য হয়ে উঠতে পারে বলেও সতর্ক করছেন তারা। দেশের তরুণ সমাজও মনে করে, বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে এর মধ্যে কর্মসংস্থান সবচেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে।

ইডেন কলেজের সামনে আপত্তিকর অবস্থান যুবকের, ধাওয়া করে ধরলেন …
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ে ভিডিও কলে টাইগারদের …
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬
গাজীপুরে গরুবাহী পিকআপ, অটোরিকশা ও বাসের সংঘর্ষে নিহত ৩
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬
এলএনজি: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নির্মম বাস্তবতা
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬
ছাত্রী প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় উত্তেজনা, সংঘর্ষে জড়…
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সবাইকে নিয়ে বসুন, ইগো দেখানোর ক…
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬