পাহাড়ে জুমের ধান কাটার হিড়িক, ব্যস্ত জুম চাষিরা © টিডিসি ফটো
পাহাড়ে জুমের ধান কাটার হিড়িক পড়েছে। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদগুলোতে জুমের ধান পাকতে শুরু করায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জুম চাষিরা। কেউ কাস্তে হাতে নেমেছেন ধান কাটতে, কেউ আবার কাটা ধান ঘরে তোলার কাজে ব্যস্ত। জুমের ধান কাটাকে ঘিরে পাহাড়ের জনপদে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য।
বৈশাখ মাসে বৃষ্টি শুরুর সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের ঢালে জুমের আবাদ শুরু করেন চাষিরা। একই জমিতে ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, মারফা, হলুদ, মরিচ, কুমড়া, মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন ফসলের বীজ বপন করা হয়। কয়েক মাসের পরিচর্যার পর এখন জুমের ধান পাকতে শুরু করায় ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন চাষিরা।
জুমের ধান পাকতে শুরু করায় এখন পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় ব্যস্ততা বেড়েছে। ভোর থেকে জুমের জমিতে ছুটছেন চাষিরা। কাস্তে দিয়ে ধান কাটার পর আঁটি বাঁধা, বহন করে বাড়িতে নেওয়া এবং মাড়াইয়ের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন তাঁরা।
জুম চাষিদের কাছে এই ফসল শুধু খাদ্যের উৎস নয়, বছরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের আয় ও পারিবারিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রত্যাশারও নাম। ধানসহ অন্যান্য ফসল ঘরে তুলতে পারলে কিছুটা স্বস্তি আসে পরিবারে।
তবে জুমের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হলে পাহাড়ের মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও আয়বর্ধক সুযোগ তৈরির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে কৃষি বিভাগের উন্নত জাত ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রসার ঘটানো গেলে সীমিত জমিতে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় এক জুম চাষি বলেন, জুমে ধানের পাশাপাশি মারফা, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। তবে জুম চাষ করে সারা বছর সংসার চালানো কঠিন। পাঁচ-ছয় মাস জুম থেকে আয় হয় না। সন্তান, পরিবার ও সংসারের ব্যয় মেটাতে তাঁদের বিকল্প আয়ের প্রয়োজন হয়।
তিনি আরও বলেন, আগের তুলনায় জুম করার জায়গাও কমে গেছে। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গিয়ে জুম করতে গেলেও অনেক সময় সুযোগ পাওয়া যায় না। কোথাও দুই-তিন মাস জুম করা সম্ভব হলেও অনেক জায়গায় সেটিও সম্ভব হয় না।
জুমচাষিদের দাবি, পাহাড়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে তাঁদের ওপর জুমের নির্ভরতা কমবে। চাকরি ও আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের সুযোগ পেলে পরিবার-পরিজন নিয়ে আরও স্বচ্ছলভাবে জীবনযাপন করা সম্ভব হবে।
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী জানান, চলতি অর্থবছরে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় প্রায় ১ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে জুমের ফসল আবাদ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জুমে একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ফসল আবাদ করা হয়। স্থানীয় বিভিন্ন জাতের ধানের পাশাপাশি স্থানীয় ও রঙিন ভুট্টা, কুমড়া, হলুদ, মারফা, মিষ্টি কুমড়াসহ নানা ফসলের সমন্বয়ে জুম আবাদ করা হয়। বৈশাখ মাসে বৃষ্টি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জুমের আবাদ শুরু হয়। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এসে অনেক জুমের ফসল পরিপক্ব হতে শুরু করেছে। ধান পাকা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে মারফা, মিষ্টি কুমড়া ও ভুট্টা সংগ্রহ করা হচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যে জুমের ধানও ব্যাপকভাবে কাটা শুরু হবে।
নাসির চৌধুরী জানান, পাঁচ-সাত বছর আগেও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় জুমের আবাদ আরও বেশি ছিল। ধীরে ধীরে জুমের জমির পরিমাণ কমছে। এর অন্যতম কারণ, আগে যেসব এলাকায় জুম আবাদ হতো, সেসব জায়গায় পর্যায়ক্রমে ফলদ বাগান গড়ে উঠেছে। তবে যেসব এলাকায় সমতল জমি নেই এবং উপশি ধান চাষের উপযোগী জমি নেই, সেসব এলাকার মানুষের কাছে জুম এখনো গুরুত্বপূর্ণ। এসব এলাকার অনেক পরিবার জুমের ওপর নির্ভরশীল।