ক্যাডেট কলেজে ভর্তির গল্প বললেন ঢাবির মাহমুদুল
মাহমুদুল হাসান © টিডিসি সম্পাদিত
চলতি মাসেই ২০২৮ সালের ক্যাডেট কলেজ ভর্তি পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হতে পারে। ইতোমধ্যে ক্যাডেট কলেজ ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন ভর্তিচ্ছুরা। ভর্তি পরীক্ষায় নিজের সাফল্য, প্রস্তুতি এবং ভর্তিচ্ছুদের জন্য পরামর্শ নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের মুখোমুখি হয়েছেন রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান। তিনি ২০১৭ সালে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তার কথাগুলো শুনেছেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি মো. আরাফাত রহমান উদয়।
আপনার শৈশব ও স্কুল জীবন সম্পর্কে জানতে চাই
আমার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশালে, সেখানে আমাদের বাসা ছিল। কিন্তু ভালো শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে আমার চার বছর বয়সে আব্বু-আম্মু ময়মনসিংহ শহরে চলে আসেন। সেখানে চরপাড়া এলাকায় কেজি স্কুলে ভর্তি হই। এরপর নয়াপাড়া এলাকার সৃজন রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়ি। স্কুলের রেজাল্ট মোটামুটি ভালোই ছিল। এরপর ক্লাস ফাইভে এসে আবার গ্রামের স্কুল- দড়ি কাঁঠাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। এরপর ফাইভে বৃত্তি পাই এবং পরবর্তীতে সিক্সে উঠে সেখানে একটা ক্যাডেট কোচিংয়ে ভর্তি হই।
ক্যাডেট কলেজে পড়ার স্বপ্নটা কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
ক্যাডেট কলেজে পড়ার মূল আগ্রহটা ছিল আমার বাবার। আমার চাচা সেনাবাহিনীতে সার্জেন্ট ছিলেন, সেই সুবাদে আব্বু প্রায়ই ক্যান্টনমেন্টে যেতেন। তখন থেকেই তিনি আর্মি অফিসারদের সম্মান দেখে মুগ্ধ হতেন এবং চাইতেন আমিও যেন আর্মি অফিসার হই। বাবার এই স্বপ্ন থেকেই ক্যাডেটে পড়ার যাত্রা শুরু হয়। আর আমার রেজাল্ট ভালো থাকায় আব্বু-আম্মুও সবসময় আমাকে উৎসাহ দিতেন।
কোচিংয়ের শুরুতে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
প্রথম প্রথম একটু ধাক্কা খাই। কারণ, প্রথমবারের মতো বাসা থেকে বাইরে স্বাধীনভাবে থাকার সুযোগ পেয়েছিলাম এবং নানা ধরনের মানুষের সাথে মিশতে শুরু করি। ফলে পড়াশোনায় একটু অমনোযোগী হয়ে দুষ্টুমি করতে শুরু করি। তখন কোচিংয়ের পরিচালক শিপন স্যার আমাকে অনেক বুঝিয়েছেন। উনি বলেছিলেন, ‘তোর বাবা-মা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এত কষ্ট করে তোকে এখানে পড়াতে পাঠিয়েছেন, তুই কেন পড়াশোনা করছিস না?’ কিন্তু প্রথমে আমি কথা শুনিনি এবং পরীক্ষায় খারাপ করি। তখন স্যার রেগে গিয়ে আমাকে বেত দিয়ে পিটিয়েছিলেন এবং মনোযোগ বাড়াতে আমার মাথা ন্যাড়া করে দিয়েছিলেন।
এই ঘটনা কি আপনার ভেতরে কোনো জেদ তৈরি করেছিল?
হ্যাঁ, একদম। স্যার যখন আমাকে খারাপ ছাত্র বললেন, তখন আমার ভেতরে জেদ চেপে বসে। আমি নিজেকে বললাম, ‘আমি তো খারাপ ছাত্র না, আমি প্রমাণ করে দেখাব’। সেই জেদ থেকেই আমার দুষ্টুমি করা বন্ধ হয়ে যায় এবং পুরোপুরি পড়াশোনায় মনোযোগ দিই।
পরীক্ষার আগের তিন-চার মাসের প্রস্তুতি কেমন ছিল?
শেষের দিকের তিন-চার মাসে, যখন মডেল টেস্ট চলছিল, তখন পড়াশোনাটা আমার কাছে একটা নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল। আব্বু এসে আমাকে উৎসাহ দিতেন। আমি রাতে তিন-চারটা পর্যন্ত পড়তাম, আবার সকালে আটটা থেকে পড়া শুরু করতাম। খাওয়ার জন্য পাঁচ মিনিট, গোসলের জন্য কয়েক মিনিট সময় নিতাম। শিপন স্যার আমাকে তার অফিস রুমটা পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছিলেন, যেন আমি শান্তিতে পড়তে পারি। আমি মাঝেমধ্যে রাতে ছোট টর্চ লাইট জ্বালিয়েও পড়তাম। আবাসিকের তদারকিকারী একদিন আব্বুকে কল দিয়ে বলেন, ‘মাহমুদ যেভাবে পড়ছে, ও তো পাগল হয়ে যাবে’। তখন আব্বু এসে আমাকে বুঝিয়েছিলেন যেন নিজের ওপর একটু কন্ট্রোল রাখি, অতিরিক্ত চাপ না নিই। কিন্তু তারপরও আমি আমার মতো পড়াশোনা চালিয়ে গেছি।
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা চার মাস আমি দিনে ১৬ ঘণ্টার বেশি শুধু পড়াশোনাই করেছি। আমার সাথে আরও তিন-চারজন বন্ধু ছিল, যারা আমার মতোই ডাই-হার্ড পড়ত। আলহামদুলিল্লাহ, পরবর্তীতে মডেল টেস্টে ভালো রেজাল্ট আসতে শুরু করে এবং আমরা সবাই লিখিত পরীক্ষায় টিকে যাই। শেষ পর্যন্ত আমাদের ওই গ্রুপ থেকে আমি একাই ক্যাডেট কলেজে চান্স পাই। আমি রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে চান্স পেয়েছিলাম। এই পুরো যাত্রায় আমার ডেডিকেশনই আমাকে সফল হতে সাহায্য করেছে।
ক্যাডেট কলেজের প্রস্তুতি আসলে কখন থেকে শুরু করা উচিত?
ক্লাস সিক্সের শুরুতে, অর্থাৎ ফাইভের পরীক্ষা শেষ করার পর জানুয়ারি থেকে প্রস্তুতি শুরু করাটাই সবচেয়ে আদর্শ। আজকাল অনেক কোচিং সেন্টারে থ্রি, ফোর বা ফাইভে ‘প্রি-ক্যাডেট’ পড়ানো হয়। আমি মনে করি, এটা বাচ্চাদের জন্য একটা এক্সট্রা বার্ডেন বা বোঝা। কোনো শিক্ষার্থী যদি ক্লাস সিক্সে উঠে সম্পূর্ণ মনোযোগ ও ইচ্ছাশক্তির সাথে সারা বছর প্রস্তুতি নেয়, তবে ইনশাআল্লাহ তার চান্স হয়ে যাবে। শুরুতেই অতিরিক্ত চাপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
একজন শিক্ষার্থীর প্রতিদিন কত ঘণ্টা পড়াশোনা করা উচিত?
আমার মতে, সেলফ স্টাডি বা নিজের পড়ার জন্য দৈনিক ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় রাখা উচিত। ২৪ ঘণ্টার চার ভাগের এক ভাগ, অর্থাৎ ৬ ঘণ্টা পড়াশোনা করলেই যথেষ্ট। ১০-১২ ঘণ্টা পড়ার যেমন দরকার নেই, তেমনি ৩-৪ ঘণ্টাও যথেষ্ট নয়। তবে বছরের শুরু থেকেই খুব বেশি চাপ নেওয়া উচিত নয়, এতে সিলেবাস আগে শেষ হয়ে গেলে শেষের দিকে পড়াশোনায় গাফিলতি চলে আসতে পারে। পড়ার মূল গতি বা এক্সিলারেশনটা শেষের তিন-চার মাসের জন্য (মডেল টেস্টের সময়) জমিয়ে রাখা উচিত।
বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে গণিতের কৌশল কী হওয়া উচিত?
ক্যাডেটের গণিত শুধু ক্লাস সিক্সের সিলেবাস দিয়ে কভার করা সম্ভব নয়। এখানে সেভেন বা তার ওপরের লেভেলের বেসিক থেকেও প্রশ্ন আসে। গণিত মূলত প্রবলেম সলভিং। যার বেসিক ভালো, সে যেকোনো অঙ্কই সমাধান করতে পারবে। আমার গণিতের বেসিক ভালো থাকায় আমি ক্লাস সিক্সে গণিতের জন্য কোনো কোচিং করিনি, উল্টো বন্ধুদের বুঝিয়ে দিতাম। তাই কারও যদি বেসিক দুর্বল থাকে, তাকে শুরু থেকেই সিক্স-সেভেন লেভেল পর্যন্ত গণিতের বেসিকটা ভালোভাবে কভার করতে হবে।
ইংরেজির ক্ষেত্রে গ্রামার বা ফ্রি-হ্যান্ড রাইটিংয়ের দক্ষতা কীভাবে বাড়ানো যায়?
ক্যাডেটের প্রস্তুতির একটি অলিখিত নিয়ম হলো—যে ইংরেজিতে ভালো, সে অন্যদের চেয়ে ৫০% এগিয়ে থাকে। ক্যাডেটের ইংরেজি প্রশ্ন ক্লাস টেন বা এসএসসি লেভেল পর্যন্ত হতে পারে। তাই শুধু সিক্সের বেসিক গ্রামার পড়লে পিছিয়ে পড়তে হবে। ক্যাডেটের ইংরেজিতে অনেক মেমোরাইজিং পার্ট (যেমন- এপ্রোপ্রিয়েট প্রিপজিশন, গ্রুপ ভার্ব) থাকে। আমি এগুলো মনে রাখার জন্য একটা আলাদা নোট খাতা বানিয়েছিলাম। যা পড়তাম এবং ভুলে যেতাম, তা সেখানে লিখে রাখতাম। এরপর প্রতিদিন কোচিংয়ে বসে, সকালে উঠে বা ঘুমানোর আগে খাতাটায় চোখ বুলাতাম। বারবার দেখতে দেখতে এগুলো একদম মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।
সাধারণ জ্ঞান ও বিজ্ঞানের বিশাল সিলেবাস কীভাবে আয়ত্ত করতেন?
সাধারণ জ্ঞান পড়াটা আমার কাছে বেশ ভালো লাগত। যখন অন্য কিছু পড়তে ভালো লাগত না, তখন জিকে পড়তাম, কারণ এতে নতুন অনেক কিছু জানা যায়। তবে এখানে স্ট্র্যাটেজি মেনে পড়তে হবে। সাম্প্রতিক বিষয়াবলি (যেমন- নোবেল পুরস্কার, গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন) সারা বছর না পড়ে পরীক্ষার ঠিক আগে পড়া উচিত। আর সারা বছর সাধারণ জ্ঞানের বেসিক বিষয়গুলো এবং ক্লাস সিক্সের বিজ্ঞান বইটা খুব ভালোভাবে মুখস্থ করে ফেলা উচিত।
ক্যাডেটের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কোচিং সেন্টার কতটা কার্যকরী? আর সেলফ স্টাডির গুরুত্বই বা কতটুকু?
আমার ক্ষেত্রে কোচিংয়ের সাপোর্ট খুব ভালো ছিল। শিপন স্যারের অবদান আমার জীবনে বাবা-মায়ের পরেই। কিন্তু এখনকার অনেক কোচিং সেন্টার অনেকটাই ব্যবসামুখী। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। ছেলে কোচিংয়ে গিয়ে পড়ছে নাকি আড্ডা দিচ্ছে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। কোচিং শুধু রাস্তা দেখিয়ে দেবে, কিন্তু সেলফ স্টাডি না করলে কেউ ভালো করতে পারবে না। কোচিংয়ের বাইরে বাসায় বসে প্রতিদিন অন্তত চার থেকে ছয় ঘণ্টা নিজের পড়তে হবে। আর যদি কোচিং ইফেক্টিভ না হয়, তবে কোনো এক্স-ক্যাডেট বা পার্সোনাল টিউটর বাসায় রেখে পড়ানো যেতে পারে এবং শেষের দিকে ভালো কোনো কোচিংয়ে শুধু মডেল টেস্ট দেওয়া যেতে পারে।
পরীক্ষার হলে টাইম ম্যানেজমেন্ট বা সময় ব্যবস্থাপনার কৌশল কী ছিল?
আমার কৌশল ছিল নিজের সবচেয়ে স্ট্রং বা শক্তিশালী বিষয় দিয়ে পরীক্ষা শুরু করা। আমি জিকে-তে ভালো ছিলাম, তাই জিকে দিয়ে শুরু করতাম। কেউ ম্যাথ বা ইংরেজিতে ভালো হলে সেটা দিয়ে শুরু করবে। সবচেয়ে কঠিন অংশটা শেষে রাখতে হবে। কোনো একটা অঙ্ক না পারলে সেটা নিয়ে বসে থেকে সময় নষ্ট করা যাবে না, বরং পরের প্রশ্নে চলে যেতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হাতের লেখা। তাড়াহুড়ো করে লিখতে গিয়ে লেখা খারাপ হলে শিক্ষকরা খাতা বুঝতে পারেন না এবং নম্বর দেন না। তাই লেখা অবশ্যই পরিষ্কার ও সুন্দর হতে হবে। আর প্রশ্ন কঠিন মনে হলে ঘাবড়ানো যাবে না, ভাবতে হবে প্রশ্ন কঠিন হলে তা সবার জন্যই কঠিন।
লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত?
ভাইভা বোর্ডে টিচাররা বেশ ফ্রেন্ডলি থাকেন। তারা মূলত দেখে শিক্ষার্থীর কনফিডেন্স বা আত্মবিশ্বাস আছে কি না। যেহেতু ক্যাডেট কলেজ একটি আর্মি প্রতিষ্ঠান এবং সেখানকার জীবন বেশ কঠোর, তাই তারা এমন ছেলে খোঁজে যে এই প্রেশার হ্যান্ডেল করতে পারবে। লিখিত পরীক্ষায় পাস করা মানে মেধা প্রমাণ হয়ে গেছে, ভাইভাতে শুধু মানসিক দৃঢ়তা যাচাই করা হয়। যদি কোনো প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকে, তবে ঘাবড়ে না গিয়ে কনফিডেন্টের সাথে বলে দিতে হবে- সরি স্যার, আমার এই মুহূর্তে উত্তরটা মনে পড়ছে না।
লিখিত পরীক্ষার পর ভাইভা ও মেডিকেল টেস্ট কি একই দিনে হয়? মেডিকেল টেস্টে মূলত কোন বিষয়গুলো দেখা হয়?
হ্যাঁ, ভাইভা ও মেডিকেল টেস্ট একই দিনে হয়। মেডিকেল টেস্টে সাধারণত চোখের সমস্যা, হাঁটু আটকে যাওয়া এবং এক্সেস ওয়েট বা বাল্কি শরীর থাকলে বাদ দিয়ে দেয়। এছাড়া একটি ন্যূনতম উচ্চতাও লাগে। তবে লিখিত পরীক্ষায় অনেক ভালো করলে অনেক সময় মেডিকেল বোর্ডে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়। যেমন, আমার অনেক বন্ধু ছিল যারা চশমা ছাড়া দেখতে পেত না বা উচ্চতা একটু কম ছিল, কিন্তু রিটেনে ভালো করার কারণে তারা টিকে গিয়েছিল।
ক্যাডেট কলেজের জীবন আপনার ব্যক্তিগত জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছে?
ক্যাডেট কলেজ আমাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। সেখান থেকে আমি মূলত চারটি জিনিস শিখেছি- টাইম ম্যানেজমেন্ট, ডিসিপ্লিন, যেকোনো প্রেশার বা চাপ সামলানো এবং যেকোনো পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া বা খাপ খাইয়ে নেওয়া। এই চারটা জিনিস আমি ক্যাডেট কলেজ থেকে খুব ভালোভাবে শিখেছি, যার সুফল আমি এখনো পাচ্ছি।