স্ত্রী প্রিসিলা চ্যানের সঙ্গে ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গ © সংগৃহীত
নিজেদের প্রথম সন্তানের জন্মের পর নিজেদের ফেসবুকের ৯৯ শতাংশ শেয়ার দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ ও প্রিসিলা চ্যান দম্পতি। সে সময় শেয়ারগুলোর মূল্য ছিল প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার। তবে তাদের এই প্রতিশ্রুতি শুধু সম্পদ দানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও ভালো পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যও তুলে ধরেছিলেন তারা। এক দশকের বেশি সময় পরও তাদের সেই খোলা চিঠি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
২০১৫ সালে মেয়ে ম্যাক্সিমার জন্মের পর তাকে উদ্দেশ করে চিঠিটি লিখেছিলেন জাকারবার্গ ও প্রিসিলা। ‘আওয়ার ডটার’ শিরোনামে লেখা ওই চিঠিতে তারা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের আশা, স্বপ্ন ও দায়িত্ববোধের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে পৃথিবীর সব শিশুর জন্য স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও সমান সুযোগের বিশ্ব গড়ে তোলার প্রত্যয় জানান।
চিঠির শুরুতে তারা লিখেছিলেন, ‘তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে তুমি আমাদের মনে যে আশার জন্ম দিয়েছ, তা প্রকাশ করার মতো শব্দ এখনো আমাদের জানা নেই। তোমার নতুন জীবন সম্ভাবনায় ভরা। আমরা আশা করি, তুমি সুখী ও সুস্থ থাকবে, যাতে পৃথিবীকে পুরোপুরি আবিষ্কার করতে পারো।’
জাকারবার্গ ও প্রিসিলা লিখেছিলেন, অন্য সব মা-বাবার মতো তারাও চান, তাঁদের সন্তান যেন বর্তমানের চেয়ে ভালো একটি পৃথিবীতে বেড়ে ওঠে। তাদের মতে, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, জ্ঞান ও মানুষের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশ্ব এগিয়েছে। প্রযুক্তির উন্নতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনকে আরও উন্নত করার সুযোগ তৈরি করেছে।
চিঠিতে তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দুটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। একটি হলো মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো, অন্যটি হলো সমতা প্রতিষ্ঠা। মানুষের জীবনকে আরও উন্নত করা, রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়, সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি, ইন্টারনেটের বিস্তার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোকে তারা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, জন্মস্থান, পরিবার কিংবা আর্থসামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রত্যেকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা। তাদের মতে, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূর করা, সবার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা এবং নারী, শিশু, সংখ্যালঘু ও অভিবাসীদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে মানবসমাজের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।
রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এই দম্পতি। চিঠিতে তারা উল্লেখ করেন, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় সমাজ যত অর্থ ব্যয় করে, রোগ প্রতিরোধের গবেষণায় ব্যয় করে তার তুলনায় অনেক কম। তাদের বিশ্বাস ছিল, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির উন্নতির মাধ্যমে আগামী ১০০ বছরের মধ্যে অধিকাংশ রোগ প্রতিরোধ, নিরাময় কিংবা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যক্তিকেন্দ্রিক পদ্ধতির কথা তুলে ধরেন তাঁরা। তাদের ধারণা ছিল, ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগ্রহ ও সক্ষমতা অনুযায়ী শিখতে পারবে। প্রযুক্তি বুঝতে পারবে কোন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে ভালো এবং কোথায় তার বেশি সহায়তা প্রয়োজন। ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীরাও এ ধরনের শিক্ষার সুযোগ পাবে।
বিশ্বের সব মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টিও তাদের পরিকল্পনায় ছিল। চিঠিতে তারা উল্লেখ করেন, ইন্টারনেট শুধু বিনোদন বা যোগাযোগের মাধ্যম নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক সেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। সে সময় তাঁদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১০ জন নতুন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে একজন দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পান এবং একটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়। তখন বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ, অর্থাৎ ৪০০ কোটিরও বেশি মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ ছিল না।
জাকারবার্গ ও প্রিসিলা মনে করতেন, শুধু প্রযুক্তি দিয়ে সমাজের সব সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য শক্তিশালী ও সুস্থ সামাজিক পরিবেশ, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, নিরাপদ বাসস্থান এবং শিশুদের জন্য সহায়ক পারিবারিক পরিবেশ প্রয়োজন। শিশুদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এসব বিষয়কে তাঁরা সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি কাজ, প্রযুক্তির ব্যবহার, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা রাখা এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার কথা বলেন তাঁরা। তাঁদের মতে, বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ২৫, ৫০ কিংবা ১০০ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
মেয়ের জন্মের পর চিঠিতে নিজেদের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি ‘চ্যান জাকারবার্গ ইনিশিয়েটিভ’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণাও দেন তারা। মানবিক সক্ষমতা বাড়ানো ও সব শিশুর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর প্রাথমিক কাজের ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা, রোগ নিরাময়, মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং শক্তিশালী সমাজ গঠন।
চিঠিতে জাকারবার্গ ও প্রিসিলা জানান, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা জীবদ্দশায় নিজেদের ফেসবুকের ৯৯ শতাংশ শেয়ার দান করবেন, যার তৎকালীন মূল্য ছিল প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার। তাদের ভাষায়, ‘আমরা জানি, এসব সমস্যার সমাধানে কাজ করা অসংখ্য মানুষের সম্পদ ও মেধার তুলনায় আমাদের এই অবদান সামান্য। তবে অন্যদের সঙ্গে কাজ করে আমরা যতটুকু সম্ভব অবদান রাখতে চাই।’
চিঠির শেষাংশে মেয়েকে উদ্দেশ করে তারা লেখেন, ‘ম্যাক্স, আমরা তোমাকে ভালোবাসি এবং তোমার ও সব শিশুর জন্য পৃথিবীকে আরও ভালো করে রেখে যাওয়ার গভীর দায়িত্ববোধ অনুভব করি। তোমার জীবনও যেন তোমার দেওয়া ভালোবাসা, আশা ও আনন্দে পরিপূর্ণ হয়, সেই কামনা করি।’
সূত্র: মার্ক জাকারবার্গ ও প্রিসিলা চ্যানের ২০১৫ সালের খোলা চিঠি।