ইতিহাসের সর্বোচ্চ টার্নআউট,
ভাগ্য নির্ধারনী জাতীয় নির্বাচনে হারতে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু © সংগৃহীত
পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইসরায়েলের বহুল প্রত্যাশিত পরিনামদর্শী জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে উল্লেখযোগ্য হারে কেন্দ্রে ছুটছেন ভোটাররা। দেশটির ইতিহাসে ৪৫ বছরের মধ্যে নির্বাচনের শুরুর দিকে এটিই সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের মূল্যায়ন করছেন ভোটাররা। অনেকের মতে, এটি ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর প্রথমবারের মতো আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দেশটিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ওই হামলায় দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিনটির স্মৃতি এবং পরবর্তী সময়ে গাজা, লেবানন ও ইরানে যুদ্ধের প্রভাব ভোটারদের মধ্যে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ইসরায়েলের ডানপন্থি জোট সরকারের নীতিগুলো দেশের অভ্যন্তরে বিভাজন বাড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটিকে আরও বিচ্ছিন্ন করেছে। তবে নেতানিয়াহু তার শাসনামলের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, ইসরায়েলের শত্রুদের মোকাবিলার মতো দৃঢ়তা একমাত্র তাঁরই রয়েছে।
ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতা নেতানিয়াহু ১৯ বছর ধরে দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা সুপরিচিত। দেশটির জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতেও তাঁর প্রভাব ক্রমেই গভীর হয়েছে। ইসরায়েলের খণ্ডিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ডানপন্থি, উগ্র ডানপন্থি ও অতি-ধর্মীয় দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত তাঁর জোটকে ক্ষমতা থেকে সরানো বিরোধীদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট। সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান ও নিরাপত্তা ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত এই নেতা ডানপন্থি ও মধ্যপন্থি দলগুলোর পাশাপাশি ক্রমেই প্রভাব হারাতে থাকা বামপন্থিদের সমর্থন নিয়ে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান। জনমত জরিপে দুই নেতার মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। তবে কারও পক্ষেই সরকার গঠনের পথ সহজ নয়।
স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোটকেন্দ্র খোলার পর ভোট গ্রহণ শুরু হয়। রাত ১০টায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার কথা। দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম তিন ঘণ্টায় যোগ্য ভোটারদের ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। ১৯৮১ সালের পর নির্বাচনের শুরুর দিকে এটিই সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতির হার।
তেল আবিবের কাছের রামাত গানের ৮১ বছর বয়সী দীর্ঘদিনের বামপন্থি ভোটার রুথ এপস্টেইন বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটসকে ভোট দেওয়ার পর বলেন, ‘আমার জানা সব নির্বাচনের মধ্যে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানে ভবিষ্যতে কী হবে, তা নিয়ে আমি সত্যিই ভীত।’
অন্যদিকে, জেরুজালেমের বাসিন্দা ও নেতানিয়াহুর সমর্থক লুইস লিপস্কি প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় রাখতে ভোট দিয়েছেন। ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তির আওতায় কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কৃতিত্ব তিনি নেতানিয়াহুকে দিয়েছেন।
নেতানিয়াহু তাঁর নির্বাচনী প্রচারে যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাঁর মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনও কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। ট্রাম্প বলেছেন, তাঁদের ‘কাজ শেষ করতে হবে’।
১২০ আসনের পার্লামেন্টে নেতানিয়াহু বা আইজেনকট—কেউই সরকার গঠনের মতো জোট তৈরি করতে না পারলে নতুন নির্বাচন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকতে পারেন নেতানিয়াহু। ২০০৯ সালের পর তাঁর বিরোধীরা মাত্র একবার তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরাতে পেরেছিলেন। সে ক্ষেত্রেও দুই বছরের মধ্যে চারটি অনিষ্পন্ন নির্বাচনের পর ক্ষমতা হারান তিনি। তবে ১৮ মাসের মধ্যে আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসেন।
আইজেনকটের প্রত্যাশা ‘নতুন চেতনা’
নেতানিয়াহুর বিরোধীদের অনেকের কাছে এবারের নির্বাচনের মূল বিষয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার জবাবদিহি। ওই দিন হামাসের হামলায় ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মানুষ নিহত হন। বিরোধী দলগুলো জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে নেতানিয়াহুর সরকার এমন তদন্তের বিরোধিতা করে আসছে।
দক্ষিণ ইসরায়েলের নির ওজ কিবুতজ সফরের সময় আইজেনকট বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, আজকের দিন শেষে আমরা পরিবর্তন দেখতে পাব—ইসরায়েল রাষ্ট্রে নতুন এক চেতনার সূচনা হবে। গত তিন বছর এবং সেই ভয়াবহ দিনের ঘটনাগুলোর সংশোধনে তা ভূমিকা রাখবে।’
৭ অক্টোবরের হামলায় নির ওজ কিবুতজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। আইজেনকট সেদিন হামাসের হাতে অপহৃত হয়ে গাজায় নিয়ে যাওয়া ২৫১ জনের একজন গাদি মোজেসের সঙ্গে হেঁটে ভোটকেন্দ্রে যান। আইজেনকটের মতে, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ব্যর্থ হয়েছে, কারণ হামাস এখনো গাজায় ক্ষমতায় রয়েছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ওই যুদ্ধে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। সরকার গঠনের ১৮ মাসের মধ্যে গাজায় হামাসের সামরিক ও শাসনক্ষমতা ভেঙে দেওয়া বা ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতি আবারও দিয়েছেন আইজেনকট।
নির্বাচনের দিন প্রথম প্রকাশ্য মন্তব্যে নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ভোট কেনার চেষ্টার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশের দেওয়া তথ্যসংবলিত একটি প্রতিবেদন শেয়ার করেন। তিনি বলেন, ‘ডানপন্থি ভোটাররা, প্রিয় লিকুদ সমর্থকেরা, নির্বাচনের স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টার মুখে আমাদের ব্যাপকভাবে ভোট দিতে বের হতে হবে। দেশের স্বার্থে লিকুদকে ভোট দিন।’
নেতানিয়াহুর সমালোচকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, প্রধানমন্ত্রী ভোট গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ তৈরির চেষ্টা করতে পারেন। তবে তার কার্যালয় এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
নেতানিয়াহুর জোটের উগ্র ডানপন্থি দলের নেতা ইতামার বেন-গভির অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিরিয়াত আরবা বসতিতে মঙ্গলবার সকালে ভোট দেন। তিনি পূর্বাভাস দিয়েছেন, নেতানিয়াহু আবারও প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং তাঁর দল সরকারে ডানপন্থিদের প্রধান শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখবে।
আরব ভোটারদের উপস্থিতিও হতে পারে নির্ধারক
ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘু ভোটাররাও ‘নজিরবিহীন’ সংখ্যায় ভোট দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রার্থী আহমেদ তিবি। তাঁরা নাগরিকত্বের দিক থেকে ইসরায়েলি হলেও তাঁদের পারিবারিক ও জাতিগত পরিচয় ফিলিস্তিনি।
আইজেনকট আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তাঁর যুক্তি, এসব দলের সঙ্গে মূল্যবোধের মিল নেই। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আরব দলগুলো সংখ্যালঘু সরকারকে সমর্থন দিতে পারে।
শালোম হার্টম্যান ইনস্টিটিউটের ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোৎস আসা-এল বলেন, ‘আমার প্রত্যাশা, যেকোনো পক্ষই সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে। বড় ধরনের কোনো জয় হবে না।’
যুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
৭ অক্টোবরের হামলার পর নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন আইজেনকট। তবে আট মাস পর নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের সমালোচনা করে তিনি পদত্যাগ করেন। হামলার পর শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে গাজার বড় একটি অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এক বছর আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও বর্তমানে গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইসরায়েলের দখলে রয়েছে।
লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর ওপরও বড় ধরনের আঘাত হেনেছে ইসরায়েল। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়িয়েছে দেশটি। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ১২ দিনের বিমান অভিযান চালানো হয়। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়।
ইসরায়েলের প্রায় সব ইহুদি-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলের মতো আইজেনকটও ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কয়েক দশক ধরে চলা শান্তি আলোচনার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধী।
তবে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার সমালোচনা করেছেন তিনি। ২০২৩ সালের পর এ ধরনের সহিংসতা বেড়েছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কেও চাপ সৃষ্টি করেছে। নেতানিয়াহুর জোটের উগ্র ডানপন্থি শরিকদেরও বিরোধিতা করেন আইজেনকট।