ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান জেন-জি আন্দোলন © টিডিসি সম্পাদিত
জীবনযাত্রার নজিরবিহীন ব্যয় বৃদ্ধি, তীব্র আবাসন সংকট, শিক্ষা খাতে বাজেট ছাঁটাই এবং জনকল্যাণ বাদ দিয়ে সামরিক খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রতিবাদে ইউরোপের রাজপথে নেমেছে তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’। ফ্রান্সের ঐতিহাসিক টাউন হলে অগ্নিসংযোগ, ইতালির রাস্তায় সেনা মোতায়েন কিংবা আলবেনিয়ার টিয়ার গ্যাস সবখানেই এখন তরুণদের এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে, যা ইতোমধ্যে ‘১৭ অক্টোবরের আন্দোলন’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
দেশভেদে আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও ইউরোপের তরুণ সমাজের গভীরে এই শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, তাদের মা-বাবার প্রজন্ম যে ধরনের সামাজিক সুরক্ষা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছিল, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তারা তার ছিটেফোঁটাও পাবে না।
প্যারিসের উপশহর থেকে দাবানল
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের শিল্পাঞ্চলীয় উপশহর ক্রেতেইয়ের একটি সাধারণ উচ্চবিদ্যালয় থেকে এই ক্ষোভের সূত্রপাত। জরাজীর্ণ ক্লাসরুম, তীব্র শিক্ষক সংকট এবং দীর্ঘ শিফটের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা প্রথম ক্লাস বর্জন করে রাজপথে নামে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলন বড় বিশ্ববিদ্যালয়, সাধারণ চাকরিজীবী এবং বড় ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মহাড়ম্বরে রূপ নেয়।

শনিবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্যারিস, মার্সেই, লিয়ঁ ও লিমোজসহ দেশের প্রধান শহরগুলোতে ৪ লাখ ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়েছেন। কেবল প্যারিসেই ১ লাখ ১০ হাজার তরুণ ‘প্লাস দে লা রিপাবলিক’ চত্বরে জড়ো হয়ে সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন। বিকেল গড়াতেই লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফরাসি দাঙ্গা পুলিশ জলকামান, টিয়ার গ্যাস ও প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বিক্ষোভের সহিংস রূপ নেওয়ার পর তীব্র ভাষায় অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের প্রজাতন্ত্রে সহিংসতার কোনো স্থান নেই।
ফরাসি শিক্ষার্থী ইউনিয়ন (ইউএনইএফ)-এর সহসভাপতি অ্যালিস দে ব্রিতো এই বৈশ্বিক সংহতির বিষয়ে বলেছেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে পার্থক্যের চেয়ে আদর্শিক মিল বেশি। সব দেশের তরুণরাই শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ও সামগ্রিক যুবকল্যাণে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির দাবি তুলছেন, যার সাথে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সাশ্রয়ী আবাসনের প্রশ্নটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
মিলানে সেনা টহল, রোমে সংঘাত এবং মেলোনির হুংকার
ফ্রান্সের সীমান্ত পেরিয়ে এই আঁচ তীব্রভাবে লেগেছে ইতালিতেও। দেশটির ফ্যাশন ও অর্থনৈতিক রাজধানী মিলান, ঐতিহাসিক রোম এবং তুরিনের প্রধান শহরগুলো এখন ক্ষুব্ধ জেন-জি’দের দখলে। উগ্র-ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারের নেওয়া নতুন অর্থনৈতিক ও সামরিক নীতির বিরুদ্ধে নাগরিক ও ছাত্র সমাজ একাট্টা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ জনকল্যাণ বাদ দিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ ও ন্যাটোর সামরিক খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তরুণদের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মিলান শহরে পুলিশের পাশাপাশি ৫০০ জন অতিরিক্ত সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি মিলান ও বোলোগনার সহিংস ঘটনার পর কঠোর সতর্কবার্তা জারি করে জানিয়েছেন, বিক্ষোভ করা একটি অধিকার, কিন্তু আমাদের শহরগুলোতে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই অধিকার হতে পারে না। দুষ্কৃতিকারীরা পুরো আন্দোলনকে জিম্মি করতে এই বিশৃঙ্খলাকে ব্যবহার করেছে।
ইতালির শিক্ষার্থী ইউনিয়নের শীর্ষ নেতা সাবরিনা ব্রিজোলাও এক সমাবেশে বলেছেন, এমন নিরাপদ শিক্ষাঙ্গণ গড়ে তুলতে হবে যা শিক্ষার্থীদের মাথার ওপর ধসে পড়বে না। এর পাশাপাশি মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, মানসম্মত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং সামগ্রিক সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে আমাদের কণ্ঠ জোরালো করতে হবে।
ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা অবশ্য ফ্রান্সের সঙ্গে ইতালির পরিস্থিতির তুলনা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, ইতালির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ফ্রান্সের মতো নয়।
‘ফ্ল্যামিঙ্গো রেভল্যুশন’ ও সার্বিয়া
ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের বাইরে বলকান অঞ্চলের দেশ আলবেনিয়ার আন্দোলন রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। যা ‘ফ্ল্যামিঙ্গো রেভল্যুশন’ নামে পরিচিত। দেশটির রাজধানী তিরানার প্রধান প্রশাসনিক ভবনের সামনে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অবস্থান নিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের একটি বিলাসবহুল রিয়েল এস্টেট প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের উচ্ছেদ প্রক্রিয়া এই ক্ষোভের প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
ব্যাপক বিক্ষোভ ও আলবেনীয় পুলিশের তথ্যমতে, সহস্রাধিক গ্রেপ্তারের ঘটনার পরও দেশটির প্রধানমন্ত্রী এদি রামা পদত্যাগের দাবি নাকচ করে উল্টো অভিযোগ করেছেন, আন্দোলনকারীরা মূলত দেশটির ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছেন।
একই ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছে প্রতিবেশী দেশ সার্বিয়াতেও। রাজধানী বেলগ্রেডে সম্প্রতি একটি রেলওয়ে দুর্ঘটনা ও সাধারণ মানুষের মৃত্যুর পেছনে সরকারের দুর্নীতিকে দায়ী করে রাস্তায় নেমেছে জেন-জির তরুণেরা।
স্পেন ও পর্তুগালে আবাসন সংকটের বিস্ফোরণ
আইবেরিয়ান উপদ্বীপের দুই দেশ স্পেন ও পর্তুগালের জেন-জি তরুণদের ক্ষোভের মূল কেন্দ্রে রয়েছে আবাসন খাতের তীব্র সংকট ও আকাশচুম্বী বাড়ি ভাড়া। স্পেনের মাদ্রিদ ও বার্সেলোনায় পরিস্থিতি চরমে পৌঁছেছে। সম্প্রতি মাদ্রিদের রেতিরো এলাকায় দীর্ঘ ৭১ বছর ধরে বসবাসকারী ৮৭ বছর বয়সী বৃদ্ধা মারিক্যারমেন আবাসকালকে জোরপূর্বক বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার ঘটনাটি তরুণদের হৃদয় নাড়া দেয়, যা পরবর্তীতে তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বড় ট্র্যাজেডিতে রূপ নেয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বাধ্য হয়ে দেশটিতে আগাম সাধারণ নির্বাচনের ডাক দিয়েছেন। একই চিত্র পর্তুগালের রাজধানী লিসবনেও। বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের কারণে বাড়ি ভাড়া ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় তরুণদের স্লোগান ‘আমরা কাজ করি, কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাঁই পাই না।’
কেন ক্ষুব্ধ জেন-জি?
আন্তর্জাতিক সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া এই ‘জেন-জি’ বা জেনারেশন জি প্রজন্ম প্রথাগত নিয়মের বেড়াজালে বন্দি থাকতে নারাজ। ইউরোপের একাধিক গবেষণা ও জরিপে দেখা গেছে, এই তরুণদের প্রায় ৮০ শতাংশই মনে করেন যে তাদের বাবা-মা বা পূর্ববর্তী প্রজন্ম যে ধরনের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সচ্ছলতা ভোগ করেছেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তারা তা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তরুণদের প্রধান উদ্বেগ হলো অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রার ব্যয় এবং আয়ের সঙ্গে খরচের বিশাল অসঙ্গতি। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে ইউরোপের জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের বাজারে যে মূল্যস্ফীতি ঘটেছে, তার চূড়ান্ত মাশুল দিচ্ছে এই তরুণেো।

একদিকে কর্মসংস্থানের বাজারে চরম অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা কমে যাওয়া জেন-জিকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার করে তারা খুব দ্রুত এক দেশের আন্দোলনের বার্তা অন্য দেশের তরুণদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। যেমন জার্মানির তরুণদের সংগঠন ‘জেন জেড রেগেল্ট’ ইতোমধ্যে ফ্রান্সের আন্দোলনের মতো আগামী ৩১ অক্টোবর দেশের ২১টি প্রধান শহরে একযোগে বড় ধরনের শিক্ষা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।
সংকটের গভীরে অর্থনৈতিক সমীকরণ
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে গভীর সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট। ইউরোজোনে ২০২৬ সালের গড় মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছানোর পূর্বাভাস থাকলেও সাধারণ মানুষের বাস্তব মজুরি স্থবির হয়ে আছে। অস্ট্রিয়া, গ্রিস ও জার্মানির প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর লিফলেটে স্পষ্ট লেখা রয়েছে ‘আমাদের ক্লাসরুমের টেবিল ভাঙা, কিন্তু আপনাদের কামানের গোলা নতুন এই বৈষম্য আমরা মানব না।’
আরও পড়ুন: স্বামীর ভালোবাসার আলিঙ্গনে পাঁজরের ৫ হাড় ভেঙে হাসপাতালে স্ত্রী, ভিডিও ভাইরাল
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশের সরকারগুলো যদি এখনই তাদের অভ্যন্তরীণ বাজেট নীতিতে জনকল্যাণকে অগ্রাধিকার না দেয় এবং আবাসন ও শিক্ষা খাতের সংকট দূর করতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ না নেয়, তবে জেন-জিদের এই গর্জন ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্তিত্বের ভিত্তিকে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিতে পারে।
ইউরোপের রাজনীতিতে কী হবে?
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের এই রাজপথের আগুন কেবল সাময়িক কোনো আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়, এটি মহাদেশটির সামগ্রিক রাজনৈতিক ভূ-চিত্র বদলে দেওয়ার পূর্বাভাস। প্রচলিত ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর তরুণদের আস্থা এখন তলানিতে। তারা দেখছে ডানপন্থী বা বামপন্থী, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন! সাধারণ জনগণের মৌলিক সংকটগুলোর কোনো টেকসই সমাধান হচ্ছে না।
এই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষোভ ও হতাক্ষাকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপের রাজনীতিতে উগ্র-ডানপন্থী বা উগ্র-বামপন্থী জনতুষ্টিবাদী দলগুলোর উত্থান আরও সহজ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশের সরকারগুলো যদি এখনই তাদের অভ্যন্তরীণ বাজেট নীতিতে জনকল্যাণকে অগ্রাধিকার না দেয় এবং আবাসন ও শিক্ষা খাতের সংকট দূর করতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ না নেয়, তবে জেন-জিদের এই গর্জন ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্তিত্বের ভিত্তিকে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিতে পারে।
ইউরোপের রাজপথ আজ অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সমীকরণ কেবল খাতার পাতায় রাখলে চলবে না, তার সুফল সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনেও দৃশ্যমান হতে হবে।
সূত্র: রয়টার্স ও বিবিসি