‘বাজারের আগুনে’ পুড়ছে ঢাবির আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরাও

  © টিডিসি ফটো

রমজান মাসকে ঘিরে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের ব্যয় লাগামে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কেননা রমজান উপলক্ষে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় খাবারের দাম বেড়ে যায় হলের ক্যান্টিন-খাবার দোকানে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রথম সেহেরিতে ক্যান্টিনে খেতে গিয়েই দুশ্চিন্তায় শিক্ষার্থীদের কপালের ভাঁজ হয়েছে দ্বিগুণ। 

ঢাবির হলের ক্যান্টিন-খাবার দোকানে হঠাৎ করে ক্যান্টিন-খাবার দোকানে খাবারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, দাম বাড়ার সঙ্গে মান বাড়ার কথা থাকলেও উল্টো কমেছে খাবারের মান। বর্তমানে প্রতিটি খাবারের মূল্য তালিকায় ২০ থেকে ৩০ টাকা করে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অনেকটা বিপাকেই পড়েছেন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, মাস্টার দা সূর্য সেন হল, কবি জসীম উদ্দিন হল, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, এফ রহমান হলসহ প্রায় সকল হলের ক্যান্টিনের মূল্য তালিকায় চোখ বুলালে দেখা যায়, প্রায় সব খাবারের দাম আগের থেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। তবে দাম বৃদ্ধি পেলেও বাড়েনি খাবারের মান। শিক্ষার্থীদের ধারণা ছিলো খাবারের দাম প্রতি বছরের ন্যায় বাড়লেও হয়তো খাবারের মানটা বৃদ্ধি পেতে পারে। কিন্তু সেখানে কোন পরিবর্তন দেখতে পাওয়া যায়নি। 

শিক্ষার্থীরা জানান, সেহেরিতে কম মানসম্মত খাবার খেলে সারাদিন খুব কষ্টে কাটে। আবার ভালো খাবার খেতে চাইলে পকেটের বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়। রমজানের আগেই যেখানে শিক্ষার্থীদের তিন বেলা খেতে পারতো না খরচের জন্য, সেখানে অত্যাধিক দাম বাড়ায় আরো হতাশায় ভুগছেন এসব শিক্ষার্থীরা। আবার প্যাকেজের নামে শিক্ষার্থীদের পকেট কাটা হচ্ছে বলেও দাবি একাধিক শিক্ষার্থীর।

তবে অধিকাংশ ক্যান্টিন ও দোকান মালিকরা বলেন,  জিনিস পত্রের দাম বেড়েছে, তাই খাবারের মূল্যও বেড়েছে।  তাছাড়া রোজা-রমজান মাস,ভাল মন্দ তো খাওয়া উচিত। ভালো খাবার দিচ্ছি এজন্যই দাম কিছুটা বাড়তি যাচ্ছে। তাছাড়া হলের প্রাধ্যাক্ষগণ এ বিষয়ে অবহিত বলেও দাবি করেছেন ক্যান্টিন মালিকরা।

হলগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, আগে যেমন দুই পিস গরুর বা খাসির গোশত ৬০ টাকায় বিক্রি হতো এখন সেই সমপরিমাণ গরুর দাম ৮০-৯০ টাকা। ছোট এক পিস মুরগীর গোশত ৪০-৪৫ টাকায় বিক্রি হতো সেই এক পিস মুরগী বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ টাকায়। রুই বা পাবদা মাছ ক্যান্টিন ভেদে ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন সেটা ৬০-৬৫ টাকা। মধ্যবিত্তদের শেষ খাবার ডিম রাখা হচ্ছে না অধিকাংশ ক্যান্টিনে। ফলে বাধ্য হয়েই বেশি দাম দিয়ে নিন্ম মানের খাবার গ্রহণ করছে শিক্ষার্থীরা। ফলে পকেট ফাকা হলেও যথেষ্ট পুষ্টিগুণ পাচ্ছে না তারা।

মুক্তিযোদ্ধা জিয়া হলের শিক্ষার্থী সাইদুর চৌধুরী ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, হলের  ক্যান্টিনে সন্ধ্যায় যে মুরগী ৪৫ টাকায় খেলাম সেহরীতে সেটাই ৭০ টাকা। যে গরুর মাংস খেলাম ৫০ টাকা, তা সেহরীতে ৮০ টাকায় পৌঁছালো। যে মাছ ৩৫-৪০ টাকা তাও দেখি ৬৫ টাকা হয়ে গেলো!

জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থী কামরুল হাসান শুভ বলেন, রমজান উপলক্ষে হল ক্যান্টিনের প্রতিটা খাবারের দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা বেড়েছে। মানবতা আজ কোথায়!

ঢাবি নিরাপত্তা মঞ্চের প্রধান জুলিয়াস সিজার বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে খাবারের দাম রমজানে এতোটাই বেড়েছে সিংহভাগ শিক্ষার্থীর পক্ষে একটা টিউশনি করে চলা অসম্ভব৷ যাদের কোন আয়ই নাই, তাদের কথা আর কি বলব! বেঁচে থাকাটাই একমাত্ৰ সংবাদ৷

ঢাবি শিক্ষার্থী সংসদ নামে ফেসবুবের গ্রুপে এক শিক্ষার্থী লিখেন, হলগুলোতে খাবারের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি কি কারো নজরে পড়ছে না? কেউ নেই যে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে? তারা কি জানে না যে বিশ্ববিদ্যালয়ে লাখপতির ছেলে মেয়ের থেকে দিন মজুরের ছেলেমেয়ে বেশি? বাসা থেকে টাকা আনার থেকে টিউশন করে বাসায় টাকা পাঠানো ছেলে পেলের সংখ্যা বেশি? তাহলে, তারা বাসায় টাকা পাঠানো তো দূরে থাক, নিজেরা খাবে কি করে? চলবে কি করে? যত দিন যাচ্ছে, পরিস্থিতি কেমন যেনো অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে।

শুধু এই কয়েকজন না, কথাগুলো পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীদের মুখের কথা। কিন্তু কেউ বলতে পারছে, কেউ বা ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখছে। হল প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েও ফায়দা হচ্ছে না। গত রমযানে হল প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করা হলে প্রতি খাবারের দাম ৫ টাকা করে কমিয়ে দিলেও সেটাও সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার উর্ধ্বে ছিলো। ফলে এবারও যে খাবারের দাম কমবে সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দিহান হলের শিক্ষার্থীরা।

দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে জিয়া হলের ক্যান্টিন মালিক তাওহিদুল ইসলাম বলেন, দেখুন, আগে যেই মুরগী ১৩০ টাকা কেজি কিনতাম এখন সেটা ২৭০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। তাছাড়া আমরা খাবারের মান বাড়িয়েই খাবারের দাম বাড়িয়েছি। এ ব্যাপারে আমরা হল প্রশাসনের সাথেও কথা বলেছি।

প্যাকেজ তুলে দেয়া প্রসঙ্গে তিনি জানান, আমরা ভর্তা-ভাজির টাকা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাই না। তাই আমরা প্যাকেজের সিস্টেম চালু করেছি। হল প্রশাসন তুলে দিতে বললে আমরা তুলে দিবো।

হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের ক্যান্টিন ব্যবস্থাপক আলমগীর বলেন, বাজারের দামের সঙ্গে মিল রেখেই দাম বাড়ানো হয়েছে। তাছাড়া খাবারের মান বৃদ্ধি করায় দামটা বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের থেকে বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে না।

খাবারের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে জহুরুল হক হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুর রহিম বলেন, দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সবকিছুর দাম বেড়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কিছুই করার নেই। তবে ক্যান্টিন মালিকরা আমাকে বলেছিলো মান বৃদ্ধি করে খাবারের দাম কিছুটা বাড়ানো হবে। সেজন্য আমি তাদের অনুমতি দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা যদি মান বৃদ্ধি না করেই দাম বাড়ায় তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এসময় তিনি ক্যান্টিনগুলোতে সরজমিনে ঘুরে দাম কমানোর ব্যবস্থা করবেন বলে আশ্বাস প্রদান করেন।

সূর্যসেন হলের প্রাধ্যাক্ষ অধ্যাপক মকবুল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, আমি ব্যাপারটা অনেকের কাছেই শুনেছি যে ক্যান্টিন মালিকরা খাবারের দাম বাড়িয়েছে। আজকে সন্ধ্যায় সবার সাথে আলোচনায় বসে খাবারের দাম নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করবো যেনো মালিকরাও ক্ষতির সম্মুখীন না হয় এবং শিক্ষার্থীরাও কম দামে ভালো খাবার খেতে পারে।

হলগুলোর ক্যান্টিন প্রশাসনিক আওয়ায় এনে ভর্তুকি দেয়া হবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো আখতারুজ্জামান বলছেন, না আমাদের এমন কোন পরিকল্পনা নেই। অনেক বাজেটের প্রয়োজন এতে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় আসলে এত বেশি বাজেট পায় না। বাজেট যদি বৃদ্ধি করা হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।  আবার আশার দিক হলো আময়াদের ক্যাম্পাসে অনেক অনুদানমূলক সংগঠনের সৃষ্টি হচ্ছে এবং দিন দিন সেটা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে তাদের আর্থিক সাহায্যের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।


সর্বশেষ সংবাদ