দিনাজপুর জেলার জনপ্রিয় ৫টি দর্শনীয় স্থান

নয়াবাদ মসজিদ
নয়াবাদ মসজিদ  © ইউএনবি

দিনাজপুর জেলা বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর স্থান। প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দী পুরনো এই জেলা ১৭৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি ঢাকার উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ৪১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। একসময় এটি প্রাচীন বাংলার রাজ্য 'দিনরাজপুর'-এর অন্তর্গত ছিল। দিনাজপুরের প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে রয়েছে ইতিহাসের অম্লান স্মৃতি, যা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের মুগ্ধ করে।

বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের গৌরবময় ও ঐতিহ্যবাহী জেলা দিনাজপুর, যার প্রতি কোণায় লুকিয়ে রয়েছে ইতিহাসের অম্লান স্মৃতি। প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দী পুরনো এই জেলা ১৭৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এর রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ৪১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। একসময় প্রাচীন বাংলার রাজ্য 'দিনরাজপুর' ছিল এই অঞ্চলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দিনাজপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থান ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সবার মন কেড়ে নেয়। 

দিনাজপুর ভ্রমণ গাইডলাইন:

দিনাজপুর জেলার ভ্রমণে যাওয়ার বিভিন্ন উপায় রয়েছে। ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন অথবা আকাশপথে দিনাজপুর পৌঁছানো সম্ভব। বাসে গাবতলী বা চন্দ্রাসহ ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে যাত্রা করা যায়, এবং টিকিটের মূল্য স্থান ও মানভেদে ৬০০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে হতে পারে। এছাড়া কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে যাতায়াতও বেশ সহজ। আকাশপথে যেতে হলে হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সৈয়দপুর বিমানবন্দর পৌঁছাতে হবে, তারপর বাস বা অন্যান্য যানবাহনের মাধ্যমে দিনাজপুর শহরে পৌঁছানো যাবে।

চলুন, এক নজরে জানি দিনাজপুরের পাঁচটি দর্শনীয় স্থান, যা আপনাকে এক অদ্বিতীয় অভিজ্ঞতা প্রদান করবে।

১. কান্তজীর মন্দির:

কান্তজীর মন্দির বা কান্তজিউ মন্দির, দিনাজপুর জেলার অন্যতম গৌরবময় ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ টেরাকোটা শিল্পের নিদর্শন। মন্দিরটি দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার উত্তরে ঢেপা নদীর তীরে অবস্থিত। মহারাজা প্রাণনাথ রায় ১৭০৪ সালে এই মন্দিরের নির্মাণ শুরু করেছিলেন এবং এটি সম্পূর্ণ হয় ১৭৫২ সালে তাঁর পুত্র রাজা রামনাথ রায়ের সময়ে। মন্দিরের নবরত্ন বা ‘নয় শিখর’ ছিল, যা ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যায়। মন্দিরের চারপাশে বর্ণাঢ্য পোড়ামাটির অলঙ্করণে মহাভারত, রামায়ণ এবং বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীর গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর দেয়ালে প্রায় ১৫ হাজার টেরাকোটা ফলক রয়েছে, যা মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে। প্রতিদিন হাজারও দেশী-বিদেশী পর্যটক এই দর্শনীয় স্থানটি পরিদর্শন করতে আসেন।

যাওয়ার উপায়:
দিনাজপুর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল বা কলেজ মোড় থেকে সরাসরি বাসে কাহারোল উপজেলার কান্তনগর মোড়ে যেতে হবে। এরপর ব্যাটারীচালিত অটো বা ভ্যানের মাধ্যমে মাত্র ৫-৭ মিনিটে কান্তজীর মন্দিরে পৌঁছানো যাবে।

২. রামসাগর দিঘি:

রামসাগর দিঘি, দিনাজপুর জেলার একটি প্রাচীন কৃত্রিম জলাশয়, যা রাজা রামনাথের নামানুসারে তৈরি হয়েছে। পলাশীর যুদ্ধের পূর্বে রাজ্যবাসীর পানির চাহিদা পূরণের জন্য রাজা রামনাথ এই দিঘিটি খনন করেছিলেন। প্রায় ১০ মিটার গভীরতা ও ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৪৯২ বর্গমিটার আয়তনের এই দিঘির চারপাশে বিভিন্ন জাতের বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে, যা এর সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করেছে। দর্শনার্থীরা এখানে এসে প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটাতে অনেকটাই আরাম ও প্রশান্তি অনুভব করেন।

যাওয়ার উপায়:
কলেজ মোড় বা শহরের যেকোনো স্থান থেকে ইজি বাইকের মাধ্যমে মাত্র ৩০-৫০ টাকায় রামসাগর দিঘিতে পৌঁছানো যায়।

৩. নয়াবাদ মসজিদ:

দিনাজপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ২১ কিলোমিটার উত্তরে ঢেপা নদীর তীরে অবস্থিত নয়াবাদ মসজিদ, একটি ঐতিহাসিক মসজিদ যা ১৭৯৩ সালে সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের শাসনামলে নির্মিত হয়। মসজিদটি ইট, টেরাকোটা ও টাইল দিয়ে নির্মিত এবং এতে রয়েছে একাধিক গম্বুজ, তিনটি দরজা ও একাধিক জানালা। মসজিদের পাশে কবরস্থান এবং অন্য একটি কবরও রয়েছে। এই মসজিদটি কান্তজীর মন্দিরের নির্মাণকাজে নিয়োজিত মুসলমান স্থপতিদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। এর নকশা ও স্থাপত্যশৈলী প্রাচীন বাংলার ইসলামী স্থাপত্যের একটি অসামান্য উদাহরণ।

যাওয়ার উপায়:
দিনাজপুর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল বা কলেজ মোড় থেকে সরাসরি বাসে কান্তনগর মোড়ে যেতে হবে, তারপর ১০-১৫ মিনিটে ব্যাটারীচালিত অটো বা ভ্যানের মাধ্যমে পৌঁছানো যাবে নয়াবাদ মসজিদে।

৪. দিনাজপুর রাজবাড়ী:

দিনাজপুর রাজবাড়ী, জেলার ঐতিহ্যের এক অমূল্য রত্ন। এটি রাজা দিনরাজ ঘোষ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, তবে অনেকের মতে পঞ্চদশ শতকের প্রথমার্ধে রাজা গণেশ এই রাজবাড়ীর স্থপতি ছিলেন। দিনরাজ ঘোষ গৌড়েশ্বর গণেশনারায়ণের (১৪১৪-১৪১৮ খ্রি:) অন্যতম রাজকর্মচারী ছিলেন। রাজবাড়ীটি দিনাজপুরের নামকরণের সঙ্গেও অগাধ সম্পর্কিত। রাজবাড়ীতে রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা যেমন কুমার মহল, আয়না মহল, রানী মহল, লক্ষ্মীর ঘর, আটচালা ঘর, ঠাকুর ঘর, কালিয়া জিউ মন্দির, আতুর ঘর, রানী পুকুর ও চম্পা তলা দীঘি। যদিও বর্তমানে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রাজবাড়ীটি কিছুটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে, তবুও এটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বজায় রেখেছে।

যাওয়ার উপায়:
শহরের যেকোনো জায়গা থেকে ইজিবাইক বা ভ্যানের মাধ্যমে রাজবাড়ী সহজেই পৌঁছানো যায়।

৫. সিংড়া জাতীয় উদ্যান:

সিংড়া জাতীয় উদ্যান, দিনাজপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে বীরগঞ্জ উপজেলার ভোগনগর ইউনিয়নে অবস্থিত একটি অপূর্ব শালবন। এই বনটি ৩৫৫ হেক্টর আয়তনের, যার মধ্যে ৩০৫.৬৯ হেক্টর সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর বনবিভাগ এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। সিংড়া জাতীয় উদ্যানে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ, পাখি এবং বন্যপ্রাণী দেখা যায়।

শীতকালেই এই বনটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, যখন পর্যটকরা প্রকৃতির অপরূপ রূপ দেখতে এখানে ভিড় জমায়। পূর্বে এই বনে বাঘ, নীলগাই দেখা মিলতো।  বর্তমানে খরগোশ, শিয়াল, সাপ এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও পতঙ্গের দেখা মেলে।

যাওয়ার উপায়:
দিনাজপুর জেলা শহর থেকে সরাসরি বাসে বটতলী নামক স্থানে নেমে ভ্যান বা ব্যাটারীচালিত অটোতে সিংড়া জাতীয় উদ্যানে পৌঁছানো যায়। এছাড়া বীরগঞ্জ শহরে গিয়ে সেখান থেকে অটোতে যাওয়া যেতে পারে।

ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির অপূর্ব সমাহার নিয়ে দিনাজপুর যেন এক স্বপ্নের রাজ্য। এখানে ভ্রমণ করলে আপনি ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবেন, সৌন্দর্যের জালে বোনা মুহূর্তগুলোর মাঝে হারিয়ে যাবেন। শীতকালে উষ্ণ কাপড় এবং গরমের সময় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা রাখবেন। এই মহামূল্যবান অভিজ্ঞতাগুলো সংগ্রহ করতে সহজে বহনযোগ্য ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে পড়ুন, যেন কোনো ক্লান্তি বা অসুবিধা আপনাকে আপনার এই আনন্দময় সফর থেকে বিরত না করতে পারে।

দিনাজপুরে ভ্রমণ করুন, ইতিহাসের প্রতিটি কোণে নতুন এক জগৎ আবিষ্কার করুন।


সর্বশেষ সংবাদ