স্মৃতিশক্তি হারানোর আগেই সংকেত দেয় চোখ-কান? © এআই নির্মিত ছবি
চোখে ঝাপসা দেখছেন, আগের মতো কানে শুনতে পাচ্ছেন না? বয়স বেড়েছে তাই এমন পরিবর্তন হতে পারে বা সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা অনেকেরই আছে। কিন্তু গবেষণা বলছে, দৃষ্টিশক্তি ও কম শুনতে পাওয়ার সঙ্গে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। আবার হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন হতে পারে স্ট্রোকেরও সতর্কসংকেত। তাহলে চোখ ও কানের কোন লক্ষণগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন, আর কখনই বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
চোখের পরিবর্তনের সঙ্গে মস্তিষ্কের সম্পর্ক কী:
আমাদের চোখের পেছনের অংশে থাকা রেটিনা আলো থেকে পাওয়া সংকেত সোজা মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়। চিকিৎসকদের মতে, আলঝেইমার বা স্মৃতিভ্রমের শিকার ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের পাশাপাশি রেটিনাতেও কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এজিংয়ের অর্থায়নে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, রেটিনার কোষ ও মস্তিষ্কের টিস্যুর পরিবর্তনের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট মিল রয়েছে। তবে এর মানে এই নয় যে, শুধু চোখের পরীক্ষা করিয়েই আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়া নিশ্চিত করে ফেলা সম্ভব। এ বিষয়ে চিকিৎসকরা আরও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সাধারণত চোখে ঝাপসা দেখার পেছনে ডায়াবিটিসের মতো রোগ বড় ভূমিকা রাখে। ডায়াবিটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে চোখের ভেতরের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘ডায়াবিটিক রেটিনোপ্যাথি’ বলা হয়। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন। যদি হঠাৎ করেই দেখতে সমস্যা হয়, চারপাশ দুটো করে দেখেন, কিংবা দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি কমে যাওয়ার পাশাপাশি মাথা ঘোরে, শরীরের এক পাশ অবশ লাগে বা কথা জড়িয়ে যায় তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে হাসপাতালে যাওয়া উচিত। এগুলো স্ট্রোকের অত্যন্ত জোরালো সতর্কসংকেত।
কানে কম শোনা কি স্মৃতিশক্তি কমিয়ে দেয়?
কান আর মস্তিষ্কের সম্পর্ক নিয়ে গত কয়েক বছরে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এর ডিমেনশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিশনের প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কম শুনতে পাওয়া ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। এর পেছনের মনস্তাত্ত্বিক কারণটিও বেশ স্পষ্ট। কানে কম শুনলে মানুষ ধীরে ধীরে চারপাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলা কমিয়ে দেয়, সামাজিক অনুষ্ঠান বা জমায়েত এড়িয়ে চলে। ফলে একাকিত্ব ঘিরে ধরে এবং মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমতে থাকে, যা পরবর্তীতে স্মৃতিশক্তি কমার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, কানে কম শুনলেই কারও ডিমেনশিয়া হবে।
কখন বুঝবেন কানের পরীক্ষা করানো দরকার:
বারবার অন্যকে বলতে হচ্ছে—‘কী বললেন, আরেকবার একটু বলুন তো?’
অনেকের আড্ডায় বা কোলাহলপূর্ণ জায়গায় কথা পরিষ্কার বুঝতে না পারা।
অন্যদের তুলনায় টিভি বা মোবাইলের ভলিউম অনেক বাড়িয়ে রাখার মতো লক্ষণ দেখলে পরীক্ষা করানো বুদ্ধিমানের কাজ।
ডায়াবিটিস থাকলে কানের প্রতিও সতর্ক হন:
ডায়াবিটিসের কথা উঠলেই আমাদের মাথায় সাধারণত কিডনি বা চোখের কথা আসে। কিন্তু এটি কানের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ডায়াবিটিস নেই এমন মানুষের তুলনায় ডায়াবিটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কানে কম শোনার সমস্যা প্রায় দ্বিগুণ দেখা যায়। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে কানের ভেতরের অতিসূক্ষ্ম রক্তনালি ও স্নায়ুগুলো নষ্ট হয়ে যায়।
এছাড়া অনেকের কানে শোঁ শোঁ শব্দ হয় কিংবা মাথা ঘোরে। এগুলোর পেছনে নানা সাধারণ কারণ থাকতে পারে। তাই এসবে ঘাবড়ে না গিয়ে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কোন লক্ষণ দেখলে দ্রত চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন:
হঠাৎ করে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া বা ঝাপসা হয়ে যাওয়, মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, হাত বা পা হঠাৎ দুর্বল মনে হওয়া, কথা বলতে গিয়ে আটকে যাওয়া বা জড়িয়ে যাওয়া, হঠাৎ শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়া, এই লক্ষণগুলো কিছুক্ষণ পর নিজে নিজেই ঠিক হয়ে গেলেও ঝুঁকি নেবেন না।