স্বামী ও সন্তানের সঙ্গে আফরিনা আনসারী তুলী © টিডিসি সম্পাদিত
১৮’শ বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আফরিনা আনসারী তুলী। সংসার ও সন্তান সামলে বিজেএসের প্রস্তুতি নেওয়া ছিল খুবই চ্যালেঞ্জিং। সব বাঁধা পেরিয়ে তার বিচারক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের গল্প শুনেছেন—মুহম্মদ সজীব প্রধান।
আফরিনা আনসারী তুলী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন— ৫৫ একর থেকে প্রথম নারী বিচারক হওয়ার অনুভূতি আসলে ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। মহান আল্লাহ আমাকে বিচারক হিসেবে কবুল করেছেন— এ জন্য লাখো-কোটি শুকরিয়া। একজন মানুষ যখন দীর্ঘদিন কোনো স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে যায়, তখন সেই স্বপ্ন পূরণের মুহূর্তের অনুভূতি সত্যিই অন্যরকম। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে এই জায়গায় পৌঁছানোর পথটা মোটেও সহজ ছিল না। এই সফলতার পেছনে আমার একার পরিশ্রম নয়, বরং আমার পরিবারের প্রত্যেকটি মানুষের ত্যাগ, ভালোবাসা, সহযোগিতা এবং আমার প্রতি অগাধ বিশ্বাস জড়িয়ে আছে।
আমার পুরো জার্নিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল সন্তানকে সামলে পড়াশোনা করা। আমার বাচ্চা ছোট থাকায় নিয়মিত দীর্ঘ সময় ধরে পড়ার সুযোগ পেতাম না। বাচ্চা যখন ঘুমাত, তখন পড়তাম। কখনো পরিবারের কেউ বাচ্চাকে দেখাশোনা করলে সেই সময়টুকু কাজে লাগিয়ে পড়াশোনা করতাম। অনেক সময় হয়তো মনে হয়েছে, অন্যরা যেখানে একটানা কয়েক ঘণ্টা পড়তে পারছে, সেখানে আমি সেই সুযোগটুকুও পাচ্ছি না। কিন্তু নিজের পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে নিতে চাইনি। যতটুকু সময় পেয়েছি, সেটুকুই কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি।
এখানে আমার পরিবারের অবদান সবচেয়ে বেশি। আমার বোনের কথা বিশেষভাবে বলতে চাই। সে সরকারি চাকরি করে। অফিস থেকে ফিরে সাধারণত একজন মানুষের বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সে অনেক সময় নিজের বিশ্রামের কথা না ভেবে আমার বাচ্চাকে দেখেছে, যাতে আমি পড়তে পারি। আমার পরিবারের প্রত্যেকটা মানুষ তাদের জায়গা থেকে যেভাবে পেরেছে, আমার বাচ্চাকে সময় দিয়েছে। তাদের এই সহযোগিতার কারণে আমি পড়াশোনার জন্য কিছুটা হলেও নিরবচ্ছিন্ন সময় পেয়েছি। সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল—তারা আমাকে বিশ্বাস করত। তারা বিশ্বাস করত, আমি পারব। এই বিশ্বাসটা আমার জন্য অনেক বড় শক্তি ছিল।
যখন কোনো পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাইনি, যখন প্রস্তুতি নিয়ে হতাশ হয়েছি, তখনও পরিবারের মানুষগুলো আমার ওপর থেকে বিশ্বাস হারায়নি। তাদের সেই বিশ্বাস ও আমার প্রতি ভরসাই আমার অনুপ্রেরণা এবং সাহসের বড় উৎস হিসেবে কাজ করেছে।
আমার স্বামীও এই পুরো জার্নিতে আমাকে অনেক সাপোর্ট করেছে। সন্তান, সংসার ও পড়াশোনা—সবকিছু একসঙ্গে সামলে এগিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না। অনেক সময় নিজের জন্য আলাদা করে সময় বের করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু পরিবারের সহযোগিতা এবং স্বামীর সমর্থন আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
যাদের সন্তান আছে এবং যারা একই সঙ্গে পড়াশোনা করে কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের আমি বলব—আপনাদের পথ হয়তো অন্যদের তুলনায় একটু কঠিন হতে পারে। সময় কম পাওয়া যেতে পারে, অনেক বাধা আসতে পারে। কিন্তু এজন্য স্বপ্ন থেকে সরে যাওয়া যাবে না। সময়ের পরিমাণের চেয়ে সেই সময়কে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। বাচ্চা যখন ঘুমাবে, তখন হয়তো এক ঘণ্টা সময় পাওয়া যাবে; সেই এক ঘণ্টাকেই কাজে লাগাতে হবে। কষ্ট একটু বেশি হলেও লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে।
বিচারক হওয়ার স্বপ্নটা আমার বড় ভাইয়ার অনুপ্রেরণা থেকে শুরু। ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সময় ভাইয়া আমাকে বলেছিলেন, আইন নিয়ে পড়তে হবে। সেই কথাটিই আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই আমার মনে একটি স্বপ্ন তৈরি হয়—একদিন আমি বিচারকের আসনে বসব। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমাদের শিক্ষকদের কাছ থেকেও অনেক অনুপ্রেরণা পেয়েছি। পরিবার আমাকে সাহস দিয়েছে, শিক্ষকরা পথ দেখিয়েছেন এবং আমি নিজের জায়গা থেকে চেষ্টা করেছি। ধীরে ধীরে বিচারক হওয়ার স্বপ্নটা আমার কাছে শুধু একটি ক্যারিয়ার লক্ষ্য থাকেনি; এটি আমার জীবনের একটি বড় লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল। আজ যখন আল্লাহর রহমতে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, তখন মনে হচ্ছে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, পরিশ্রম, ব্যর্থতা, কষ্ট—সবকিছুরই একটা সুন্দর পরিণতি হয়েছে। মহান আল্লাহ আমার জন্য বিচারকের আসনটি মনোনীত করেছেন—এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।
আমার এই সফলতার পেছনে শুধু সফলতার গল্প নেই; ব্যর্থতার গল্পও আছে। ১৫তম বিজেএস পরীক্ষায় আমি তেমন ভালো প্রস্তুতি নিতে পারিনি। সঠিক গাইডলাইনের অভাবও ছিল। তখন বুঝতে পারিনি কীভাবে প্রস্তুতিটাকে সঠিকভাবে সাজাতে হবে। পরে সগীর স্যারের কাছ থেকে কিছুটা গাইডলাইন পেয়েছি। সেই গাইডলাইন আমার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
১৬তম বিজেএসে আমার প্রস্তুতি তুলনামূলক ভালো ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারিনি। একটা পর্যায়ে মনে হয়েছে, এত পরিশ্রম করেও যদি কাঙ্ক্ষিত ফল না আসে, তাহলে হয়তো আমার দ্বারা হবে না। কিন্তু পরে আবার নিজেকে বুঝিয়েছি—একটি পরীক্ষা ব্যর্থ হওয়া মানে স্বপ্ন ব্যর্থ হওয়া নয়।
১৭তম বিজেএসের সময় বাচ্চা ছোট থাকায় প্রায় এক বছর ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারিনি। ফলে প্রস্তুতিতে স্বাভাবিকভাবেই ঘাটতি ছিল। তবে ওই সময়টাতেও আমি চেষ্টা চালিয়ে গেছি। হাসান শাকিল ভাইয়ের কাছ থেকেও গাইডলাইন পেয়েছি। ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছি, শুধু অনেক পড়লেই হবে না; কী পড়ছি, কীভাবে পড়ছি এবং কতবার রিভিশন দিচ্ছি—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
১৮তম বিজেএসের প্রস্তুতিতে আমার সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে জেনারেল একাডেমির প্রিলি এক্সাম ব্যাচ এবং রোমান ল স্কুলের রিটেন এক্সাম ব্যাচ। এই দুটি এক্সাম ব্যাচ আমার প্রস্তুতিকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। নিয়মিত পরীক্ষা দেওয়ার ফলে নিজের প্রস্তুতির অবস্থান বুঝতে পেরেছি এবং কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, সেটিও শনাক্ত করতে পেরেছি। তাদের প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব।
আমার প্রস্তুতির অন্যতম শক্তির জায়গা ছিল সংক্ষিপ্তভাবে নোট তৈরি করা। আমি চেষ্টা করতাম বড় বড় বিষয়কে ছোট করে, নিজের মতো করে নোট করতে। এরপর সেই নোটগুলো বারবার রিভিশন দিতাম। আমার কাছে মনে হয়েছে, শুধু একবার পড়ে নতুন নতুন বিষয় পড়তে যাওয়ার চেয়ে একই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বারবার পড়া অনেক বেশি কার্যকর।
আরেকটি বিষয়কে আমি খুব গুরুত্ব দিয়েছি— পরীক্ষা দেওয়া। যেকোনো বিষয়ে যত বেশি সম্ভব পরীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। বেশি বেশি পরীক্ষা দেওয়ার কারণে শুধু জ্ঞান যাচাই হয়নি, বরং প্রশ্নের ধরন বোঝা, সময় ব্যবস্থাপনা, ভুল চিহ্নিত করা এবং পরীক্ষার হলে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার সক্ষমতাও তৈরি হয়েছে। আমার প্রস্তুতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এই পরীক্ষাগুলো বড় ভূমিকা রেখেছে।
যারা বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের প্রথমেই বলব—বিগত বছরের প্রশ্নকে খুব গুরুত্ব দিতে হবে। প্রশ্ন বিশ্লেষণ করতে হবে অনেক বেশি। কোন বিষয় থেকে বারবার প্রশ্ন এসেছে, কোন ধারাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কোন টপিকগুলো পরীক্ষায় ঘুরেফিরে আসছে—এসব বুঝতে হবে। বিগত বছরের প্রশ্নগুলো শুধু সমাধান করলেই হবে না; প্রশ্নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো নোট করতে হবে। এরপর সেগুলো বারবার রিভিশন দিতে হবে। আমি মনে করি, বিজেএস প্রস্তুতিতে বারবার রিভিশনের কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। একদিন ১০ ঘণ্টা পড়ে পরের দুই দিন না পড়ার চেয়ে প্রতিদিন নিয়মিত পড়াশোনা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যে টপিক পড়বেন, সেই টপিক-সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোও সমাধান করতে হবে। এতে পড়াটা অনেক বেশি স্থায়ী হবে এবং পরীক্ষার সঙ্গে বিষয়গুলোর সংযোগ তৈরি হবে।
ব্যর্থ হলে হতাশ হওয়া যাবে না। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, একটি পরীক্ষায় ব্যর্থতা কখনোই শেষ কথা নয়। বরং প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে বুঝতে হবে কোথায় ঘাটতি ছিল এবং পরেরবার কীভাবে সেটি পূরণ করা যায়। সবশেষে আমি বলব, পড়াশোনার পাশাপাশি সবসময় সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে হবে। মহান আল্লাহর রহমত এবং পরিবারের মানুষের দোয়া ও ভালোবাসা ছাড়া আমার পক্ষে এতদূর আসা সম্ভব হতো না। তাই কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে এবং স্বপ্নের প্রতি সৎ থাকতে হবে।
আমি মনে করি, স্বপ্ন পূরণের পথ কখনোই পুরোপুরি সহজ হয় না। কখনো সময় কম থাকবে, কখনো পারিবারিক দায়িত্ব থাকবে, কখনো ব্যর্থতা আসবে। কিন্তু আপনি যদি আপনার স্বপ্নটাকে সত্যিই বিশ্বাস করেন, তাহলে প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের জন্য পথ তৈরি করতে হবে। আমার জীবনের এই যাত্রা আমাকে অন্তত এটুকু শিখিয়েছে—পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, চেষ্টা থামিয়ে দেওয়া যাবে না। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে, নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করে যেতে হবে।