ইবিতে সাজিদ হত্যাকাণ্ড
নিহত সাজিদ © সংগৃহীত
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থী সাজিদ আবদুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে গভীর রাতে এক সন্দেহভাজন ব্যক্তির গতিবিধি নিয়ে। হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য সময়ের কাছাকাছি রাত ১টা ৪৮ মিনিটে লালন শাহ হলের সিসিটিভি ফুটেজে ওই ব্যক্তিকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। পরে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি তাকে শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও তদন্ত প্রতিবেদনে তার পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। ফলে হত্যাকাণ্ডের রাতে ওই ব্যক্তির উপস্থিতি ও পরিচয় নিয়ে নতুন করে রহস্য তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদকের কাছে আসা ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদনে এক শিক্ষার্থীকে ‘সন্দেহজনক গতিবিধি’ উল্লেখ করা হলেও কৌশলে তার নাম এবং মাঝরাতে একটি ভ্যান প্রবেশের বিষয়টিও এড়িয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাজিদের মৃত্যুর সম্ভাব্য সময়ের কাছাকাছি সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে সন্দেহজনক তৎপরতা দেখা যায়। ওই দিন দিবাগত রাত ১টা ৪৮ মিনিটের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের লালন শাহ হলের সিসিটিভি ফুটেজে একজন ছাত্রের সন্দেহজনক গতিবিধি ধরা পড়ে। পরবর্তীতে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি উক্ত ছাত্রকে শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও তদন্ত প্রতিবেদনে তার নাম উল্লেখ করেনি তদন্ত কমিটি। অন্যান্য সকল শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নাম সরাসরি উল্লেখ রয়েছে প্রতিবেদনে। বরং কোনো ‘স্পষ্ট বা সন্দেহজনক তথ্য’ না পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। তদন্তের স্বার্থে সন্দেহভাজন ব্যক্তির পরিচয় প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত। তাকে সর্বোচ্চ জিজ্ঞেসাবাদ করা গেলে হত্যার রহস্যের জট খুলতে পারে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের।
এদিকে, সাজিদের লাশ উদ্ধারের আগের রাতে (১৬ জুলাই) চারজনকে নিয়ে একটি ভ্যান ক্যাম্পাসে প্রবেশের দাবি করেছিলেন প্রধান ফটকের দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য পঙ্কজ। ভ্যানে একজন শুয়ে ছিলেন এবং বাকিরা নিজেদের শিক্ষার্থী দাবি করে অসুস্থ বন্ধুকে মেডিকেলে নেওয়ার কথা জানান। কিন্তু পরবর্তীতে পঙ্কজ একাধিকবার তার বক্তব্য পরিবর্তন করায় এবং ওই নির্দিষ্ট সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ উধাও বা না পাওয়ায় ভ্যানটি ঘিরে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে দাবি কর্তৃপক্ষের। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের সিসিটিভি ফুটেজে ওই রাতে (১৬ জুলাই রাত ১টা ১৭ মিনিট) একটি ভানে চারজনকে দক্ষিণ দিকে যেতে দেখা গেলেও, পরবর্তীতে মেইন গেট, প্রশাসন ভবন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানের ফুটেজ না মেলায় ভ্যানটির সুনির্দিষ্ট গতিপথ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে মেডিকেল বা অন্য কোনো দপ্তরে সে রাতে রোগী যাওয়ার প্রমাণ না পাওয়ায় ভ্যানের উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
গত বছরের ১৭ জুলাই সন্ধ্যা ৬টায় শাহ আজিজুর রহমান হলের পুকুর থেকে সাজিদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্ট অনুযায়ী, তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা (হমিসিডাল ইন নেচার) করা হয়েছে এবং মৃত্যুর সময় ছিল ১৬ জুলাই দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টা ৩০। এদিকে হত্যাকাণ্ডের রাতে লালন শাহ হলের ক্যামেরায় সন্দেহভাজনের মুভমেন্ট এবং পরবর্তীতে তার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ায় তদন্ত প্রতিবেদন নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন বলেন, ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির মূল উদ্দেশ্য ছিল ফ্যাক্ট ফাইন্ড করা যে সাজিদের মৃত্যু আসলে পানিতে ডুবে মারা গেছে নাকি তাকে মারা হয়েছে এটা। এবং এটা ২ টা জায়গায় প্রমাণিত হয়েছে যে এটা হত্যাকাণ্ড। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং ভিসেরা রিপোর্ট। এছাড়া আমরা আমাদের বিস্তারিত ফেইন্ডিংস সহ সম্ভাব্য সকল প্রক্রিয়া অবলম্বন করে আমরা প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এখন উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত সিআইডি করতেছে। আর লালন শাহ হলের সিসিটিভি ফুটেজে রাত ২ টার দিকে হল গেটে এক শিক্ষার্থীকে ঘুরাঘুরি করতে দেখা গেছে, তার সাথেও কথা বলেছি তেমন সন্দেহভাজন কিছু তার থেকে পাইনি।
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মহব্বত হোসেন বলেন, আমরা তদন্তের কাজে ২৭ তারিখে ক্যাম্পাসে আসতেছি আমার টিম সহ। তদন্ত চলমান অবস্থায় এ ব্যাপারে কিছু সমীচীন হবে না। গোপনীয়তা রক্ষায় চলমান তদন্তের ব্যাপারে কিছু বলা যাচ্ছে না। তদন্ত শেষে বিষয়গুলো জানতে পারবেন।
লালন শাহ্ হলের সিসিটিভি ফুটেজ সম্পর্কে জানতে চাইলে মহব্বত হোসেন বলেন, লালনশাহ হলের সিসিটিভি ফুটেজে যদি সন্দেহভাজন কেউ থেকে থাকে সেটাও আমরা খতিয়ে দেখব।