সংকট ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে ১৬ বছরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:২৯ PM , আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪৩ PM
 বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় © টিডিসি ফটো

কীর্তনখোলা নদীর তীরে, বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি)। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৫ পেরিয়ে ১৬  বছরে পা রাখছে। তবু সংকট কাটেনি বিশ্ববিদ্যালয়ের। বছর জুড়ে একের পর এক আন্দোলন-সংগ্রাম চলতে থাকে।

ইতোমধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়েছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষ মানব গড়ার কারিগর হিসেবে ইতোমধ্যে জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইতিমধ্যে স্বাক্ষর রেখে চলেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। 

ইতিহাসের বাঁকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

বরিশালবাসীর দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষার পর ২০১১ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি ভিত্তি প্রস্তর উদ্বোধনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু এই বিদ্যাপীঠের। ১৯৭৩ সালের ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান বরিশালের বেল’স পার্কের বিশাল জনসভায় ঘোষণা দেন, ঢাকার বাইরে পরবর্তী যে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হবে সেটি হবে বরিশালে।

কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু ও পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ থমকে যায়। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের ২৩ নভেম্বর বরিশাল সার্কিট হাউজে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদ সভায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গ্রহীত হয়। কিন্তু তার মৃত্যুতে এ উদ্যোগ আরেকবার থমকে যায়।
 
১৯৯৩ সালে বিএনপি সরকার পৃথক বরিশাল বিভাগ প্রতিষ্ঠা করলে, নতুন বিভাগে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। বিএম কলেজ অডিটোরিয়ামে এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস বিএম কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরের ঘোষণা দেন। এর প্রেক্ষিতে, বিএম কলেজের উচ্চমাধ্যমিক কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। কিন্তু বরাবরই বাস্তবায়নের অভাবে বরিশালের মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে।
 
এসময় আবারো ব্রজমোহন কলেজকে  বিশ্ববিদ্যালয় করার তোড়জোড় শুরু হয়। তবে, বরিশালবাসীর একাংশের দাবি ছিল স্বতন্ত্র পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের, বিএম কলেজের ঐতিহ্য নষ্ট করে নয়। বিএনপি সরকার ২০০৬ সালের “শহীদ জিয়াউর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় আইন” প্রণয়ন করে। একই বছর বিএনপি সরকার বরিশাল শহরের সন্নিকটে কড়াপুরে নবগ্রাম রোডের পাশে ডেফুলিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য স্থান নির্ধারণ করে ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। কিন্তু ক্ষমতার পট পরিবর্তনের কারণে সেই প্রচেষ্টা আর এগোয়নি।

পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আবারও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়। ২৯ নভেম্বর ২০০৮ সালে তৎকালীন ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিন সরকার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব একনেকে পাস করে, কিন্তু একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে,২০১০ সালের ১৬ জুন ‘শহীদ জিয়াউর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়’ এর পরিবর্তে ‘বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়’ সংশোধিত  আইন পাস হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কর্ণকাঠীতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। 

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ও ভর্তি শুরু হতে লেগে যায় আরও এক বছর। শুরুতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়-এর প্রকল্প পরিচালক প্রফেসর ড. মো. হারুনর রশীদ খানকে ৪ বছরের জন্য ভাইস-চ্যান্সেলর (ভিসি) পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়। ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি  শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি ৪টি অনুষদের ৬টি বিভাগের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম উদ্বোধন করলে পুরোদমে শুরু হয় একাডেমিক কার্যক্রম। ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে ১ম বর্ষ স্নাতক (সম্মান) ৬টি বিভাগে ৪০০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হওয়া ববি’তে বর্তমানে ২৫ টি বিভাগে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছেন।

কাটেনি সংকট

প্রতিষ্ঠার এক দশক পেড়িয়ে গেলেও নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। ফিজিবিলিটি টেস্টের জন্য ৩ কোটি টাকা অনুমোদন পেলেও এখনো কাজ শুরু করতে পারেনি । ফলে  দ্বিতীয় প্রকল্প  কবে পেতে পারে তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। ২৫টি বিভাগের জন্য কমপক্ষে ৭৫টি ক্লাসরুম প্রয়োজন হলেও রয়েছে মাত্র ৩৬টি। রয়েছে ছাত্র-শিক্ষকের অনুপাতে শিক্ষক স্বল্পতাও। ২৫ বিভাগে ২০০জন শিক্ষক রয়েছেন যাদের অনেকেই শিক্ষা ছুটিতে আছেন। যার ফলে শিক্ষকদের অনেক বেশি কোর্স পরিচালনা করতে হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা গুণগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনিভাবে মহামারী আকারে তাদের ওপর জেঁকে বসেছে সেশনজট কালো থাবা। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য আবাসিক হল আছে মোট ৪টি, যেগুলোর ধারণক্ষমতা মাত্র ১৪০০ শিক্ষার্থী। ফলে হলগুলোতে ১জনের বেডে ২ জন করে থাকার পরও প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধাবঞ্চিত। শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস সংকটও চরম। সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের জন্য মানসম্মত পৃথক অডিটোরিয়াম নেই,নেই পর্যাপ্ত  গবেষণাগার, জিমনেশিয়াম , পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল সেন্টারও।

লাইব্রেরী ভবন পরিণত হয়েছে ক্লাসরুম, মেডিকেল সেন্টার ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসে। লাইব্রেবিতে আসন সংকটের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বইয়ের সংকটও রয়েছে। পরিবহন সুবিধা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়নি। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর পাশাপাশি সর্বাগ্রে প্রয়োজন দক্ষ, যোগ্য, নিবেদিতপ্রাণ, আদর্শবান শিক্ষক।

আন্দোলনের মুখে উপাচার্যরা 

প্রতিষ্ঠার ১৪ বছরে ৫ উপাচার্যের ৩ জনের পদত্যাগ হয়েছে আন্দোলনের মুখে। বাকি একজনের বিদায়ে হয়েছে মিষ্টি বিতরণ। প্রত্যেক উপাচার্যই কয়েক দফা আন্দোলনের মুখে পড়েছেন। এর অন্যতম কারণ অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যর্থতা, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক রোষানল ও তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বা মন্তব্য ।

প্রথম উপাচার্য হারুন অর রশিদের চার বছরের মেয়াদে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্বে দুই দফায় আন্দোলন হয়েছিল। দ্বিতীয় উপাচার্য এস এম ইনামুল হক সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধের মুখে পড়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে দুই দফায় একবার ১৫ দিন ও পরে টানা ৪৪ দিনের আন্দোলনে গোটা বিশ্ববিদ্যালয় অচল হয়ে যায়। আন্দোলনের জেরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাধ্য হয়ে ইনামুল হককে তিন মাসের ছুটিতে পাঠায়। ছুটিতে থাকতেই তার মেয়াদ পূর্ণ হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান মো. ছাদেকুল আরেফিন। তার সময়েও শিক্ষক-কর্মকর্তাদের প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্বে চার থেকে পাঁচ দফা আন্দোলন হয়। আন্দোলন শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে গিয়েছিল। তার বিদায়ে শিক্ষার্থীরা মিষ্টি বিতরণ করেন। এরপর উপাচার্যের দায়িত্বে আসেন মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া। ছয় মাসের মাথায় জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০ আগস্ট শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তিনি পদত্যাগ করেন। 

 ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেজিষ্ট্রার আবু হেনা মোস্তফা কামাল খানকে কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া হলে২৬ নভেম্বর বিক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি। এর পর নানা বিতর্ক আর কয়েক দফা আন্দোলনের মুখে পড়েন উপাচার্যে।

গেল বছরের ১২মে উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন-১ এর নিচে তারা আমরণ অনশন শুরু করে শিক্ষার্থীরা । ১৩ মে একযোগে উপাচার্য , উপ-উপাচার্য এবং ট্রেজারারকে অপসারণ করে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলমকে অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়।

২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর উপাচার্যের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পাওয়া তৌফিক আলমের সাথেও সম্প্রতি বাকবিতন্ডা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের।চলমান নানা সংকটের প্রতিবাদ এবং দ্রুত সমাধানের দাবিতে ৪ ডিসেম্বর উপাচার্যের কাছে প্রতীকী ‘মূলা’ পাঠিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র বলছে , শীঘ্রই আন্দোলনের মূখে পড়তে পারেন বর্তমান উপাচার্যও।

বড় চমক দেখাল ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’, দুইদিনে ফলোয়ার ছাড়…
  • ২১ মে ২০২৬
পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পিডিবির, ভোক…
  • ২১ মে ২০২৬
দাদা-দাদির কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলো রামিসা
  • ২১ মে ২০২৬
নির্মাণ শ্রমিক কর্তৃক নারী শিক্ষার্থী হেনস্তা, নোবিপ্রবিতে …
  • ২১ মে ২০২৬
পশুর হাটের ইজারা নিয়ে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে বন্ধ ইজারা কার…
  • ২১ মে ২০২৬
আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়া ইবোলা ভাইরাসের বৈশ্বিক ঝুঁকি কতখানি?
  • ২১ মে ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
21 June, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081