সদ্য বিদায়ী পিএসসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম © সংগৃহীত
মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগ ঘিরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি। পদত্যাগপত্রে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন চেয়ারম্যান। তবে পিএসসির ভেতরে আলোচনা রয়েছে, এর পেছনে প্রশাসনিক ও নীতিগত কারণও থাকতে পারে।
২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে পাঁচ বছরের জন্য পিএসসি চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন মোবাশ্বের মোনেম। দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই বছর পরই তাকে পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হলো। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন, নাকি সরকারের অনাগ্রহের কারণে তাকে সরে যেতে হয়েছে।
পদত্যাগের কারণ জানতে চাইলে অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম বলেন, পিএসসি চেয়ারম্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ। এ দায়িত্বে কাজের চাপ অনেক বেশি। প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালনের পর তার বয়স বাড়ছে। ডায়াবেটিসসহ একাধিক শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত চাপ নিয়ে কাজ করতে শারীরিক অস্বস্তি হচ্ছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতা পেশাটিই তিনি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেন। তাই নিজের মূল পেশায় ফিরতে চান।
তবে পিএসসির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, সরকার তাকে আর ওই পদে রাখতে না চাওয়াও পদত্যাগের পেছনে বড় কারণ হতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা এ তথ্য জানিয়েছে।
মোবাশ্বের মোনেম দায়িত্ব নেওয়ার পর বিসিএস পরীক্ষার প্রচলিত ব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ‘সার্কুলার ইভাল্যুশন সিস্টেম’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। মৌখিক পরীক্ষায় সনাতনী পদ্ধতির পরিবর্তে ‘কম্পিটেন্সি বেজড ভাইভা’ চালুর প্রক্রিয়াও শুরু হয়। বিসিএসের প্রস্তুতিতে কোচিং-নির্ভরতা কমাতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৪৭তম বিসিএসের প্রশ্নপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। সামনে সিলেবাস ও প্রশ্নবিন্যাসেও আরও পরিবর্তনের পরিকল্পনা ছিল।
তার সময়ে পিএসসি ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ রোডম্যাপ নেয়। একটি বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ এবং নিয়োগের সুপারিশ পুরো প্রক্রিয়া ১২ মাসের মধ্যে শেষ করাই ছিল এই পরিকল্পনার লক্ষ্য।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিসিএসের জমে থাকা জট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৪৪তম, ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৮তম ও ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এসব পরীক্ষায় ৭ হাজার ৬৫১ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ৪৭তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা দ্রুত শেষ করে ফল প্রকাশ এবং ৫০তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার খাতা দ্রুত মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে ৫০তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা চলছে। আগামী ২৫ নভেম্বরের মধ্যে এর ভাইভা শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ২০২৬ সালের নভেম্বরের মধ্যেই চূড়ান্ত ফল প্রকাশের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে পিএসসির ইতিহাসে প্রথমবার একটি বিসিএস এক বছরের মধ্যে শেষ হবে।
মোবাশ্বের মোনেম বলেন, দুই বছরে তিনি পিএসসিকে নতুন আঙ্গিকে সাজানোর চেষ্টা করেছেন। ৫০তম বিসিএসের মাধ্যমে এক বছরের বিসিএস পরিক্রমা বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি চলে গেলেও পিএসসি যেন এই গতি ও মান ধরে রাখে, সেটিই তার প্রত্যাশা।
পিএসসির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এসব উদ্যোগে চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষা কমেছে। একই সঙ্গে কমিশনের ওপর জমে থাকা প্রশাসনিক চাপও হ্রাস পেয়েছে। কয়েকটি বিসিএস ও নন-ক্যাডার পরীক্ষার জট নিরসনের মাধ্যমে কমিশনের কার্যক্রমকে স্বাভাবিক গতিতে ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত পিএসসির ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস স্থাপন, পরীক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রমের ডিজিটালাইজেশন এবং অটোমেশন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার দায়িত্বকালে প্রশ্নফাঁস বা নিয়োগ-বাণিজ্যের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সামনে আসেনি।
তবে সংস্কারের পাশাপাশি পিএসসির পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টিও সামনে আনেন চেয়ারম্যান। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পিএসসির সঙ্গে জনপ্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল বলেও আলোচনা রয়েছে। পিএসসির ভেতরে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে, কোনো একটি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন উপদেষ্টা চেয়ারম্যানের ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: পদত্যাগ করলেন পিএসসি চেয়ারম্যান
পিএসসির একজন কর্মকর্তার মতে, চেয়ারম্যানের পদত্যাগের পেছনে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রথমত, মোবাশ্বের মোনেম অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ফলে নির্বাচিত সরকার তাকে একই পদে রাখতে আগ্রহী নয় এমন বার্তা তিনি বিভিন্ন মহল থেকে পেয়ে থাকতে পারেন। দ্বিতীয়ত, পিএসসির স্বায়ত্তশাসন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে তার অবস্থানও সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির কারণ হতে পারে।
পিএসসির সংশ্লিষ্টদের আরেকটি অংশের ধারণা, চেয়ারম্যানের সংস্কার উদ্যোগের কারণে স্বার্থান্বেষী ও সুবিধাবাদী মহলের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়েছিল। বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরির চেষ্টাও করা হচ্ছিল বলে তারা মনে করেন। শেষ পর্যন্ত এই পরিস্থিতি পদত্যাগের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
এর আগে গণ-অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন পিএসসি চেয়ারম্যানসহ ১২ জন সদস্য পদত্যাগ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেমকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। তার দায়িত্ব গ্রহণের পর কমিশনের কার্যক্রমে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
যদিও পিএসসির চেয়ারম্যান পদে পূর্ণ মেয়াদ শেষ করার নজির খুব বেশি নেই। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৮ জন চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মধ্যে মাত্র চারজন নির্ধারিত পুরো মেয়াদ শেষ করতে পেরেছেন। বাকি ১৪ জন মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি।
সংবিধান অনুযায়ী, পিএসসি চেয়ারম্যানের মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে ৬৫ বছর বয়স পূর্ণ হলে এর আগেই দায়িত্ব শেষ হয়। রাজনৈতিক পরিবর্তন, সরকারের অনীহা এবং অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের কারণে অতীতেও অনেক চেয়ারম্যানকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদ ছাড়তে হয়েছে। পুরো পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করা চেয়ারম্যানদের মধ্যে প্রথম ছিলেন এ কিউ এম বজলুল করিম। তিনি ১৯৭২ সালের ১৫ মে থেকে ১৯৭৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর এম মইদুল ইসলাম ১৯৭৭ সালের ২২ ডিসেম্বর থেকে ১৯৮২ সালের ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ ১৯৯৩ সালের ১ মার্চ থেকে ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ পর্যন্ত চেয়ারম্যান ছিলেন। অধ্যাপক জেড এন তাহমিদা বেগম ২০০২ সালের ৯ মে থেকে ২০০৭ সালের ৭ মে পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে পাঁচ বছর পূর্ণ করেন। সা’দত হোসেন ২০০৭ সালের মে থেকে ২০১১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত চার বছর সাড়ে ছয় মাস দায়িত্ব পালন করেন। ৬৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ায় তার দায়িত্ব শেষ হয়।