যে কারণে গাজায় ফের হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে ইসরায়েল
- এস এম তৌফিকুল ইসলাম
- প্রকাশ: ২১ মার্চ ২০২৫, ০৩:২৬ PM , আপডেট: ২১ মার্চ ২০২৫, ০৩:২৬ PM

গাজায় নতুন করে ফের ভয়াবহ হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। যুদ্ধবিরতি ভেঙে, চুক্তি লঙ্ঘন করেই হামলা করেছে ইসরায়েল বাহিনী। তাতে এখন পর্যন্ত ৫০০ জনের বেশি গাজাবাসী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা শতাধিক। বিমান হামলা জোরদার করার পর গাজায় স্থল অভিযানের পরিধি বাড়িয়েছে ইসরায়েল। এটা যে ইসরায়েলের সবচেয়ে ভয়ানক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সামরিক পদক্ষেপ, তা নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আলোচনা করা যাক।
যুদ্ধের বিচ্ছিন্নতাবাদ তত্ত্ব (Diversionary Theory of War) হলো এমন একটি তত্ত্ব যেখানে বলা হয়, রাষ্ট্রের নেতা অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরানোর জন্য আন্তর্জাতিক সংঘাত শুরু করতে পারেন। অর্থনৈতিক সমস্যা, রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি বা জনপ্রিয়তা হ্রাসের মতো পরিস্থিতিতে এই তত্ত্ব সামনে আসে।
যুদ্ধের বিচ্ছিন্নতাবাদ তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো নেতা জনগণের দৃষ্টি ঘোরাতে সংঘাতের আশ্রয় নিতে পারেন। যুদ্ধ জাতীয় সংহতি সৃষ্টি করতে পারে এবং নেতার জনপ্রিয়তা বাড়াতে পারে। এই তত্ত্বটি ইসরায়েলের সাম্প্রতিক গাজা অভিযান এবং প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বুঝতে সাহায্য করতে পারে। বর্তমানে নেতানিয়াহু বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছেন। তাঁর জোট সরকার অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে, যা ডানপন্থী দলগুলোর সমর্থনের উপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক বাজেট বিরোধিতা তাঁর সরকারের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু একাধিক দুর্নীতি মামলায় জড়িত, যা তাঁর জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিয়েছে এবং বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অর্থনীতি, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে সরকারের কার্যক্রম এবং ফিলিস্তিনিদের সাথে চলমান সংঘাত নিয়ে তাঁর নীতির সমালোচনা বেড়েছে।
গাজায় সামরিক অভিযান বাড়িয়ে নেতানিয়াহু সম্ভবত অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে জনগণের মনোযোগ সরাতে চাইছেন। এটি ডাইভারশনারি থিওরির একটি ক্লাসিক কৌশল। বাহ্যিক সংঘাত জাতীয় ঐক্য গঠনে সাহায্য করে এবং অভ্যন্তরীণ বিভেদ থেকে মনোযোগ সরাতে পারে।
ইসরায়েলের ডানপন্থী মিত্ররা গাজার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ এবং ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের দাবি জানাচ্ছে। সংঘাত বাড়িয়ে নেতানিয়াহু এই মিত্রদের সন্তুষ্ট করছেন এবং তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করছেন।
গাজা অভিযানে ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হলেও স্থল অভিযান এড়ানো হয়েছে, যা ইসরায়েলি সৈন্যদের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কমিয়েছে এবং জনগণের ব্যাপক বিরোধিতার সম্ভাবনা কমিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘নো-রুলস’ পররাষ্ট্রনীতির সাথে নেতানিয়াহুর মিল রয়েছে, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপে মুক্ত থাকতে সাহায্য করেছে। দীর্ঘ মাসের হামলা হামাসকে অতি দুর্বল করে রেখেছে এবং একারণেই হামাসকে নিশানা করা হয়েছে কিন্তু ইসরাইল এর মূল ঝুঁকি হতে পারে লেবাননের হিজবুল্লাহ। হিজবুল্লাহ্ অস্ত্র এবং প্রশিক্ষনের দিক থেকে হামাস অপেক্ষা শক্তিশালি বিধায় সেখানে হামলার ঝুঁকি নেতানিয়াহু এই সময়ে নিতে পারছেন না।
যদিও ডাইভারশনারি থিওরি নেতানিয়াহুর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে সহায়ক, তবুও এতে কিছু ঝুঁকি রয়েছে। সংঘাত আরও বাড়লে বা ইসরায়েলি সৈন্যদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলে জনমত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যেতে পারে।
গাজায় বেসামরিক নাগরিক হতাহতের ঘটনা বিশ্বব্যাপী নিন্দার জন্ম দিয়েছে, যা ইসরায়েলকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে পারে। একই সঙ্গে লেবানন থেকে হিজবুল্লাহর আক্রমণের সম্ভাবনাও রয়েছে, যেখানে সংঘর্ষ হলে ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা অনেক বেশি। ফলে নেতানিয়াহু কৌশলগতভাবে সেই পথে হাঁটছেন না।
ডাইভারশনারি থিওরি অনুযায়ী, গাজায় সামরিক অভিযান একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যা অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে মনোযোগ সরাতে, রাজনৈতিক ক্ষমতা সংহত করতে এবং জনসমর্থন বাড়াতে সহায়ক। তবে এই পদক্ষেপের ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ইসরায়েলের স্থিতিশীলতাকে নাড়া দিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধ বিরোধী মনভাব গড়ে উথছে, হয়তো একদিন গাঁজাতে শান্তিত সুবাতাস বইতে শুরু করবে এমন আশাবাদ যুদ্ধবিরোধী আন্দলনের।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট
যোগাযোগা: smtawfiqulislam@gmail.com