প্রতারক এনায়েত করিম © টিডিসি সম্পাদিত
শিশু মত্যু নিয়ে দেশজুড়ে আহাজারি যেন থামছেই না। এবার তাতে যোগ হলো দালালের প্রলোভন। সূত্রের তথ্য, দুই মিনিটের জন্যও খোলা যাবে না অক্সিজেন মাস্ক; এমনটাই নির্দেশনা ছিল ডাক্তারের; কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করে উন্নত চিকিৎসার প্রলোভনে এক দালাল শিশুটির মুখের মাস্ক খুলে নেয়। শুধু তাই নয়, হাসপাতালের ভেতরে ২০ মিনিট ঘুরানোও হয় শিশুটিকে। চেষ্টা করা হয় বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার। কিন্তু এর আগেই অক্সিজেনের অভাবে বাবার কোলেই প্রাণ হারায় ৭ মাস বয়সী শিশু মিনহাজ।
মঙ্গলবার (১২ মে) বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত এনায়েত করিমকে আটক করেছে পুলিশ। তিনি ঢামেক হাসপাতালের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া অফিস সহকারী।
স্বজনরা জানান, কিডনি জটিলতায় ভোগা মিনহাজকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর থেকে ঢাকায় আনা হয়। হাসপাতালে শয্যা খালি হলে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেয়ার আশ্বাস দেন এনায়েত করিম। এর আগে কাঁটাবন এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন ২৫ হাজার টাকা খরচে রাখার পরামর্শও দেন তিনি।
পরিবারের অভিযোগ, রোগীকে বেসরকারি ক্লিনিকে নেয়ার উদ্দেশ্যে মিনহাজের মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেলেন এনায়েত। এরপর প্রায় ২০ মিনিট মাস্ক ছাড়াই তাকে হাসপাতালের ভেতরে ঘোরাঘুরি করানো হয়। পরে ২ নম্বর ভবনের গেট দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় স্বজনরা বুঝতে পারেন, শিশুটি আর বেঁচে নেই।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত এনায়েত করিমের বিরুদ্ধে আগেও নানা অভিযোগ রয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহতদের সার্টিফিকেট দেয়ার নামে অর্থ দাবি করায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। বরখাস্ত অবস্থাতেও তিনি হাসপাতাল এলাকায় দালালি ও প্রতারণামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
শিশুটির বাবা হেলাল মিয়া জানান, তাদের একমাত্র সন্তান মিনহাজ। বাবা-মা দুজনই চাকরি করায় মিনহাজ নানী রেখা বেগমের কাছে রংপুরে থাকত। বেশ কিছুদিন ধরে সে অসুস্থ। সেজন্য চিকিৎসা করাতে প্রথমে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে পরে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ঢাকায় শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে পুরোপুরি চিকিৎসা না পাওয়ায় মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন।
তিনি আরও জানান, ঢামেকে পর জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার তাকে পাশেই শিশু ডাক্তারের কাছে পাঠান। তবে শিশু ওয়ার্ডে সরাসরি ভর্তি না দিয়ে তার পরিবারকে সেখানকার চিকিৎসকরা বলেন, ওয়ার্ডে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসতে, বেড খালি আছে কি না। তখনই হাসপাতালের কর্মচারী এনায়েতের সঙ্গে দেখা হয় তাদের। এনায়েত নিজে তাদের সঙ্গে নিয়ে শিশু ওয়ার্ড ঘুরে এসে চিকিৎসককে জানান, বেড খালি নেই। এরপর এনায়েত তাদের কাঁটাবন এলাকার হোম কেয়ার হাসপাতালের কথা জানায়। এবং সেখানে প্রতিদিন ২৫ হাজার টাকা বিল হবে বলে জানিয়ে দেয়। এক পর্যায়ে নিরুপায় পরিবার রাজি হয়।
হেলাল মিয়া অভিযোগ করে বলেন, ‘এখানে আসার আগে অন্য হাসপাতালের চিকিৎসকরা আমাদের সাবধান করে দিয়েছিলেন, দুই মিনিটের জন্যও ওর মুখের অক্সিজেন মাস্ক খোলা যাবে না। ওই কর্মচারীকেও এটি জানানো হয়। তবে ওই কর্মচারী শিশুটির মাস্ক খুলে একটি অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে দেবে বলে হাসপাতালের ভেতর প্রায় আধাঘণ্টা ঘোরাঘুরি করে। এর পর হাসপাতালের ২ নম্বর ভবনের গেট দিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেওয়ার সময় আমরা বুঝতে পারি, মিনহাজ আর বেঁচে নেই। তখন আমরা কান্নাকাটি শুরু করলে ওই কর্মচারী দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিই।’
শিশুটির মামা রিপন বলেন, ‘আমার ভাগ্নের ডায়রিয়া হয়েছিল। রংপুর মেডিকেলে নিয়ে গেলে সেখানে কিডনির সমস্যা ধরা পড়ে। এরপর ঢাকার শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসি। ছিট না থাকায় আমাদের ভর্তি দেয়নি। সেখানে এক দালাল আমাদের ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে কিডনির সমস্যার কথা শুনে কিডনি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। আমরা গ্রাম থেকে ঢাকায় আসছি। যে যে ভাবে বলছে, সেভাবেই কাজ করছি। আমাদের সাত মাস বয়সী শিশুকে এক প্রকার হত্যা করা হয়েছে। আমরা এর কঠিন শাস্তি দাবি করি।’
ঢামেক সংশ্লিষ্টরা জানান, অতিরিক্ত রোগীর চাপের সুযোগ নিয়ে হাসপাতালে প্রায় অর্ধশত দালাল সক্রিয় রয়েছে। তারা আইসিইউ প্রয়োজন এমন গুরুতর রোগীদের লক্ষ্য করে বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। নিয়মিত অভিযান চললেও মূল হোতারা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
এ বিষয়ে শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মনমথ হালদার জানান, নিহত শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অভিযুক্ত এনায়েতের কাছ থেকে লিখিত মুচলেকা নিয়ে তাকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।