ঈসা ইবনে বেলাল ও রামিসা আনজুম © টিডিসি সম্পাদিত
ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি থেকে পর্তুগাল রাজপথে নেমেছে হাজারো মানুষ। যত দিন যাচ্ছে, ততই সহিংস হচ্ছে ইউরোপের আন্দোলন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলা এই ক্ষুদ্র আন্দোলন কি রূপ নিতে পারে বড় কোনো আন্দোলনে? অথবা আরব বসন্তের মতো নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে কি ইউরোপ? সামনে ইউরোপের একাধিক দেশে জাতীয় নির্বাচন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভ শুধু নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে তাই নয়, ক্ষমতাসীন দলগুলোর ভোটারদের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষাখাতে মাত্রাতিরিক্ত খরচ, আবাসন সংকট, নীতিগত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্রমেই জনরোষ প্রকাশ পাচ্ছে। কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, কোথাও ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটেই চলেছে। সবচেয়ে সহিংস পরিস্থিতি এখন বিরাজ করছে ফ্রান্সে।
ফ্রান্সের স্কুলের ভাঙা ক্লাসরুমের বিরুদ্ধে প্রথমে বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেয় সাধারণ মানুষ। সেখান থেকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিরুদ্ধে জনরোষ তুঙ্গে ওঠে এবং আন্দোলন চরম মাত্রায় পৌঁছায়। দাঙ্গাকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে। এমনকি দাঙ্গাকারীরা ফ্রান্সের দেড়শো বছরের পুরোনো টাউন হলও পুড়িয়ে দেয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বিক্ষোভে নেমেছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ। অগ্নিসংযোগের পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে আহত হয়েছে প্রায় দেড় শতাধিক পুলিশ আর আটক হয়েছে প্রায় ২,৪০০ মানুষ।
ফ্রান্সের গুরুত্বপূর্ণ শহর সাঁ-দেনির মেয়র বালি বাগায়োকো বলেন, ‘অভিজাত প্যারিসের তুলনায় বরাবরই শ্রমজীবী মানুষের এলাকায় কম অর্থ বরাদ্দ দেয় সরকার। শিক্ষা, সামাজিক ও বিচারব্যবস্থা—সব ক্ষেত্রেই রয়েছে বৈষম্য।’ বিক্ষোভের মুখে ফ্রান্স সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কিছু ফি বাড়ানোর পরিকল্পনা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ফ্রান্সের মতো ধনী দেশে স্কুলে শিক্ষক রাখা এবং ভাঙা ক্লাসরুম ঠিক করার টাকা নেই কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আরও একটি বিষয় যুক্ত হয়, আর তা হচ্ছে জ্বালানির মূল্য।
হরমুজ প্রণালি আটকে থাকায় ইউরোপে তেলের দাম পূর্বের তুলনায় অনেক বেড়ে গিয়েছে। আর তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দামও এখন আকাশচুম্বী। এর ফলে ছাত্রদের ক্ষোভের সঙ্গে মিলে গেল শ্রমিক, আইনজীবী ও ২০১৮ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের ক্ষোভ। ইতোমধ্যে ফ্রান্সে পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর খবরও ছড়িয়ে পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক অলাভজনক ও নিরপেক্ষ সংস্থা ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ এ বিষয়ে বিবৃতি প্রদান করেছে। প্যারিস থেকে আলবেনিয়ার তিরানা অবধি এখন এই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। মিলান, তুরিন, বলোনিয়া থেকে ১৬ অক্টোবর এই আন্দোলন শুরু হয়। ইতালির মিলানে সংঘর্ষ ও লুটপাটের পর অগ্নিসংযোগ করা হয়।
বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে টিউশন ফি ও রেজিস্ট্রেশন ফি কমানোর জন্য আন্দোলন শুরু হয়েছে। গ্রিসের এথেন্সেও আবাসন সংকট, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ইত্যাদির কারণে আন্দোলন তুঙ্গে। অস্ট্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি কমানোর দাবিতে প্রায় ৬ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী এখন রাস্তায়। জার্মানিতেও বাজেটস্বল্পতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল নির্মাণ আটকে রয়েছে এবং দশকের পর দশক ধরে চলা এই কাঠামোর বিরুদ্ধে এখন প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে।
স্পেনে মূলত ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে আবাসন সংকট নিয়ে। সেখানে বাড়িভাড়া প্রায় ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমতাবস্থায় ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা, উচ্ছেদ বন্ধ এবং বিনিয়োগ তহবিলের সম্পত্তি কেনার ওপর বিধিনিষেধ চান আন্দোলনকারীরা। পর্তুগালের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ২০১৫ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটিতে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ। এর ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে বাড়ি কেনা ও ভাড়া নিয়ে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই সংকটের প্রতিবাদে লিসবনের রাস্তায় এখন হাজারো মানুষ।
আলবেনিয়ায় গ্রীষ্মকাল থেকেই দুর্নীতি ও কর্মসংস্থানের সংকটের পাশাপাশি জ্যারেড কুশনার সমর্থিত একটি বিলাসবহুল উপকূলীয় প্রকল্পকে ঘিরে আন্দোলনের বীজ বপন হয়েছে। ১১ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা এদি রামা ‘ফ্লেমিঙ্গো’ নামের একটি দ্বীপ ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের হাতে তুলে দিতে চাচ্ছেন। এরই ফলে ‘ফ্লেমিঙ্গো বাঁচাও’ নামে পরিবেশবাদী আন্দোলন এখন রূপ নিয়েছে সরকার পতনের আন্দোলনে। এ ছাড়াও সেখানে পড়াশোনার খরচ আকাশছোঁয়া এবং দিনশেষে কর্মসংস্থানের অভাব, দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের একেকজনের ২০টি করে বাড়ি সবকিছুই এখন এই আগুনে ঘি ঢালছে।
তবে কিছু কিছু বিশ্লেষক বলছেন, ইউরোপের বর্তমান বিক্ষোভের মূল লক্ষ্য আরব বসন্তের চেয়ে একেবারেই আলাদা; মূলত সামাজিক বৈষম্য দূর করার দাবি জনগণের। রাষ্ট্রভেদে এসব দাবির পার্থক্য থাকলেও এসব সংকটকে ঘিরেই বাড়ছে জনরোষ। এখন প্রশ্ন হলো, দুনিয়াতে সভ্যতা শেখানো ইউরোপের শহরে এই লুটপাট আর অগ্নিসংযোগের ঘটনাই বা কেন ঘটছে? এখানেই রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকির গল্প। মূলত ইউরোপের দেশগুলো এখন ঋণের বোঝার ওপর বসে আছে, অর্থনীতি ধুঁকছে আর সংকট সামাল দিতে মানুষের সেবার জন্য নির্ধারিত বাজেট থেকে কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
কিন্তু ইউরোপের ধনী দেশগুলোর হঠাৎ এত ঋণের টান পড়ল কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ঋণ-জিডিপি অনুপাতে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজের নিয়মে এই অনুপাত থাকার কথা ৬০ শতাংশ। কিন্তু এ বছরের মার্চ মাসে প্রকাশিত সরকারি ঋণ তালিকায় দেখা গিয়েছে, এটি গ্রিসে ১৪৩.৫ শতাংশ, ইতালিতে ১৩৮.৯ শতাংশ, স্পেনে ১০১.৬ শতাংশ, ফ্রান্সে ১১৭.৬ শতাংশ, বেলজিয়ামে ১০৯.১ শতাংশ এবং পুরো ইউরো অঞ্চল মিলিয়ে ৮৮.৯ শতাংশ। একদিকে এসব দেশের ঋণ বেশি, তাই সুদ বেশি দিতে হচ্ছে। আর সুদ বেশি দিতে হলে সরকারের হাতে টাকা কমে যাচ্ছে এবং সরকারকে নাগরিকদের ভর্তুকি ছাঁটাই করতে হচ্ছে। PMI (Purchasing Managers’ Index) সূচকেও ইউরোপের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্রমেই নিম্নমুখী হচ্ছে।
ইউরোপে উনিশ শতকে শিল্পবিপ্লবের ফলে যে বড় ইকোনমি তৈরি হয়েছিল, সেটিও এখন ধীরে ধীরে ছোট হচ্ছে, কেননা ইউরোপের শিল্পের বেশিরভাগ বিকল্পই এখন তৈরি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমরা যদি একটু পেছনে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখা যাবে যে এই জনরোষের মূলে রয়েছে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি। আর এটি শুরু হয়েছে মূলত ইরান-আমেরিকা দ্বৈরথে। এখানে চারটি কারণ বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
১. প্রথমত, হরমুজ প্রণালি নিয়ে দ্বৈরথ মূলত শুরু হয় ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে।
২. দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সংকটে ইউরোপের গ্যাসের দাম ৪৪ শতাংশ বাড়লেও একই সময়ে আমেরিকায় গ্যাসের দাম ৬ শতাংশ কমেছে। এর কারণ, হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে ইউরোপ কাতার বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল বা গ্যাস আমদানি করতে পারছে না। এর ফলে আমেরিকা থেকে আমদানি করতে হচ্ছে।
৩. তৃতীয়ত, হচ্ছে শুল্কের চাপ। ২০২৫ সালে ইউরোপ ট্রাম্পের সঙ্গে একটি চুক্তি মেনে নিয়েছে, যেখানে তাদের বেশিরভাগ পণ্যে ১৫ শতাংশ শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়।
৪. চতুর্থ কারণ অস্ত্রের খরচ। ট্রাম্পের চাপে ন্যাটোর সদস্যরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির ৫ শতাংশ তারা প্রতিরক্ষায় খরচ করবে। এটি ২০২৫ সালে ইউরোপের খরচের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি। এজন্য ইউরোপের দেশগুলো বাড়তি খরচগুলো মেটানোর জন্য অন্যান্য খাত থেকে কেটে নিচ্ছে।
সব পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইউরোপের অর্থনীতিতে যে এখন টালমাটাল অবস্থা, সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন দেখার বিষয়, এই পরিস্থিতি আসলে ইউরোপের দেশগুলোকে কোথায় নিয়ে যায় অথবা দেশগুলোর সরকারই বা কী ব্যবস্থা নেয়।
লেখক: ঈসা ইবনে বেলাল, প্রভাষক, লোকপ্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং রামিসা আনজুম, শিক্ষার্থী,লোকপ্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যাম্পাস এম্বাসেডর, নীতি গবেষণা কেন্দ্র।