চুয়েটের সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্কতার প্রশ্ন: কুয়েটের অভিজ্ঞতা থেকে একটি উন্মুক্ত চিঠি

১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৫ PM
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় © সংগৃহীত

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সম্মানিত শিক্ষক সমাজ, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সাধারণ শিক্ষার্থী, এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নীতি-নির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, রাষ্ট্রীয় আইনের মর্যাদা ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের স্বার্থে কিছু ঐতিহাসিক ও নির্মম সত্য তুলে ধরা প্রয়োজন বলে মনে করছি।

১. কুয়েটের প্রায় ৬ মাসের অচলাবস্থার নির্মম অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার্থীদের অপূরণীয় ক্ষতি
বিশ্ববিদ্যালয ইতিহাসের শিক্ষায না চললে তার চড়া মাশুল দিতে হয শিক্ষার্থীদের। কুয়েটের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে-একদা যখন শিক্ষক সমিতির হটকারী সিদ্ধান্তের কারণে টানা প্রায় ৬ মাস বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল, তখন শিক্ষার্থীদের জীবনে যে অপূরণীয বিপর্যয় নেমে এসেছিল, তা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। ৬ মাসের সেই কৃত্রিম অচলাবস্থায শত শত সাধারণ শিক্ষার্থীর বিসিএসসহ দেশি-বিদেশি চাকরি এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ চিরতরে হাতছাড়া হযে গিযেছিল; তৈরি হযেছিল বছরের পর বছর দীর্ঘ সেশনজট।

শিক্ষার্থীদের মানসিক বিষাদ, বিষণ্ণতা, বিসিএসের বয়স পার হযে যাওযার কান্না এবং মধ্যবিত্ত অভিভাবকদের কষ্টের সেই বিভীষিকা বর্ণনাতীত। অথচ সেই দীর্ঘ ৬ মাস বেতনভোগী শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের বেতন-ভাতা কিন্তু একদিনের জন্যও বন্ধ থাকেনি; তাদের জীবনের কোনো ক্ষতি হযনি। সকল আর্থিক ও পেশাগত ক্ষতি এবং জীবন থেকে ৬টি মূল্যবান মাস হারানোর মাশুল গুণতে হযেছিল শুধুই নির্দোষ শিক্ষার্থীদের। চুয়েটে আজ সেই ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি আমরা কোনোভাবেই দেখতে চাই না।

২. শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বনাম সংস্থা/সিন্ডিকেটের স্থবিরতা
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল প্রাণকেন্দ্র তার শিক্ষার্থীরা। কুয়েটে যখন শিক্ষক সমিতির অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের কারণে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থবির হতে চলেছিল, তখন শিক্ষার্থীদের জীবনের মূল্যবান সময় রক্ষা করতে আমি শিক্ষক সমিতির মূল ধারার বাইরে গিয়ে এককভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলাম। সহকর্মীদের বিরোধিতা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষার হল সচল করেছিলাম, জয় হয়েছিল শিক্ষার। আজ চুয়েটের বর্তমান সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমার সুস্পষ্ট পর্যবেক্ষণ-ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক ভবিষ্যৎকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়াই একজন শিক্ষকের সর্বপ্রধান নৈতিক দায়িত্ব।

৩. সহনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদারতা: কুয়েটের ঐতিহাসিক পাঠ
নেতৃত্ব ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে কুয়েট পরিবার সর্বদাই প্রাতিষ্ঠানিক উদারতার পরিচয় দিয়েছে। চুয়েটের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অধ্যাপক জনাব হযরত আলী স্যার যখন কুয়েটের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাঁর কিছু কৌশলগত ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা তাকে সর্বাত্মক সম্মান ও সহযোগিতা প্রদান করেছিলাম। পরবর্তীতে অধ্যাপক মাকসুদ হেলালী স্যার উপাচার্য হিসেবে আগমন করলে কুয়েট পরিবার তাকে সানন্দে বরণ করে নেয়। হেলালী স্যারের দূরদর্শী চিন্তাভাবনা ও শক্তিশালী নেতৃত্বের ফলেই কুয়েট অভূতপূর্ব গতিশীলতা লাভকরে, যা আজও আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। কুয়েট যেখানে অন্য প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে সানন্দে গ্রহণ করে অভিভাবকের মর্যাদা দিতে পেরেছে, সেখানে চুয়েট কেন নিজ আঙিনার সন্তানকে (অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম) উপাচার্য হিসেবে গ্রহণ করতে বাধা সৃষ্টি করছে? নিজ প্রতিষ্ঠানের একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপককে ক্যাম্পাসে ঢুকতে না দেওয়া কোনো বীরত্ব নয়; বরং এটি চরম প্রাতিষ্ঠানিক সংকীর্ণতা ও অপসংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ।

৪. রাষ্ট্রীয সার্বভৌমত্ব বনাম 'সরকারের চেয়েও বড় সরকার' মানসিকতা
রাষ্ট্রীয ও সংবিধিবদ্ধ গ্যাজেটকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধা দেওয়া কিংবা প্রশাসনিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি করা কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন হতে পারে না। চুয়েটের একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যেভাবে বেআইনি কায়দায় সংবিধিবদ্ধ নিয়োগকে প্রত্যাখ্যান করছে, তাতে মনে হচ্ছে তারা নিজেদের রাষ্ট্র ও 'সরকারের চেয়েও বড় সরকার' বলে ধরে নিয়েছে! রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে তোয়াক্কা না করে এই ধরনের ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ করা সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক অরাজকতা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি স্পষ্ট চ্যালেঞ্জের শামিল।

৫. নেতৃত্বের মূল্যায়ন ও অধ্যাপক শরীফুল আলমকে কাজের সুযোগ প্রদান
জুলাই আন্দোলনের রাজপথের লড়াকু সৈনিক এবং চুয়েটেরই সন্তান অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে তাঁর প্রশাসনিক যোগ্যতা ও সততা প্রমাণের ন্যূনতম সুযোগ দেওয়া চুয়েট পরিবারের নৈতিক দায়বদ্ধতা। কোনো চক্রান্ত বা কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি না করে তাঁকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া উচিত। কুয়েটে যেভাবে অধ্যাপক হেলালী স্যার সর্বস্তরের সহযোগিতা নিয়ে প্রতিষ্ঠানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, চুয়েটেরও উচিত সেই উদাহরণ থেকে শিক্ষা নেওয়া। সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসিকে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ দেওয়া হোক যাতে চুয়েটবাসী দেখতে পারে তাঁর প্রশাসনিক সক্ষমতা ও চুয়েটকে এগিয়ে নেওয়ার সদিচ্ছা কতখানি।

৬. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, মান্যবর প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষা মন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা ও আশাবাদ
উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, মেধার মূল্যায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সময়োপযোগী ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপের জন্য আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং মান্যবর শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক ধন্যবাদ প্রকাশ করছি। রাজপথের লড়াকু ও সৎ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে উপাচার্য পদে মনোনীত করে সরকার যে যোগ্য নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখেছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও যুগান্তকারী।

আমরা আশা করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় চুয়েটের এই বিষম সংকটটি অত্যন্ত সদয় ও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিতে অবলোকন করবেন। কতিপয় স্বার্থান্বেষী বলযের বেআইনি বাধার মুখে সংবিধিবদ্ধ আদেশ বাস্তবায়নে এবং চুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক জীবন রক্ষার্থে সরকার কঠোর ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সুরক্ষা সুনিশ্চিত করবে-যাতে উপাচার্য মহোদয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে চুয়েটকে একটি গতিশীল ও সেশনজটমুক্ত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে পারেন।

উপসংহার
পদ-পদবির লোভ, রাজনৈতিক অন্ধত্ব কিংবা প্রচ্ছন্ন সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় না দিয়ে চুয়েটের উচিত নিজেদের 'রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে' ভাবার এই ফ্যাসিবাদী ও প্রভূত্বকামী মানসিকতা থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসা। অধ্যাপক হেলালী স্যারের মতো যোগ্য নেতৃত্বকে চিনে নেওয়ার এবং চুয়েটের নিজের সন্তানকে সম্মানের সাথে বরণ করে নেওয়ার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্কতার পরিচয় দিন। রাষ্ট্রীয শৃঙ্খলা ও আইনের শাসন বজায় রেখে চুয়েটকে পুনরায একটি শিক্ষার্থীবান্ধব, স্বনামধন্য ও আন্তর্জাতিক মানের উৎকর্ষ কেন্দ্রে রূপান্তর করাই এখন সময়ের পরম দাবি।

লেখক: সাবেক সহ-সভাপতি (২ মেয়াদ), শিক্ষক সমিতি
ও অধ্যাপক, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), খুলনা

ফের পাহাড়ধ্বসের কবলে নেপাল, বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি-জলবিদ্যুৎকেন্দ্…
  • ১১ অক্টোবর ২০২৬
ইন্টার্ন ও মিডলেভেল চিকিৎসকদের ভাতা পুনর্নির্ধারণসহ ৫ দফা দ…
  • ১১ অক্টোবর ২০২৬
পার্ট-টাইম চাকরি আড়ংয়ে, নেবে ১৮০ সেলস অ্যাসোসিয়েট, আবেদন ৭ …
  • ১১ অক্টোবর ২০২৬
২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ নিয়ে যা বললেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী
  • ১১ অক্টোবর ২০২৬
৪ বছর পর ঢাবির সমাবর্তন জানুয়ারিতে—কারা অংশ নিতে পারবেন, জা…
  • ১১ অক্টোবর ২০২৬
তিন ক্যাটাগরিতে ৯২ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসের তালিকা প্রকাশ…
  • ১১ অক্টোবর ২০২৬