দুই বছরে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়: শূন্য থেকে স্বপ্নের পথে

০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৩ PM
প্রফেসর ড. মোহাঃ হাছানাত আলী

প্রফেসর ড. মোহাঃ হাছানাত আলী © ফাইল ছবি

আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সেই দিনটির কথা মনে পড়লে আজও বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতি জেগে ওঠে। একদিকে ছিল দায়িত্বের বিশালতা, অন্যদিকে বাস্তবতার নির্মম শূন্যতা। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলাম, অথচ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো শ্রেণিকক্ষ নেই, শিক্ষার্থী নেই, লাইব্রেরি নেই, কম্পিউটার ল্যাব নেই, অতিথিদের বসার জায়গা নেই—এমনকি একটি টেলিফোন কিংবা একটি ল্যাপটপও ছিল না। ছিল শুধু একটি নাম, একটি স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা। আমার বসার জন্য নির্ধারিত হয়েছিল মাত্র ৭০০ বর্গফুটের একটি ছোট্ট কক্ষ। অফিসের সরঞ্জাম বলতে ছিল দুটি কম্পিউটার ও একটি প্রিন্টার আর কয়েকটি টেবিল চেয়ার। চারপাশে তাকালে মনে হতো, এটি যেন কোনো পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় নয়; বরং কাগজে-কলমে জন্ম নেওয়া এক নবজাত স্বপ্ন, যে এখনো বাস্তবতার আলোয় চোখ মেলতে পারেনি। নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় তখন ছিল এক অদৃশ্য ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি—নকশায় ছিল, কাগজে ছিল, মানুষের প্রত্যাশায় ছিল; কিন্তু মাটির ওপর তার কোনো দৃশ্যমান অবয়ব ছিল না। ছিল না ইট-পাথরের স্থাপনা, ছিল না শ্রেণিকক্ষের কোলাহল, ছিল না শিক্ষার্থীদের পদচারণা। তবু আমি বিশ্বাস করতাম, প্রতিটি বড় প্রতিষ্ঠান একদিন না একদিন একটি ছোট্ট স্বপ্ন থেকেই জন্ম নেয়। আর সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বই তখন আমার কাঁধে এসে পড়েছিল। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই জানতে পারলাম, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার একটি উদ্যোগ রয়েছে। খবরটি ছিল উদ্বেগজনক, সময়টি ছিল কঠিন, পরিস্থিতি ছিল অনিশ্চিত। কিন্তু সেই মুহূর্তেই আমার ভেতরে একটি দৃঢ় সংকল্প জন্ম নিল—নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতেই হবে। যে স্বপ্ন নওগাঁর মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা, যে বিশ্ববিদ্যালয় এই অঞ্চলের তরুণদের ভবিষ্যতের আশ্রয় হতে পারে, তাকে কোনোভাবেই অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। 

যোগদানের পরপরই ঘোষণা দিয়েছিলাম, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকেই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন—দপ্তরের পর দপ্তরে ছুটেছি, সভা করেছি, কথা বলেছি, যুক্তি দিয়েছি, অনুরোধ করেছি, অপেক্ষা করেছি। কখনো ফাইলের পেছনে, কখনো অনুমোদনের আশায়, কখনো একটি শ্রেণিকক্ষের সন্ধানে—দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কেটে গেছে। তখন বুঝেছি, একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা শুধু ভবন নির্মাণের কাজ নয়; এটি আসলে মানুষের স্বপ্ন, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, নীতিনির্ধারণ, অর্থায়ন, পরিকল্পনা এবং অদম্য ধৈর্যের এক দীর্ঘ সমন্বিত যাত্রা। একটি শ্রেণিকক্ষের জন্যও কতটা সংগ্রাম করতে হয়, একটি অনুমোদনের পেছনে কত রাতের উৎকণ্ঠা লুকিয়ে থাকে, একটি সিদ্ধান্তের জন্য কত দরজায় কড়া নাড়তে হয়—সেই অভিজ্ঞতা তখন খুব কাছ থেকে পেয়েছি। আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। স্বপ্নের পথে কখনো কখনো সময় থেমে থাকে, দরজা বন্ধ থাকে, অপেক্ষা দীর্ঘ হয়। আমাদেরও অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও একটি বছর। সেই অপেক্ষা ছিল কষ্টের, কিন্তু পরাজয়ের নয়। কারণ আমরা জানতাম, বিলম্ব মানেই সমাপ্তি নয়; কখনো কখনো বিলম্বই বড় সূচনার প্রস্তুতি।

অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালুর অনুমোদন মিলল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকারের আমলে ১৮ জুলাই ২০২৬ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো শিক্ষা কার্যক্রম। সেই দিনটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দিন ছিল না; সেটি ছিল নওগাঁর মানুষের বহুদিনের স্বপ্নের প্রথম প্রকাশ্য সকাল। মনে হয়েছিল, দীর্ঘ অন্ধকারের পর কোনো এক ভোরে সূর্য উঠেছে—নরম আলোয়, আশ্বাসে, সম্ভাবনায়।
যে বিশ্ববিদ্যালয়ে একসময় একটি শ্রেণিকক্ষও ছিল না, সেখানে আজ রয়েছে আধুনিক শ্রেণিকক্ষ। প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ক্লাসরুম, আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, স্মার্ট বোর্ড, মাল্টিমিডিয়া সুবিধা, রিডিং রুম, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, পর্যাপ্ত বই এবং পুরো ক্যাম্পাসে ওয়াই-ফাই সুবিধা—সব মিলিয়ে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় আজ নতুন সাজে সেজেছে। একসময় যেখানে নীরবতা ছাড়া কিছুই ছিল না, সেখানে আজ শ্রেণিকক্ষে জ্ঞানের আলো জ্বলে। একসময় যেখানে খালি দেয়াল ভবিষ্যতের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে আজ শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় প্রশ্ন, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার ভাষা। একসময় যে প্রাঙ্গণ ছিল নিঃসঙ্গ, আজ সেখানে তরুণ পদচারণার শব্দ; একসময় যে ভবন ছিল কেবল কাঠামো, আজ সেখানে প্রাণের স্পন্দন।
২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন দুটি বিভাগে নতুন শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিতে আমরা একাডেমিক ভবন-২-কে সুসজ্জিত করেছি। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মেধাবী, যোগ্য ও উদ্যমী শিক্ষক। ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে একাডেমিক পরিবেশ, তৈরি হচ্ছে জ্ঞানচর্চার আবহ, জন্ম নিচ্ছে নতুন প্রত্যাশা। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকেই আরও দুটি নতুন বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি নতুন বিষয় যেন ভবিষ্যতের দিকে খোলা একটি নতুন জানালা—যেখান দিয়ে শিক্ষার্থীরা দেখতে পাবে আরও বিস্তৃত পৃথিবী, আরও বড় সম্ভাবনা।

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়
তবে এই পরিবর্তন শুধু ভবন, যন্ত্রপাতি কিংবা অবকাঠামোর পরিবর্তন নয়। এটি একটি মানসিকতার পরিবর্তন, একটি অঞ্চলের আত্মবিশ্বাসের পরিবর্তন, একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ভাবনার পরিবর্তন। নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় আজ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি নওগাঁর মানুষের আশা, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠছে। যে বিশ্ববিদ্যালয়কে একসময় বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, সেই বিশ্ববিদ্যালয় আজ তার অস্তিত্ব ও সম্ভাবনার জানান দিতে সক্ষম হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে নওগাঁর মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও সহযোগিতা, সরকারের সহযোগিতা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সমর্থন। তাঁদের প্রত্যেকের অবদান এই পথচলার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কোনো স্বপ্ন একা পূর্ণতা পায় না; মানুষের সম্মিলিত বিশ্বাস, সহযোগিতা ও ভালোবাসাই তাকে বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করায়। তবে আমরা এখানেই থেমে থাকতে চাই না। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা যেমন বড় কাজ, তাকে মানসম্মত ও বিশ্বমানের করে তোলা তার চেয়েও বড় দায়িত্ব। আমরা ধীরে ধীরে, পরিকল্পিতভাবে এবং দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে যেতে চাই। আমাদের লক্ষ্য শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা নয়; একটি মানসম্মত, আধুনিক, গবেষণামুখী, কর্মমুখী ও মানবিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তোলা। আমরা এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় চাই, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য পড়বে না; তারা শিখবে প্রশ্ন করতে, ভাবতে, অনুসন্ধান করতে, সত্যকে খুঁজে নিতে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে। আমরা এমন একটি শিক্ষাঙ্গন গড়ে তুলতে চাই, যেখানে জ্ঞান হবে মুক্তির পথ, গবেষণা হবে অগ্রগতির হাতিয়ার, প্রযুক্তি হবে সম্ভাবনার সেতু এবং মানবিক মূল্যবোধ হবে প্রতিটি অর্জনের ভিত্তি।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে। কর্মবাজারের দ্রুত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে আমাদের শিক্ষার্থীদের শুধু সনদ দিলেই চলবে না; তাদের দিতে হবে দক্ষতা, সৃজনশীলতা, অভিযোজনক্ষমতা ও নেতৃত্বের শক্তি। জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তি, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধ—এই সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই আমরা ভবিষ্যতের নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করতে চাই। এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়, যার শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরি খুঁজবে না; তারা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, নতুন চিন্তার জন্ম দেবে, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবে। বর্তমান সরকারের ঘোষিত নীতির সঙ্গে সমন্বয় করে একটি আন্তর্জাতিক ভাষা কেন্দ্র (International Language Centre) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা জ্ঞান অর্জনের দরজা, সংস্কৃতির সেতু এবং বিশ্বের সঙ্গে সংযোগের অন্যতম প্রধান পথ। আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারে অবাধে প্রবেশ করতে পারে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে, নিজেদের চিন্তা ও সৃষ্টিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে পারে—এই লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিক ভাষা কেন্দ্রের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কোলাবরেশনের উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা চাই, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা শুধু দেশের জন্য নয়, বিশ্বের জন্যও উন্মুক্ত থাকুক। জ্ঞান কোনো সীমানা মানে না; গবেষণার কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নেই। সহযোগিতা, বিনিময় ও সম্মিলিত জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়েই একটি বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিকার অর্থে বিশ্বমানের হয়ে ওঠে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা মেধা ও যোগ্যতাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। কোনো ধরনের আপস না করে একটি যোগ্য, দক্ষ ও নিবেদিত একাডেমিক টিম গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন যতই সুন্দর হোক, তার প্রকৃত সৌন্দর্য ও শক্তি নিহিত থাকে তার শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার মধ্যে। একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না; তিনি স্বপ্ন দেখান, প্রশ্ন জাগান, পথ দেখান। একজন ভালো শিক্ষক কখনো কখনো একটি জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। তাই নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষক যেন শিক্ষার্থীদের কাছে জ্ঞানের পাশাপাশি প্রেরণা, নৈতিকতা ও মানবিকতারও আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

সময় হিসেবে দুই বছর খুব বেশি নয়। ইতিহাসের বিচারে দুই বছর হয়তো একটি ক্ষুদ্র সময়কাল। কিন্তু একটি শূন্য প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে এই দুই বছর কখনোই ছোট নয়। এই দুই বছরে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জনের পাল্লা একেবারে ছোটও নয়। এই দুই বছরে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য হাজার মাইল ছুটেছি। কখনো দপ্তরের পর দপ্তরে, কখনো সভা-সেমিনারে, কখনো নীতিনির্ধারকদের দ্বারে, কখনো গভীর রাত পর্যন্ত নথিপত্রের ভেতর—একটি স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করানোর জন্য নিরন্তর ছুটে চলেছি। কখনো মনে হয়েছে পথ শেষ হচ্ছে না, কখনো মনে হয়েছে দরজা খুলছে না, কখনো মনে হয়েছে অপেক্ষারও যেন কোনো শেষ নেই। তবু থামিনি।
পথের ক্লান্তি ছিল, অনিশ্চয়তা ছিল, ছিল নানা প্রতিকূলতা; কিন্তু স্বপ্নের কাছে ক্লান্তি কখনো পরাজিত হতে পারে না। যে স্বপ্ন মানুষের, যে স্বপ্ন একটি অঞ্চলের, যে স্বপ্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের—তার জন্য পথ যত দীর্ঘই হোক, পা থেমে থাকতে পারে না। কত মানুষ কত টিটকারি করেছেন, আড়ালে-আবডালে কত তুচ্ছতাচ্ছিল্য সহ্য করতে হয়েছে—শুধু নামসর্বস্ব একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার কারণে। কেউ হয়তো ভেবেছেন, এটি কেবল কাগজে থাকা একটি প্রতিষ্ঠান; কেউ হয়তো এর ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। কেউ হয়তো মনে করেছেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই। সেই কথাগুলো কখনো কষ্ট দিয়েছে, কখনো আহত করেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলোই আমাদের আরও দৃঢ় করেছে। কারণ সময়ই শেষ পর্যন্ত সব প্রশ্নের উত্তর দেয়। সময় কখনো তর্ক করে না, সময় শুধু সত্যকে প্রকাশ করে। আজ সেই সময় আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছে—স্বপ্নকে অবহেলা করা যায়, কিন্তু স্বপ্নকে থামিয়ে রাখা যায় না।

আজ যখন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের দেখি, শ্রেণিকক্ষে তাদের প্রাণচাঞ্চল্য অনুভব করি, লাইব্রেরিতে নীরবে বই পড়তে দেখি, তখন নিজেকে সত্যিই সফল মনে হয়। মনে হয়, আমাদের দীর্ঘ পথচলা বৃথা যায়নি। মনে হয়, সেই ছোট্ট কক্ষের নিঃসঙ্গতা, সেই সীমিত সরঞ্জাম, সেই অনিশ্চিত দিনগুলো—সবকিছুরই যেন আজ অর্থ খুঁজে পাওয়া গেছে। যে স্বপ্ন একদিন কাগজে আঁকা ছিল, আজ তা শিক্ষার্থীদের চোখে আলো হয়ে জ্বলছে। যে বিশ্ববিদ্যালয় একসময় ছিল নিঃসঙ্গ ও নীরব, আজ সেখানে জ্ঞান, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার পদচারণা। শ্রেণিকক্ষের প্রতিটি প্রশ্নে, লাইব্রেরির প্রতিটি উল্টানো পাতায়, করিডোরে প্রতিটি পদক্ষেপে আমি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের স্পন্দন শুনতে পাই। আজ বুক ফুলিয়ে বলতে ইচ্ছে করে—আমরা কাগজের বিশ্ববিদ্যালয়কে বাস্তবে রূপান্তর করেছি। আজ নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিচিতি আছে। আজ তার নিজস্ব শ্রেণিকক্ষ আছে, নিজস্ব লাইব্রেরি আছে, নিজস্ব শিক্ষার্থী আছে, নিজস্ব একাডেমিক স্পন্দন আছে। আধুনিকতার ছোঁয়া আজ নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রাঙ্গণে স্পষ্ট।

তবে এই অর্জন কোনো শেষ গন্তব্য নয়; এটি কেবল যাত্রার প্রথম দৃশ্যমান মাইলফলক। শূন্য থেকে শুরু করে আজ আমরা একটি দৃশ্যমান অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছি। পথ এখনো অনেক দীর্ঘ। সামনে আরও অনেক কাজ, আরও অনেক চ্যালেঞ্জ, আরও অনেক স্বপ্ন আমাদের অপেক্ষায় আছে। আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে, স্বপ্ন আছে এবং এগিয়ে যাওয়ার অদম্য প্রত্যয় আছে। আমরা জানি, একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত করতে সময় লাগে, শ্রম লাগে, ত্যাগ লাগে, ধৈর্য লাগে। কিন্তু আমরা এটাও জানি, যে স্বপ্নের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসা যুক্ত থাকে, যে স্বপ্নের সঙ্গে একটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে, সেই স্বপ্ন একদিন না একদিন পূর্ণতা পায়।

আমরা থেমে থাকব না
নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক, মানসম্মত ও বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার যে যাত্রা শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত থাকবে। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ হবে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, প্রতিটি গবেষণাগার হবে নতুন সম্ভাবনার জন্মভূমি, প্রতিটি শিক্ষার্থী হবে ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা।

একদিন যে বিশ্ববিদ্যালয়কে বন্ধ করে দেওয়ার কথা উঠেছিল, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ই একদিন নওগাঁর মানুষের স্বপ্ন, গর্ব ও সম্ভাবনার অন্যতম প্রধান ঠিকানা হয়ে উঠবে—ইনশাআল্লাহ। সেদিন নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উচ্চারিত হবে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নাম হিসেবে নয়; উচ্চারিত হবে একটি অঞ্চলের জাগরণ, একটি প্রজন্মের উত্থান এবং একটি স্বপ্নের সফল পরিণতি হিসেবে।
আজ থেকে দু'বছর আগে শূন্য থেকে শুরু হয়েছিল পথচলা। ছিল না শ্রেণিকক্ষ, ছিল না শিক্ষার্থী, ছিল না লাইব্রেরি, ছিল না অবকাঠামো। ছিল শুধু বিশ্বাস—একদিন সব হবে। ছিল শুধু সাহস—একদিন এই নীরব প্রাঙ্গণে জ্ঞানের কোলাহল উঠবে। ছিল শুধু স্বপ্ন—একদিন নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব আলোয় আলোকিত হবে।

আজ সেই পথের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি—স্বপ্ন শুধু দেখা নয়, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়। অন্ধকার যত গভীরই হোক, একটি প্রদীপই আলো জ্বালাতে পারে। পথ যত দীর্ঘই হোক, একটি পদক্ষেপই যাত্রার সূচনা করে। আর বিশ্বাস যত দৃঢ়ই হোক, একদিন তা বাস্তবতার দরজায় কড়া নাড়বেই। নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অগ্রযাত্রায় যাঁরা পাশে ছিলেন, সহযোগিতা করেছেন, সাহস জুগিয়েছেন, আশ্বাস দিয়েছেন, সমালোচনা করেছেন, পথ দেখিয়েছেন—সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আপনাদের ভালোবাসা, আস্থা ও সহযোগিতা ছাড়া এই পথচলা কখনোই এতদূর আসতে পারত না।
এই বিশ্ববিদ্যালয় নওগাঁর মানুষের। এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। এই বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের জ্ঞানভিত্তিক অগ্রযাত্রার একটি নতুন অধ্যায়।

নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাবে। 
নওগাঁ এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।


লেখক: উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়

বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় সরকার: প্রধানমন্ত্রী
  • ০৭ অক্টোবর ২০২৬
এক্সিকিউটিভ নিয়োগ দেবে ভিভো, আবেদন ৪ নভেম্বর পর্যন্ত
  • ০৭ অক্টোবর ২০২৬
ম্যাডামের মেসেজে ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট, এক মাস ঘুরেও সার্টিফিকে…
  • ০৭ অক্টোবর ২০২৬
মুহূর্তেই ধ্বসে পড়ল বহুতল ভবন, ধ্বংসস্তূপে আটকা কয়েকজন
  • ০৭ অক্টোবর ২০২৬
কক্সবাজারে ট্যুরে নিয়ে ঢাকা কলেজ ছাত্র অধিকার নেতাকে নির্যা…
  • ০৭ অক্টোবর ২০২৬
শ্রমিক অধিকার ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সরকারের অগ্রাধিকার: মাহ্…
  • ০৭ অক্টোবর ২০২৬