সনদ আছে, দক্ষতা নেই: বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সংকট

০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৫ PM
মো. সাজিদ হাসান

মো. সাজিদ হাসান © টিডিসি ফটো

একজন বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকের হাতে একটি সনদ আছে। কিন্তু সেই সনদ কি তাঁকে কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করেছে? চার, পাঁচ কিংবা ছয় বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটানোর পর একজন শিক্ষার্থী কি সত্যিই সমস্যা বিশ্লেষণ করতে শেখেন? নিজের চিন্তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারেন? নতুন কোনো প্রযুক্তি শিখে তা বাস্তবে কাজে লাগাতে পারেন? একটি সমস্যাকে নিজের সমস্যা হিসেবে দেখে সমাধানের পথ খুঁজতে পারেন?

আরও বড় প্রশ্ন হলো, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আসলে কী তৈরি করছে শুধু চাকরিপ্রার্থী, নাকি এমন মানুষ, যাঁদের জ্ঞান, চিন্তা ও দক্ষতা দিয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতা আছে?

প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর। কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে কথা বলতে গেলে এগুলো এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। কারণ আমাদের সামনে এখন এক অদ্ভুত বাস্তবতা। প্রতিবছর হাজার হাজার তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সনদ হাতে বের হচ্ছেন। একই সময়ে নিয়োগদাতাদের কাছ থেকে শোনা যাচ্ছে আরেকটি পরিচিত অভিযোগ, প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?

শিক্ষার উদ্দেশ্য ইতিহাসজুড়েই সমাজ ও অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে বদলেছে। শিল্পবিপ্লবের সময় কারখানা, প্রযুক্তি ও নতুন শ্রমবাজারের বিস্তার শিক্ষাব্যবস্থার সামনে নতুন চাহিদা তৈরি করেছিল। শুধু বই জানা মানুষ নয়, যন্ত্র বুঝতে পারে, হিসাব করতে পারে এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এমন মানুষের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি সেই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত করেছে।

এই অভিজ্ঞতার একটি সাধারণ শিক্ষা হলো, শিক্ষা কেবল অতীতের জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নয়; ভবিষ্যতের জন্য মানুষকে প্রস্তুত করার ব্যবস্থাও।

আমাদের সংকটের একটি বড় অংশ সম্ভবত এখানেই। আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাকে দেখি ভালো ফল, ভালো বিভাগ, একটি ভালো সনদ এবং শেষ পর্যন্ত একটি ভালো চাকরি পাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে। অথচ কর্মক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত একজন মানুষকে প্রমাণ করতে হয় তিনি কী করতে পারেন।

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ বেড়েছে এবং বিপুলসংখ্যক তরুণ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছেন। কিন্তু শিক্ষার বিস্তার আর শিক্ষার মান এক কথা নয়।

বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে দক্ষতার অসামঞ্জস্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০১৮ সালের একটি বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদনে নিয়োগদাতারা তরুণদের উচ্চতর চিন্তনক্ষমতা, যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানসহ বিভিন্ন দক্ষতার ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছিলেন।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর Labour Force Survey 2024 অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা শিক্ষার অন্যান্য স্তরের তুলনায় সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক বেকার ছিলেন।

অবশ্য এর পুরো দায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়। দেশে পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং শ্রমবাজারের কাঠামোগত সমস্যারও ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে শ্রমবাজার যে ধরনের দক্ষতা চাইছে এবং শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে প্রস্তুতি নিয়ে বের হচ্ছেন, তার মধ্যে একটি ব্যবধান রয়েছে।

তাই সমস্যাটিকে শুধু ‘চাকরি নেই’ বলে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। প্রশ্ন হলো, যেসব কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত মানুষ তৈরি করছি?

একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর কাটান। অসংখ্য পরীক্ষা দেন, শত শত পৃষ্ঠা পড়েন, অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেন। শেষে হাতে আসে বহুল কাঙ্ক্ষিত সনদ। কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রার শেষে তিনি কি একটি ভালো গবেষণা প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন? কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেন? একটি সমস্যাকে বিভিন্ন দিক থেকে বিশ্লেষণ করতে পারেন? নিজের বক্তব্য স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে পারেন? একটি এক্সেল শিটের তথ্য বুঝে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন? একটি পেশাদার ই-মেইল লিখতে পারেন? টিমওয়ার্ক করতে পারেন? নতুন প্রযুক্তি এলে তা শিখে নিজের কাজে যুক্ত করতে পারেন?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তিনি কি নিজে নিজে শিখতে পারেন? কারণ তথ্য মুখস্থ রাখা আর শিক্ষিত হওয়া এক জিনিস নয়। তথ্য বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, পেশা বদলায়। কিন্তু শেখার ক্ষমতা, বিশ্লেষণী চিন্তা এবং নতুন সমস্যার সমাধান খোঁজার দক্ষতা একজন মানুষকে দীর্ঘ সময় এগিয়ে রাখে।

এখানেই আমাদের পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগের রাতে ৫০ পৃষ্ঠা মুখস্থ করে ভালো নম্বর পেতে পারেন। কিন্তু সেই জ্ঞান ব্যবহার করে তিনি নতুন কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারবেন কি না, সেটিই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একজন নিয়োগদাতা সাধারণত এমন কর্মী চান, যিনি প্রতিটি পদক্ষেপে নির্দেশনার অপেক্ষায় বসে থাকবেন না। সমস্যাটি বুঝবেন, প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করবেন, সম্ভাব্য সমাধান খুঁজবেন এবং প্রয়োজনে নিজে নতুন কিছু শিখবেন। অন্যদিকে, একজন শিক্ষার্থী যদি বছরের পর বছর এমন ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হন, যেখানে ‘সঠিক উত্তর’ বলতে শিক্ষক বা পাঠ্যবইয়ে দেওয়া উত্তরকেই বোঝানো হয়, তাহলে কর্মক্ষেত্রে গিয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তা করা তাঁর জন্য কঠিন হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

তবে এই সংকটের জন্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয়কে দায়ী করাও ঠিক হবে না। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং শিক্ষার্থী সবারই ভূমিকা রয়েছে।

আমাদের সমাজে ‘ভালো ছাত্রের’ একটি পরিচিত সংজ্ঞা তৈরি হয়েছে ভালো ফল করবে, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, তারপর একটি ‘ভালো চাকরি’ করবে। এই পথের বাইরে শিক্ষার যে বিশাল জগৎ, তাকে আমরা অনেক সময় যথেষ্ট গুরুত্ব দিই না।

অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি কোনো সংগঠনে কাজ করা, বিতর্ক করা, গবেষণায় যুক্ত হওয়া, স্বেচ্ছাসেবা করা, প্রযুক্তি শেখা কিংবা বাস্তব কোনো সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার মধ্য দিয়েও একজন তরুণ নেতৃত্ব, যোগাযোগ, দলগত কাজ, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও ব্যর্থতা সামলানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জন করতে পারেন।

তাই পরিবর্তন শুধু পাঠ্যক্রমে নয়, শিক্ষার ধারণাতেও দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়কে চাকরির প্রশিক্ষণকেন্দ্রে পরিণত করা নয়; বরং জ্ঞান, চিন্তা, দক্ষতা ও বাস্তবতার মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত।

পাঠদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ও প্রকল্পভিত্তিক কাজকে শিক্ষার স্বাভাবিক অংশ করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের যোগাযোগ বাড়িয়ে কার্যকর ইন্টার্নশিপ ও বাস্তব সমস্যা নিয়ে কাজের সুযোগ তৈরি করা দরকার।

একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানও শুধু ভর্তি, পাসের হার বা বিভাগের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্নাতক হওয়ার পর একজন শিক্ষার্থী কী জানেন, কী বুঝতে পারেন এবং সর্বোপরি কী করতে পারেন?

শিক্ষার্থীকেও নিজের শিক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে। ‘বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে দক্ষ করে দেবে’ এই অপেক্ষায় চার বছর কাটিয়ে দিলে চলবে না। আজকের পৃথিবীতে একটি ডিগ্রি শেষ গন্তব্য নয়; বরং যাত্রার শুরু।

বাংলাদেশের সামনে এখনো একটি বড় সুযোগ আছে। আমাদের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী যদি যথাযথ শিক্ষা, দক্ষতা ও সুযোগ পায়, তারাই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে। বিপরীতে, বিপুলসংখ্যক তরুণ যদি সনদ হাতে বের হয়েও নিজের জ্ঞানকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা অর্জন না করে, তাহলে জনমিতিক এই সম্ভাবনাই একসময় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

আজকের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের উদ্যোক্তা, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, প্রশাসক, প্রকৌশলী, নীতিনির্ধারক ও নেতৃত্বের অংশ হবেন। তাই প্রশ্নটা শুধু তাঁরা চাকরি পাবেন কি না, সেটুকু নয়। প্রশ্নটা আরও বড়—তাঁরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার সক্ষমতা অর্জন করছেন, যে বাংলাদেশ আমরা তাঁদের হাতে তুলে দিতে চাই?

একটি সনদ প্রমাণ করতে পারে একজন মানুষ কোনো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু তাঁর চিন্তার গভীরতা, দক্ষতা, সততা, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাই বলে দেয়, সেই পড়াশোনা তাঁকে কতটা তৈরি করেছে।

তাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ শুধু আরও বেশি সনদ তৈরির মধ্যে নেই। ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সনদের আড়ালে থাকা মানুষটিকে আমরা কতটা যোগ্য করে তুলতে পারছি, তার ওপর।

কারণ কর্মজীবন কোনো পরীক্ষার খাতা নয়, যেখানে মুখস্থ উত্তর লিখে পূর্ণ নম্বর পাওয়া যায়। জীবন প্রশ্ন করে বাস্তব সমস্যার ভাষায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে পারে এমন মানুষ তৈরি করা।

লেখক: মো. সাজিদ হাসান

সভাপতি, ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি

বই আছে, পড়ার জায়গাও আছে; নেই শুধু পাঠক
  • ০৫ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের সূচি প্রকাশ আফগানিস্তানের
  • ০৫ অক্টোবর ২০২৬
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন হেগেম্যান-নাগেল-ডেইসেরথ, নেপথ্য…
  • ০৫ অক্টোবর ২০২৬
শিক্ষকদের মর্যাদা ও সঠিক মূল্যায়ন নিয়ে কাজ করছে সরকার : ববি…
  • ০৫ অক্টোবর ২০২৬
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সম্মাননা পেলেন ১০২ গুণী শিক্ষক
  • ০৫ অক্টোবর ২০২৬
সনদ আছে, দক্ষতা নেই: বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সংকট
  • ০৫ অক্টোবর ২০২৬