হায়দরগঞ্জ তাহেরিয়া আরএম কামিল মাদ্রাসা

অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ

০২ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৭ PM , আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০১:০৮ PM
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ মজুমদার

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ মজুমদার © টিডিসি সম্পাদিত

লক্ষ্মীপুরের হায়দরগঞ্জ তাহেরিয়া আরএম কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ মজুমদারের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করলে শাস্তি পেতে হয়েছে তাদের। ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ অডিটে কোটি টাকার আর্থিক অসংগতি ও অডিট আপত্তি উঠে এলেও আব্দুল আজিজ মজুমদারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি গভর্নিং বডি। তবে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় গঠন করা হয়েছে একটি তদন্ত কমিটি। 

প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র থেকে দেখা গেছে, প্রায় ১১ বছর ধরে মাদ্রাসাটিতে নিয়মিত অডিট না করেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেছেন আব্দুল আজিজ। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে চরম স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে আন্দোলন করেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। পরে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযোগ জমা দেন তারা। আন্দোলনের মুখে এক বছরের বেশি সময় প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে পারেননি আব্দুল আজিজ। পরে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা ও এক এসপির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে স্বপদে বসেন তিনি। ফিরে এসেও আগের মতই কার্যক্রম করে যাচ্ছেন অধ্যক্ষ আজিজ। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে শাস্তি বা বিভিন্নভাবে নাজেহাল করারও অভিযোগ পাওয়া যায়। এদিকে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বারবার চিঠি দিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হলেও দায়মুক্তি দিয়েছে গভর্নিং বডি।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক অভ্যন্তরীণ অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ মজুমদারের বিরুদ্ধে এক কোটি ২৯ লাখ ৭১ হাজার ৭০৬ টাকা আদায়যোগ্য অডিট আপত্তি উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া ভাউচার জালিয়াতি, প্রায় এক কোটি টাকার কর পরিশোধ না করা, বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়েও অনিয়ম পেয়েছে ওই কমিটি, যা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বেতন-ভাতা প্রায় ৩০ মাস পর্যন্ত বকেয়া থাকলেও বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের লাভ দেখানো হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিষয়টি নিয়ে আমরা প্রশাসনের সঙ্গেও আলোচনা করেছি। সরকারি তদন্তে যদি অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যায়কে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না—মাওলানা সাইয়্যেদ মো. আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবিরী আল মাদানী, সভাপতি, মাদ্রাসার গভর্নিং বডি

অডিট প্রতিবেদন ও  সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিভিন্ন ভাউচার অনিয়মের মাধ্যমে ৪৮ লাখ টাকার বেশি সরানো হয়েছে প্রতিষ্ঠান থেকে। এছাড়া যাতায়াত না করেও খরচ দেখানো হয়েছে ৭৬ হাজার ৭০৫ টাকা। একই ভাউচার একাধিকবার ব্যবহার করে এই অধ্যক্ষ অর্থ নিয়েছেন প্রায় ৩০ হাজার টাকা। পাশাপাশি বাসা ভাড়া, মোবাইল ও ইন্টারনেট বিল অতিরিক্ত দেখিয়ে প্রায় ৬ লাখ টাকা আত্মসাধ করেছেন আব্দুল আজিজ। পাশাপাশি অনুমোদন ছাড়াই আপ্যায়ন ও ভ্রমণ করে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ করেছেন তিনি। করোনা মহামারির সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও যাতায়াত এবং আপ্যায়ন দেখিয়ে তুলে নেয়া হয়েছে এক লাখ ৮ হাজার টাকার বেশি।

এছাড়াও মাদ্রাসার ছাত্রাবাসের ব্যাংক হিসাব থেকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা তুলে নিয়েছেন আব্দুল আজিজ। একই  ছাত্রাবাস থেকে একসঙ্গে ৫০ মাসের সম্মানী দেখিয়ে প্রায় এক লাখ টাকা নিজ হাতে ভাউচার লিখে উত্তোলন করেছেন তিনি। মাদ্রাসার দোকান ভাড়া ও শিক্ষার্থীয়দের ফরম পূরণের অর্থ আদায় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। 

মাদ্রাসার একটি সূত্র জানিয়েছে, দোকানের ভাড়া নিয়মিত আদায় না করে দোকানীদের থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন অধ্যক্ষ নিজেই। এতে গত ১০ বছরে প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৫ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া, শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন ও ফরম পূরণের ব্যয় থেকে আয় কম দেখানো হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ টাকা। অথচ এই অর্থ শিক্ষার্থীদের থেকে নিয়ে সরাসরি তছরুপ করেছেন আব্দুল আজিজ। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের বেতনের লক্ষ লক্ষ টাকা নেয়া হলেও তা প্রতিষ্ঠানের কোন রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ নেই। অডিট সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছন, মাসিক বেতন বাবদ শিক্ষার্থীদের থেকে আদায় করা প্রায় অর্ধকোটি টাকা আয় দেখানো হয়নি। এই অর্থ অধ্যক্ষ নিজে, গভর্নিং কমিটির সভাপতি ও কিছু সদস্য ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন। অনৈতিক সুবিধা নেয়ায় অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে  ওঠা অভিযোগ চোখ বন্ধ করে তাকে দায়মুক্তি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ।

গভর্নিং বডির নির্দেশে অডিট হলেও প্রকাশ করা হয়নি প্রতিবেদন

মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি সাইয়্যেদ মো. আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবিরী আল মাদানীর স্বাক্ষরে ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর অভ্যন্তরীণ অডিটের জন্য চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে প্রতিবেদন নিজেদের পক্ষে নিতে একই মাদ্রাসার অধ্যক্ষের পছন্দের একজন সহকারী অধ্যাপককে ওই কমিটির সদস্য করা হয়। যদিও ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্বাক্ষর জালিয়াতির মধ্যমে প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর বিপুল অংকের টাকা আত্মসাদের অভিযোগ রয়েছে। আলাদা করে ওই কমিটি তদন্ত শেষে বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করলেও তা গভর্নিং বডির সভায় উপস্থাপন করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিবেদনে মাদ্রাসা কমিটির গাফিলতির বিষয় উল্লেখ থাকায় সেটি প্রকাশ করা হচ্ছে না। পরে ঢাকা থেকে একটি অডিট ফার্মের সদস্যদের দিয়ে আরেকটি অডিট করা হয়। তবে সেই প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়নি।

ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রায় ১ হাজার ৭০০টি মাদ্রাসা রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের অভিযোগ আসে। অভিযোগ পেলে আমরা নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার কমিটি ও অধ্যক্ষকে বিষয়টি জানাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলি। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আইনের মধ্যে থেকে ন্যায়সংগতভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবেঅধ্যাপক মোহাম্মদ আবু জাফর খান, উপাচার্য, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়

মাদ্রাসার এক অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আন্দোলনের মুখে উনি দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানের আসেননি। পরে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও একজন এসপির সহযোগিতায় ফের অধ্যক্ষের দায়িত্বে ফিরেছেন। কিন্তু এখন হাসিনার মতো স্বৈরাচারী আচরণ শুরু করেছেন। যেন ফিরে এসে আরও শক্তি পেয়েছেন। এত এত টাকার অনিয়ম করে মাদ্রাসাকে ধ্বংসের মুখে ফেলেছেন। এক্ষেত্রে কেউ মুখ খুলতে পারছেন না। গভর্নিং বডির সভাপতি নিজে সবকিছু জেনেও নীরব সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে হায়দারগঞ্জ তাহরিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ মজুমদার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব অডিট প্রতিবেদনের কথা বলা হচ্ছে, সেটি সঠিক নয়। এটি একটি বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন। আমাকে হয়রানি ও অপমান করার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে। অডিটের নিয়ম অনুযায়ী কমিটির প্রতিবেদন অধ্যক্ষের মাধ্যমে গভর্নিং বডির সভাপতির কাছে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু আমার কাছে কখনো সেই প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি। তাই এর বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানি না।’

তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালে আন্দোলনের সময় আমার ওপর ও আমার পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা হয়েছিল। ওই সময় কিছু ব্যক্তি মাদ্রাসার বিভিন্ন কাগজপত্র নিয়ে গিয়ে নিজেদের মতো করে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন মাদ্রাসার নিয়মিত সংশ্লিষ্টও নন। একজন দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত শিক্ষক, আরেকজনের বিরুদ্ধে শিক্ষককে মারধরের মামলাও রয়েছে।’

ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। আমি লিখিত জবাব দিয়েছি। বর্তমানে আমি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছি এবং মাদ্রাসার কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে।’

ভাউচারে উল্লেখিত যাতায়াত ব্যয়ের বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, ‘আমার বাড়ি কুমিল্লায়। প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাজ শেষে যাওয়া-আসা করেছি। আমি যদি সংশ্লিষ্ট কাজ না করতাম, তাহলে গভর্নিং বডি সেই ব্যয় অনুমোদন করত না। নির্দিষ্ট ভাউচার দেখালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।’

ঝুড়ি ঝুড়ি অনিয়ম

শিক্ষক-কর্মচারীদের অভিযোগ, মাদ্রাসার গভর্নিং বডি গঠনের ক্ষেত্রেও নিয়ম মানা হয়নি। একাধিক শিক্ষক ও কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচন না করেই অধ্যক্ষের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া নিয়মিত সভা না করেই ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় সদস্যদের বাড়ি গিয়ে স্বাক্ষর নিয়ে এসেছেন অধ্যক্ষ আব্দুল আজিজ। এমনকি এই কার্যক্রমের জন্য যাতায়াতের ভাউচার তৈরি করে টাকা নিয়েছনে অধ্যক্ষ নিজেই। জানা গেছে, রহমাতুল আম ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত এই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হওয়ার পাশাপাশি কোনো ধরনের এজিএম ছাড়াই অবৈধভাবে ওই ট্রাস্টের সেক্রেটারি পদও নিজের করে নিয়েছেন আব্দুল আজিজ মজুমদার। ফলে ট্রাস্ট ও মাদ্রাসা, দুই প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ এখন একই ব্যক্তির হাতে।

সম্প্রতি যদি কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব দেওয়া হবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে—মেহেদী হাসান কাউছার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), রায়পুর

আন্দোলনের মুখে টানা অনুপস্থিত থেকেও পরবর্তীতে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে সরকারি বিভিন্ন সুবিধা নিয়েছেন অধ্যক্ষ আব্দুল আজিজ। যাতায়াতের ভাউচার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১০ বছরের বেশি সময়ে ক্লাস চলাকালীন সময়ের প্রায় ২৮ শতাংশ দিনে ঢাকা, কুমিল্লা ও রায়পুরে ভ্রমণ করেছেন আজিজ। ভাউচারে নির্বাচনী বন্ধের সময় মাদ্রাসার কাজে অন্যত্র যাতায়াত, ক্যাজুয়াল ছুটির দিনেও যাতায়াত, অসংখ্যবার শুক্রবারে কুমিল্লা যাতায়াত এমনকি ঈদের ছুটির সময় ভ্রমণ দেখিয়ে অর্থ নেয়ার প্রমাণ রয়েছে। অনেক ভাউচার দোকান থেকে খালি এনে প্রতিষ্ঠানে বসে পূরণ করা হয়েছে, এ বিষয়ে মাদ্রাসার কর্মচারীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাক্ষ্যও দিয়েছেন। অধ্যক্ষ একাধিকবার ২/৩/৪/৫ মাসের নাস্তা বিল একসঙ্গে তৈরি করে টাকা তুলে নিয়েছেন।

ঋণের নামে স্বাক্ষর জালিয়াতি

মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক আনোয়ার হাওলাদার শিক্ষক ও কর্মচারীদের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে জনতা ব্যাংকের রায়পুর শাখা থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ঋণ উত্তোলন করেছেন ২০২৩ সালে। অভিযোগ রয়েছে, এইকাজে জেনেশুনে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে সহযোগিতা করেছেন আব্দুল আজিজ। এমনকি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে আজিজের স্বাক্ষরও রয়েছে। এদিকে মাদ্রাসায় একটি ভুয়া ছাত্রী শাখা চালুর অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা। তাদের দাবি, সেখানে শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্লাস নিতে বাধ্য করা হয়েছে। এমপিও নীতিমালা অনুসরণ না করে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সম্পর্কে অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে। 

দুর্নীতি, অসদাচরণ, ভারসাম্যহীন আচরণ এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে মাদ্রাসার শিক্ষক ও কর্মচারীরা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব দেন ২০২৫ সালে। শিক্ষকদের দাবি, বিষয়টি ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়কে জানানো হলেও একাধিক চিঠির পরও গভর্নিং বডি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তাদের অভিযোগ, এতে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো কার্যত প্রশ্রয় পেয়েছে। সর্বশেষ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সরেজমিনে মাদ্রাসা অডিট করা হলেও তার প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে ওই কমিটিকেও বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়েছেন অধ্যক্ষ আজিজ। এক্ষেত্রে প্রকাশনী সংস্থা থেকে টাকা নিয়েছেন তিনি। এমনকি মিটিং করে মাদ্রাসার জন্য ঘুস দেওয়া জায়েজ বলেও ফতুয়া দিয়েছেন আজিজ। বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন মাদ্রাসার হাফ ডজন শিক্ষক-কর্মচারী।

এ বিষয়ে রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ মজুমদার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় কর্মস্থলের বাইরে ছিলেন এ বিষয়টি আমার জানা ছিল না কারণ আমি তখন ছিলাম না। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত কেউ আমার কাছে কোনো অভিযোগও দেননি।’

ইউএনও আরও বলেন, ‘মাদ্রাসাটি সরাসরি উপজেলা প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত হয় না। তাই এসব বিষয় আমাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। স্থানীয়ভাবে কোনো সমস্যা বা অভিযোগও এখন পর্যন্ত আমার কাছে আসেনি।’

তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি যদি কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব দেওয়া হবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

সার্বিক বিষয়ে মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি মাওলানা সাইয়্যেদ মো. আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবিরী আল মাদানী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘মাদ্রাসা নিয়ে একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আমাদের কাছে রয়েছে। তবে সম্প্রতি যে সরকারি অডিট হয়েছে, তার চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনো আমাদের হাতে আসেনি। সরকারি প্রতিবেদন পাওয়ার পরই বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিষয়টি নিয়ে আমরা প্রশাসনের সঙ্গেও আলোচনা করেছি। সরকারি তদন্তে যদি অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যায়কে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।’

সভাপতি আরও বলেন, ‘মাদ্রাসার পরিস্থিতি কিছুদিন ধরে অস্থিতিশীল ছিল। কিছু ব্যক্তি বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত করার চেষ্টা করেছেন। এ কারণে আমরা আইনের আশ্রয় নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তাকে পদে রাখার কোনো সুযোগ নেই। এটি কোনো ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান নয়; প্রতিষ্ঠানের স্বার্থই আমাদের কাছে সর্বাগ্রে। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া ব্যবস্থা নেওয়াও আইনসম্মত নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা চাইলে সরেজমিনে এসে সব নথিপত্র দেখতে পারেন। আগের তদন্তের কাগজপত্রও দেখবেন, সরকারি অডিটের প্রতিবেদন এলে সেটিও দেখবেন। যদি কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তাহলে গভর্নিং বডি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু জাফর খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রায় ১ হাজার ৭০০টি মাদ্রাসা রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের অভিযোগ আসে। অভিযোগ পেলে আমরা নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার কমিটি ও অধ্যক্ষকে বিষয়টি জানাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলি।’

তিনি বলেন, ‘মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। প্রথমে গভর্নিং বডি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি যাচাই করবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কমিটি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারে। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রথমে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়। এরপর বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাদ্রাসা কমিটি যদি দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে স্মরণপত্র দেওয়া ছাড়া সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সীমিত। তবে অভিযোগ পেলে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখি এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করি। নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ বা তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তির বিষয়ে মন্তব্য করা কঠিন। অভিযোগ এলে নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত, শুনানি ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’

উপাচার্য বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আইনের মধ্যে থেকে ন্যায়সংগতভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত প্রাথমিকের সুপারিশপ্রাপ্ত শি…
  • ০২ আগস্ট ২০২৬
গবেষণা প্রবন্ধ প্রত্যাহারে শীর্ষে চীন, দ্বিতীয় যুক্তরাষ্ট্…
  • ০২ আগস্ট ২০২৬
টুঙ্গিপাড়ায় গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত তোরণে আ…
  • ০২ আগস্ট ২০২৬
জুলাইযোদ্ধা তন্বীকে নিয়ে ‘অশোভন মন্তব্য’, অধ্যাপক কাবেরি গ…
  • ০২ আগস্ট ২০২৬
রাজধানীতে ভাড়া বাসায় স্ত্রী-শ্বাশুড়িকে কুপিয়ে হত্যা, পুলিশে…
  • ০২ আগস্ট ২০২৬
বৃষ্টি হলেই পানিতে থই থই বিদ্যালয়ের মাঠ, শ্রেণিকক্ষ-অফিস রু…
  • ০২ আগস্ট ২০২৬